Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ২০ মে, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ মে, ২০১৭ ২৩:৪২
হাওরবাসীকে রক্ষার উদ্যোগ নিন
মেজর মো. আখতারুজ্জামান (অব.)
হাওরবাসীকে রক্ষার উদ্যোগ নিন

অতিবৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা ঢলে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল, ব্রাহ্মণবাডিয়া ও নরসিংদীর নিম্নাঞ্চলের ধান খেত তলিয়ে যায় এবং ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় শতভাগ কৃষক তাদের সারা বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে আজ দিশাহারা। এবারের বৃষ্টিপাত শুরু হয় স্বাভাবিক সময়ের ২০-২৫ দিন আগে। ফলে বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের পক্ষে তাদের জমির ধান কেটে আনা সম্ভব হয়নি। তখন প্রায় সব ধান কাঁচা ছিল ফলে পাহাড়ের ঢল নামতে দেখেও কৃষকের পক্ষে কিছু করার ছিল না। অথচ এই বৃষ্টিটা যদি স্বাভাবিক সময়ে অর্থাৎ ২৫ দিন পরে হতো তাহলে তাদের এত বড় সর্বনাশ হতো না। তা ছাডা হাওরের উত্তরাঞ্চলজুডে ভারতের মেঘালয়ের খাডা পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল প্রচণ্ড বেগে অতি দ্রুত হাওরাঞ্চলের সব নদী-নালা, খাল-বিল প্লাবিত করে হাওরে ঢুকে যায়; এর ফলে কৃষক হাওরের ফসল রক্ষা করতে পারেনি। এবারের বৃষ্টিপাত ছিল গত ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, নদী-নালা, খাল খননে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়; তবে এই বিশাল অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হলে এভাবে হাওর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে পড়ত না এবং কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। প্লাবন ও বন্যার জন্য প্রকৃতি দায়ী কিন্তু কৃষকের ক্ষতির জন্য সরকারের হাওর প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ তথা মূলত সরকার দায়ী। কাজেই কৃষকের ক্ষতির দায়ভার একমাত্র সরকারকেই নিতে হবে।

হাওর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। এ এলাকার উত্তর পাশে ভারতের মেঘালয়ের খাডা পাহাড়; যার ফলে মেঘালয়ে বৃষ্টিপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি ঢল হাওরাঞ্চলে নেমে এসে প্রতি বছরই হাওরকে প্লাবিত করে। হাওরে বন্যা একটি অতি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘটনা। হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য গড়েই উঠেছে বন্যার পানি ঘিরে। বছরের একটি বিরাট অংশ এ এলাকার মানুষ পানির সঙ্গে বাস করে। বন্যা ও পানি হাওরবাসীর জীবনের অতি প্রাকৃতিক সাথী। কিন্তু এবারের অকালবন্যা ও প্লাবন তাদের স্বাভাবিক জীবনকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তলিয়ে দিয়েছে তাদের সারা বছরের খাদ্য ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। এবারের অকালবন্যা ও প্লাবনে মূলত হাওরের কৃষকই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবারের অকাল প্লাবন ও বন্যায় স্থানীয় কৃষিশ্রমিক ও মত্স্যজীবীদের ক্ষতি হয়নি। বরং তারা বেশি মূল্যে তাদের শ্রম বিক্রি করতে পেরেছে এবং বন্যায় ভেসে ওঠা মাছ ধরে লাভবান হয়েছে। হাওরে আরেকটি বিরাট শ্রমজীবী ও পেশাজীবী আছে, যারা নৌকার মাঝি এবং নৌকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী ও নৌকা মালিক। বন্যায় এদেরও ক্ষতি হয় না বরং তারা লাভবান হয়। এবারের অকাল প্লাবনেও নৌকার মাঝি ও নৌকা ব্যবসায়ীদের কোনো ক্ষতি হয়নি। উল্টো তারা ভীষণভাবে লাভবান হয়েছে। কারণ প্লাবনে ডুবে যাওয়া অল্প পরিমাণে সংগৃহীত ধান, বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি ও উপকরণ চড়া দামে নৌকা দিয়ে কৃষককে পরিবহন করাতে হয়েছে। তবে এবারের অকাল প্লাবনে কৃষকের পাশাপাশি অভিবাসী বা বহিরাগত কৃষিশ্রমিকরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অভিবাসী বা বহিরাগত কৃষিশ্রমিকরা অন্যান্য এলাকা ও জেলা থেকে বোরো চাষ এবং ফসল লাগানো ও তোলার শ্রম দিতে ধান লাগানো ও কাটার সময় হাওরে আসে। তারা সাধারণত কৃষকের সঙ্গে অগ্রিম চুক্তিতে ধান কাটতে আসে এবং মজুরি নেয় ধানের মাধ্যমে। নগদ মজুরিতে এই অভিবাসী কৃষিশ্রমিকরা কাজ করে না। ধান কাটাই, মাড়াই, শুকানো এবং কৃষকের গোলায় তোলা সব কাজ নির্দিষ্ট চুক্তিতে ধানের বিনিময়ে করা হয়। এখানে নগদ কোনো টাকা লেনদেন হয় না।

বন্যায় এই অভিবাসী কৃষিশ্রমিকরাও নিঃস্ব হয়ে গেছে। অভিবাসী কৃষিশ্রমিকরা ধান কাটাই, মাড়াই ও গুদামজাত করার জন্য বিভিন্ন উপকরণ ঋণ বা বাকিতে কিনে আনে এবং ফসল তোলার পর সংগৃহীত ধান বিক্রি করে ঋণ বা বাকি টাকা পরিশোধ করে। এবারের অকাল প্লাবনে তারা এক ছটাক ধানও পায়নি, কিন্তু ঋণ বা বাকি টাকা তাদের অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। এ ঋণ তারা কোনো ব্যাংক থেকে গ্রহণ করেনি যে সরকারের নির্দেশে তা স্থগিত থাকবে! এখন তারা মহাজনের ঋণ কীভাবে শোধ করবে এই ভাবনায় দিশাহারা। পাশাপাশি স্থানীয় না হওয়ার কারণে দুর্গত হাওরাঞ্চলের মেম্বার, চেয়ারম্যান বা সরকার বা এনজিও কেউ এই অভিবাসী কৃষিশ্রমিকদের ত্রাণও দিচ্ছেন না। কাজেই হাওরাঞ্চলকে দুর্গত ঘোষণা করলেও এই অভিবাসী কৃষিশ্রমিকদের কী কাজে আসবে, তা অনেকের মতো তাদেরও প্রশ্ন। এবারের অকালবন্যা ও প্লাবনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাওর ও তত্সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলর কৃষক। হাওরে বিভিন্ন শ্রেণির কৃষক আছে। এর মধ্যে আছে ভূমির মালিক কিন্তু অনুপস্থিত কৃষক, ভূমির মালিক জমি চাষে নিয়োজিত কৃষক, বর্গা চাষি কৃষক, ভাগি চাষি কৃষক এবং চুক্তিবদ্ধ কৃষক। ভূমির মালিক আবার দুই ভাগে বিভক্ত। স্থানীয় ভূমালিক ও বহিরাগত ভূমালিক। যাদের হাওর এলাকায় বলা হয় যথাক্রমে ‘আবাদি’ ও ‘জিরাতি’। যারা হাওর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে তারা এলাকায় আবাদি নামে পরিচিত; যাদের মধ্যে আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আছেন। অন্যদিকে জিরাতিরা হলো যারা এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে না, শুধু ফসল করার সময় তারা হাওরে অস্থায়ীভাবে ঘরবাড়ি বানিয়ে চাষাবাদ করে। হাওরে জিরাতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি; যারা স্থানীয় কৃষকের সঙ্গে একইভাবে এবারের অকালবন্যায় এবং প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কিছুটা বেশিও হয়েছে; এ কারণে যে প্লাবনে তাদের অস্থায়ী ঘরবাড়িও ভেসে গেছে। সাধারণত জিরাতিরা তাদের জমির পাশেই অস্থায়ী ঘরবাড়ি বানায়। কিন্তু জিরাতি কৃষক অকালবন্যা ও প্লাবনে সরকারের ত্রাণ নেটওয়ার্কের বাইরে; কারণ তারা হাওরের স্থানীয় বাসিন্দা নয়।

হাওরের কৃষকের সংজ্ঞা অনেক ব্যাপক এবং বিভক্ত। হাওরের মালিকরা যেমন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার, তেমনি ভূমিহীন কৃষকের শ্রেণিবিন্যাসও হাওরে ভিন্নতর। হাওরে ভূমির মালিকদের রয়েছে কয়েকটি শ্রেণি যেমন স্থানীয় মালিক এবং অনুপস্থিত বা বহিরাগত মালিক। আবার রয়েছে কৃষক মালিক এবং অকৃষক বা অনুপস্থিত মালিক। কৃষক মালিকরা বন্যায় যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয় অকৃষক এবং অনুপস্থিত মালিক তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। অনুপস্থিত ভূমি মালিকদের ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ার কারণ হলো তারা আগেই নগদ টাকা নিয়ে তাদের জমি লিজ বা পত্তন দিয়ে দেয়। সেখানে ফসল না হলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে লিজ বা পত্তনের টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো শর্ত থাকে না। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বর্গা চাষি, ভাগি চাষি এবং লিজ নেওয়া বা পত্তন নেওয়া চাষি। ভাগি চাষি বলা হয় যারা যৌথভাবে চাষ করে এবং সেখানে জমির মালিকও চাষে খরচ দিয়ে অংশগ্রহণ করে। এবারের অকাল প্লাবনে এই শ্রেণির প্রকৃত কৃষক একদম নিঃস্ব হয়ে গেছে। এই শ্রেণির কৃষক নিজেদের ও পরিবারের পুঁজি ও শ্রম বিনিয়োগ করে চাষাবাদ করে। নিজেদের হয়তো কিছু জমি আছে তার সঙ্গে পত্তন, লিজ, বর্গা বা ভাগে নিজেদের জমির পাশের জমি নিয়ে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ করে এবং যারা মূলত সত্যিকারের চাষি। যেহেতু তাদের তেমন নিজস্ব জমি নেই, তাই তারা ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নিতে পারে না এবং তাদের তেমন বেশি জমি না থাকার কারণে বা ঋণ পাওয়ার মতো তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না বিধায় তারা কখনই ব্যাংক ঋণ নিতে পারে না। তাই এই শ্রমজীবী প্রকৃত কৃষক ধারদেনা এবং স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে লগ্নি করে বা ধান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কম দামে অগ্রিম ধান বিক্রি করে, নিজের ও পরিবারের সবার শ্রম বিনিয়োগ করে বোরো ধান চাষ করেছিল কিন্তু অকালবন্যা ও প্লাবন তাদের বেঁচে থাকার সোনার ফসল তলিয়ে দিয়ে গেছে। এই দুর্গত কৃষক কিন্তু সবাই স্থানীয় নয়। বিভিন্ন এলাকা ও জেলা থেকে এসে এই শ্রমজীবী কৃষক হাওরের জমিতে শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করছিল; তারা তাদের সোনার ফসল প্রকৃতির তাণ্ডবে হারিয়ে এখন হাওর থেকে দূরে ঘরবাড়ি ছেড়ে ফেরারি হয়ে ঘুরছে; নিজের ভাঙা ঘরে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই, কারণ সেখানে মহাজন আসল এবং সুদের জন্য অপেক্ষা করছে।

এই অসহায় কৃষকের জমির ফলানো ফসল প্লাবনের নিচে, বাড়িঘর মহাজনের কাছে গির্বি, সামনে একটি পুরো বছর অনিশ্চিত, বন্ধক রাখার মতো আর কোনো সম্পদ নেই। তার সামাজিক মর্যাদা, সরকারের ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতে লোকলজ্জা এই অসহায় কৃষকের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। সবাই তার জন্য দরদ দেখাচ্ছে অথচ এই দরদ এই অসহায় প্রকৃত কৃষকের কোনো উপকারে আসছে না বরং আরও অসহায় হয়ে যাচ্ছে। অকালবন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এই কৃষক সরকারের ত্রাণ নিতে লাইনে দাঁড়াতে পারে না, ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়নি তাই সুদ মাফে বা ঋণ পরিশোধ পিছিয়ে দিলে তার কী লাভ হবে, নতুন বছরে কৃষি উপকরণ দিয়ে সে কী করবে, নতুন করে টাকা না দিলে চাষ করার জমি তাকে কে দেবে, এসএসসি পাস করা মেয়েটিকে কীভাবে কলেজে ভর্তি করাবে, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ কে দেবে, মহাজনের সুদ ও ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবে, পরিবারের চিকিৎসা কোথা থেকে হবে? এ রকম হাজারো প্রশ্ন আজকে হাওরের কৃষককে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে, কে তাকে আশ্রয় দেবে? হাওরবাসীর গর্ব ছিল তাদের পোলা রাষ্ট্রপতি, তাদের কোনো চিন্তা ছিল না, যা কিছু করার তা তাদের পোলাই করবেন!

আমরা সবাই হাওরবাসীদের বাঁচাতে চাই, রক্ষা করতে চাই প্রকৃতির ছোবল থেকে হাওরের কৃষককে। মহামান্য রাষ্ট্রপতিও চান এই অসহায় হাওরবাসী কৃষকের মুক্তি। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে আমরা সবাই সঠিক পথে হাঁটছি না। আমরা সব দুর্যোগে যা করে আসছি, সেই একই ওষুধ হাওরের কৃষককে দিতে চাচ্ছি; কিন্তু তা যে সঠিক নয় তা আমরা সাহস করে বলতেও পারছি না। খাদ্যমন্ত্রী বলছেন, দেশে খাদ্যের অভাব হবে না। কৃষিমন্ত্রী বলছেন, কৃষি উৎপাদন কম হবে না। বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে না। অর্থমন্ত্রী বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং খোদ প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, একজন মানুষও না খেয়ে মরবে না, সরকারের ভাণ্ডারে পর্যাপ্ত ত্রাণ আছে। তাহলে এখন হাওরের কৃষকের কী উপায়? কৃষক বেঁচে থাকবে কিন্তু কৃষক তো ভিক্ষুক হতে পারে না। কৃষক মহাজনের ঋণ ও সুদ পরিশোধ করবে কীভাবে? ছেলেমেয়েদের শিক্ষা চালাবে কীভাবে? বৃদ্ধ পিতা-মাতার চিকিৎসার খরচ আসবে কোথা থেকে? আগামী বছরের জমি বর্গা নেবে কীভাবে? পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনদের ঋণ শোধ করবে কীভাবে? সরকারের ত্রাণ, ব্যাংক ঋণ স্থগিত, সুদ মওকুফ, বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ, খয়রাতি সাহায্য, হাওরের বাঁধ পুনর্নির্মাণ বা দুর্নীতিবাজদের বিচার করলে কি কৃষকের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে? যদি পাওয়া যায় তাহলে কৃষকের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু যদি না পাওয়া যায় তাহলে কৃষকের কিছু দাবি আছে। সে সবাইকে বিবেচনা করার জন্য বিনীত আবেদন জানাচ্ছে:

১. প্রতি শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বোরো চাষের জন্য ১ মণ করে ধান বা সমহারে চাল অথবা নগদ অর্থ দেওয়া হোক।

২. অবিলম্বে দেশব্যাপী কৃষকের শস্যবীমা চালু করা হোক। দেশের সব বীমা কোম্পানিকে শস্যবীমা করার নির্দেশ দেওয়া এবং সরকারি তহবিল থেকে কাউন্টার বীমা করা হোক।

৩. কৃষিজমির অনুপস্থিত মালিকদের জমি সরকার নির্ধারিত একটি হারে যা শুধু উৎপাদিত ফসল দিয়ে পরিশোধ করা হবে এই শর্তে প্রকৃত কৃষককে চাষ করতে দেওয়া হোক। প্রয়োজনে অনুপস্থিত কৃষককে ক্ষতিপূরণ দিয়ে তা বর্গা চাষিদের চাষ করতে দেওয়া হোক অথবা অনুপস্থিত কৃষককে কৃষিতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করা হোক।

৪. বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষককে ফসল ও উৎপাদনভিত্তিক সব কৃষি উপকরণ একটি নির্দিষ্ট মূল্যে দেওয়া হোক; যা কৃষক তার উৎপাদন থেকে ক্রমান্বয়ে পরিশোধ করবে এবং কোনো প্রকার ক্ষতি হলে তা বীমা থেকে শোধ করা হবে।

৫. সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ব্যবস্থা করবে এবং কৃষককে একটি নির্দিষ্ট ভাড়ায় সরবরাহ করবে।

৬. প্রত্যেক কৃষক থেকে বিঘাপ্রতি উৎপাদনের একটি অংশ নগদ মূল্যে নির্দিষ্ট দরে কিনে সরকার আপদকালীন খাদ্যভাণ্ডার গড়ে তুলবে।

৭. কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ব্যবস্যা সম্পূর্ণ শুল্ক ও ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখতে হবে।

৮. কৃষিপণ্য ও উৎপাদিত শাক-সবজি পরিবহন নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন এবং শুল্ক ও ভ্যাটমুক্ত রাখতে হবে।

৯. সকল প্রকার কৃষি উৎপাদন (কৃষিবাণিজ্য ছাড়া) ঋণ সম্পূর্ণ সুদমুক্ত করতে হবে। বর্তমানে কৃষি ঋণে বাংলাদেশ ব্যাংক যে ৫% হারে সুদ নেয় তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের বিদেশি মুদ্রার অলস রিজার্ভ তহবিল থেকে বছরে শতকরা ১৫% হারে অথবা ন্যূনতম ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের টাকা কৃষি ঋণ বাবদ সুদবিহীন বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংককে সরবরাহ করবে। কৃষি বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকার বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর সর্বোচ্চ ৬% হারে ঋণ বিতরণ খরচ ধরে ওই খরচ ব্যাংকগুলোর আয় থেকে আয়কর রেয়াত হিসেবে সমন্বয় করে দেবে।

১০. সারা দেশের কৃষকের মাঝে বিনিয়োগের জন্য দেশের বার্ষিক রাজস্বের সাড়ে ৭ শতাংশ কৃষি তহবিলে জমা রাখতে হবে; যা রাষ্ট্রের সঞ্চয় হিসেবে গণ্য হবে এবং শস্যবীমার সব দাবি এই সঞ্চয় তহবিল থেকে পূরণ করা হবে।

১১. কৃষককে দেশের শুল্ক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসতে হবে, যাতে তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকের মর্যাদা লাভ করে।

 

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow