শিরোনাম
৩০ নভেম্বর, ২০২৩ ০৪:৩৪

চবিতে গোলটেবিল বৈঠক: প্রধানমন্ত্রীকে জাতীয় সংলাপের আহ্বান

চবি প্রতিনিধি

চবিতে গোলটেবিল বৈঠক: প্রধানমন্ত্রীকে জাতীয় সংলাপের আহ্বান

ছবি- বাংলাদেশ প্রতিদিন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) 'দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট' শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে জাতীয় সংলাপের আহ্বান করেছেন বিভিন্ন চিন্তাবিদগণ।  বুধবার (২৯ নভেম্বর) সমাজবিজ্ঞান অনুষদের একটি কক্ষে  'সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা কেন্দ্র' (সিএসপিটি) আয়োজিত এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। 

এসময় অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তসলিম উদ্দিন বলেন, গণতন্ত্রের সাথে ডেভেলপমেন্টের ওতপ্রোত সম্পর্ক। কোন সরকার যদি সচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে তাহলে জনগণের কাছে বিন্দুমাত্র হলেও দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। কিন্তু আমাদের দেশে দলীয় গণতন্ত্র চলে। সেটা যে দলই হোক।

যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার আলী আর রাজি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে আমরা যা জানি তা হচ্ছে: রাষ্ট্র নির্মাণের একটা সমস্যা, আইনের শাসনের সমস্যা, গণতন্ত্রের উত্তরায়ণের সমস্যা। রাষ্ট্রকে যারা নেতৃত্ব দিবে তাদেরকে ব্যক্তিনিরপেক্ষ হয়ে ওঠার সমস্যা। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার হাতে আছে? সেটা সুসংহত হচ্ছে কি না? আমাদের ক্ষেত্রে  রাষ্ট্র নির্মাণের ব্যক্তি বিরাট ফ্যাক্টর। আমাদের সংবিধানটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে ব্যক্তিই প্রধান হয়ে উঠে। কে কাকে সুবিধা পাওয়াই দিবে এর ভিত্তিতেই ক্ষমতা চলে।

রাজনৈতিক উত্তোরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট রয়েছে। আমরা জবঢ়ঁনষরপ এর বাংলা করলাম প্রজাতন্ত্র, আমরা কার প্রজা। আমাদের সংবিধান খুব দুর্বোধ্য। এখনো আমাদের যা কিছু হচ্ছে সবকিছুতে কলোনিয়াল প্রভাব রয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যত পুরোটাই অন্ধকার। কারণ, আমাদের কোন জ্ঞানতাত্তি¡ক বিষয় নেই, শুধুই ঝগড়াঝাটি আছে।

অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, চীন বিরোধী কোয়াড জোট, ড. ইউনুস এবং ইন্দো-প্যাসিপিক ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। পরপর দুটি গণতান্ত্রিক সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণও করা হলো না। বরং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো। এটি উদ্বেগের কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের অবনতির ফলে ৭৪' সালের দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তা ভুলে গেলে চলবে না। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য, কূটনীতি, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক সাহায্য, রেমিট্যান্স, উচ্চশিক্ষা'সহ বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র সবার উপরে আছে। এছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রয়েছে যারা আমাদের রপ্তানির ৪৫ শতাংশের গন্তব্য। গতবছরে তাদের সাথে আমাদের আমদানি হয়েছে ৪ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি হয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলার। যা ইতিবাচক সম্পর্ক। ভারত,চীন এবং রাশিয়ার সাথে আমাদের প্রচুর বানিজ্য ঘাটতি রয়েছে। গতবছরে ভারতে আমাদের রপ্তানি ২ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ১১ বিলিয়ন ডলার। চীনে ৬৮ কোটি ডলার এবং আমদানি ১৯ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়ার সাথে আমদানি এবং রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। এটি বিবেচনার বিষয়। এখন কোন শক্তির বলে সরকার পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক কঠিন করে একটা নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকতে চায়? এই নির্বাচন দেশকে একটি সংকটের দিকে ঠেলে দিবে যা পরিণতি খুবই ভয়াবহ। 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, আমাদের দেশের গঠনতান্ত্রিক সমস্যার কারণে যে দলই ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করুক না কেনো বিরোধী প্রার্থী নির্বাচনে আসলে সরকারি দল ভয় পায়। গঠনতান্ত্রিক সমস্যার পরিবর্তন না করে স্বচ্ছ নির্বাচন করলেও যারা ক্ষমতায় আসবে তারা পরবর্তীতে নির্বাচনে যেতে ভয় পাবে। দ্বাদশ নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশে বিশেষ কিছু সংকট তৈরি হয়েছে। যেমন রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সংকট। আমরা দেখছি যে পুলিশ দিয়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু উচিৎ হলো রাজনীতি দিয়েই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা।

রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ারা বেগম বলেন, এই বিভাগে এমন একটি গোলটেবিল খুবই ইতিবাচক, প্রশংসনীয় এবং সম্ভাবনাময়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে একটি সিভিলিয়ান গভমেন্ট দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে কিছু সক্ষমতা অর্জন করে। এটি মাথায় রেখে বিরোধী দলকে কৌশল সাজাতে হয়। যখন দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ব্রিঙ্কম্যানশিপ (চরম ঝুঁকির খেলা) খেলতে চায়, তখন বিরোধীদলকে সে অনুযায়ী চিন্তা করতে হবে। বিএনপিকে এটা বুঝতে হবে আওয়ামীলীগ তাদের চেয়ে অনেক ভালো ব্রিঙ্কম্যানশিপ খেলতে পারে। আমি বলতে চাই ছোট এবং সমস্যাসংকুল দেশ হিসেবে এখানে বিরোধীদলের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য বিরোধীদলকে আরো বাস্তবধর্মী কৌশল নিতে হবে৷ ট্রেডিশনাল কৌশল ব্যবহার করে সফলতা খুবই কম পাওয়া যাবে। 

এসময় বৈঠকের সভাপতি ও সিএসপিটির নির্বাহী পরিচালক ড. এনায়েত উল্ল্যা পাটওয়ারী সরকারকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আলোচনায় বসা যদিও সরকারের জন্য কঠিন তবুও বঙ্গবন্ধুকন্যা হিসেবে ও পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে হলেও এটা করা দরকার। তাহলে প্রধানমন্ত্রী প্রশংসিত হবেন ও পরবর্তী প্রজন্ম তাকে স্মরণে রাখবে। বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধীদলের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। 

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলসমূহের অপরিণামদর্শী ও অসহনশীল আচরণ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন তৎপরতা দেশকে গভীর সংকটে নিপতিত করছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য দেশের রাজনৈতিক দলসমূহ এবং নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দিয়ে সংলাপের আয়োজন করে এ রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিরোধীদলের উপর দমন-পীড়ন বন্ধ করা উচিত। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে সংলাপের আহ্বান জানানো যেতে পারে। নির্বাচনের পুনঃতফসিল এ ক্ষেত্রে একটি উপায় হতে পারে।

এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবীর ও সহযোগী অধ্যাপক আককাছ আহমদ, লোকপ্রশাসন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমদ'সহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।


বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর