মানুষের ভিতর দুটি সত্তা রয়েছে। একটি পশু সত্তা, আরেকটি ফেরেশতা প্রকৃতি। পশুত্বকে দমন করে ফেরেশতা প্রকৃতিকে জাগিয়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টার মাধ্যমেই আদম সন্তান প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। মানুষ হওয়ার এ প্রক্রিয়াকে ইসলাম ধর্ম ‘তাসাউফ’ বা আত্মশুদ্ধি নাম দিয়েছে। ‘তাসাউফ’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘সাফা’ শব্দ থেকে। যার অর্থ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অকৃত্রিমতা বা নির্ভেজাল। মানুষের ভিতর-বাইরের পশুবৃত্তিকে মিটিয়ে দিয়ে ফেরেশতাবৃত্তি ফুটিয়ে তোলার নামই তাসাউফ। মূলত তাসাউফ চর্চার অভাবেই ব্যক্তির মাঝে অপরাধ তথা গোনাহের চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে সে ভয়ঙ্কর অপরাধ করে ফেলে। এভাবে সমাজ ও দেশের অধিকাংশ মানুষ যখন তাসাউফবিমুখ জীবনযাপন করে তখনই ওই সমাজ ও দেশ হয়ে ওঠে একটি দোজখখানা, আজাবখানা। চারদিকে শুধু অশান্তি আর অশান্তি। এই অশান্তি আগুনের মতো পোড়াতে থাকে সমাজ ও দেশকে। মানুষে মানুষে সত্ভাব, মায়া-মমতা, ভালোবাসা-সম্প্রীতি ও মনুষ্যত্বের চর্চার মাধ্যমে সমাজে, দেশে ও জনমনে শান্তির ঝরনাধারা প্রবাহিত করতে হলে অবশ্যই তাসাউফ চর্চা করতে হবে ব্যাপকভাবে। তাসাউফ চর্চা ছাড়া মানুষের আত্মায় শান্তির অমিয় ধারা বর্ষণের বিকল্প আর কোনো পথ নেই। তাই তো মানবসভ্যতার শুরু থেকেই প্রতিটি আসমানি ধর্মে তাসাউফ চর্চা ছিল বাধ্যতামূলক। এখনো যতগুলো ধর্ম পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে, প্রতিটি ধর্মই তাসাউফ তথা আত্মশুদ্ধির সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছে কলব ঘরের ওপরের দিকে। যার শেষ মনজিল স্রষ্টার সান্নিধ্য। আর স্রষ্টাতে লীন হওয়াই তাসাউফের একমাত্র উদ্দেশ্য। মানবাত্মা যখন পরমাত্মা হয়ে খোদার সঙ্গে মিশে যায়, লীন হয়ে যায়, ফানা হয়ে যায় তখনই মানুষের মাঝে প্রকাশ হতে থাকে আল্লাহতায়ালার সিফাত তথা গুণগুলো। দয়ামায়া, প্রেম-ভালোবাসা, মমত্ববোধ— এসবই আল্লাহর সিফাত। তাসাউফ চর্চার মাধ্যমেই মানুষের মাঝে এসবের বিকাশ ও প্রকাশ ঘটতে থাকে।
তাসাউফ চর্চায় আমাদের উদাসীনতা আশঙ্কাজনক। আমরা যতটুকুই ধর্মকর্ম করি, তাসাউফ চর্চা তার অনেক কম করি। তাই তো আমাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে কত ভয়াবহ বিপর্যয়। নৈতিক, চারিত্রিক, অর্থনৈতিক, মানসিক সব দিক থেকেই দিন দিন পিছিয়ে পড়ছি আমরা। এর কারণ একটাই— আমাদের মধ্যে তাসাউফ চর্চার অভাব। আবার যতটুকু চর্চা করছি তাও বিজ্ঞজনদের কাছে প্রশ্নমুক্ত নয়। আমাদের ধর্মে তাসাউফ চর্চা ফরজে আইনের অন্তর্ভুক্ত। ফরজে আইন মানে প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। কোনো অবস্থাতেই এর চর্চা থেকে নিজেকে বিরত রাখার সুযোগ নেই। বরং বিজ্ঞজনরা তো বেশ জোরের সঙ্গেই বলেন, তাসাউফই ইসলাম ধর্মের প্রাণ। প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী (রহ.) তাফসিরে মাজহারিতে লিখেন, ‘সুফিগণ যে শাস্ত্রকে ইলমে লাদুন্নি তথা তাসাউফ বলেন, তা অর্জন করা ফরজে আইন। এর চর্চা মানুষের কলব থেকে আল্লাহ ভিন্ন সব বস্তু ও ব্যক্তিকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে শুধু আল্লাহর প্রেম-ভালোবাসাই প্রতিষ্ঠা করে। মানুষের মাঝে প্রবৃত্তিগত যত দোষ আছে যেমন— হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, লোভ, কাম, ক্রোধ, রিয়া এসব দূর করে দেয়। শুধু তাই নয়, মানুষের ভিতর সচ্চরিত্র, সত্যবাদিতা, মমত্ববোধ জাগিয়ে দেয় ইলমে তাসাউফ (তাফসিরে মাজহারি)।
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালী (রহ.) বলেন, ‘ইলমে শরিয়ত অর্জন করা যেমন ফরজ, একইভাবে ইলমে তরিকতও অর্জন করা ফরজ। আর ইলমে তরিকত হলো তাওয়াক্কুল, খোদাভীতি, খোদার সন্তুষ্টি চর্চারই আরেক নাম’ (তালিমুল মুতাকাল্লিমিন)। হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবীও (রহ.) তার মুহিম্মাতি তাসাউফ গ্রন্থে দ্ব্যর্থকণ্ঠে বলেছেন, ‘তাসাউফ অর্জন করা শরিয়ত অর্জনের মতোই ফরজ।’ তাফসিরে জুমালে বলা হয়েছে, ‘ইসলাম ধর্মের অন্যতম মৌলিক বিষয় হচ্ছে ইলমে তাসাউফ।’ তাই তো তাসাউফ অস্বীকারকারী বা যারা তাসাউফ চর্চা করে না তাদের সম্পর্কে আল্লামা আল্লাহ ইয়ার খান (রহ.) বলেছেন, ‘তাসাউফ অস্বীকারকারীরা আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (দালায়েলুস সুলুক)। শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) বলেছেন, ‘সত্যপন্থি আলেমরা শরিয়ত ও তরিকত এ দুটোকেই বুজুর্গি মনে করতেন। এ দুটোর যে কোনো একটিকে বাদ দিয়ে আল্লাহওয়ালা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই’ (তোহফা ইসনা আশারিয়া)।
এক কথায় পূর্ববর্তী এবং বর্তমানের সত্যপন্থি সব আলেম তাসাউফ চর্চাকে দ্বীনের খুঁটি ও মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা প্রত্যেকেই নিজেদের জীবনে তাসাউফের ফুল ফুটিয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার সাধনা করেছেন। তাই আমাদেরও কর্তব্য হবে, মাটির দেহে লুকিয়ে থাকা রুহ পাখিটির সন্ধান করা। তার স্বরূপ জানা। স্রষ্টাকে জানা। তবেই আমরা আল্লাহর প্রাপ্তির পথে, আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটি হাঁটি পায়ে এগিয়ে যেতে পারব ইনশাআল্লাহ।
লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব
www.selimazadi.com