শিরোনাম
রবিবার, ২২ মে, ২০২২ ০০:০০ টা

‘সাদা সোনার’ বিপর্যয়ের শঙ্কা

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম

‘সাদা সোনার’ বিপর্যয়ের শঙ্কা

উপমহাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র ও বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ হালদা নদী থেকে ২০২১ সালে ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল ৬ হাজার ৫০০ কেজি এবং ২০২০ সালে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি। কিন্তু এ বছর তিন দফায় ডিম সংগ্রহ করা হয় মাত্র ৩ হাজার ৫০০ কেজি। নামমাত্র ডিম সংগ্রহ করায় এবার বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে গবেষক ও ডিম সংগ্রহকারীরা আগামী তিথির (জো) অপেক্ষায় আছেন। আগামী ২৫ থেকে ৩১ মে পরবর্তী জো আছে। পূর্ণিমার তিথিতে বজ্রসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত, উজানের পাহাড়ি ঢল, প্রবল স্রোত, ঘোলা পানি না হওয়ায় মা মাছ ডিম ছাড়েনি। সঙ্গে আছে ডিম ছাড়ার ইতিবাচক পরিবেশ নষ্ট হওয়া। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া  বলেন, ‘এবার তিন দফায় মাত্র সাড়ে ৩ হাজার কেজি ডিম পাওয়া যায়। যা অতীতের তুলনায় সামান্য। তবে আগামী ২৫-৩১ মে পরবর্তী জো আছে।  আমরা সে সময়ের অপেক্ষায় আছি। আশা করছি, ইতিবাচক পরিবেশ পেলে মা মাছ  ডিম ছাড়বে। আর যদি নেতিবাচক কোনো ঘটনা ঘটে, তাহলে মনে করব বিপর্যয় ঘটছে।’ তিনি বলেন, ‘কারখানার বর্জ্য, রাবার ড্যাম, বাঁক কাটা, কুম কমা, নদীর গতিপথে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা, ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলন, ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাসহ মানবসৃষ্ট নানা অত্যাচারে মা মাছ ডিম কম ছাড়ছে। এভাবে চললে আগামীতে নদীটির প্রাকৃতিক চরিত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে।’ ডিম সংগ্রহকারী কামাল সওদাগর বলেন, এ মৌসুমে তিন দফায় ডিম ছাড়ে। কিন্তু তা অতি সমান্য। আমরা আগামী জো’র অপেক্ষায় আছি। তবে শঙ্কাও কাজ করছে। কারণ এরই মধ্যে সাদা সোনার খনি খ্যাত হালদা নদীর ওপর নানাভাবে অত্যাচার করা হয়েছে। হয়তো এর নেতিবাচক খেসারত দেওয়া শুরু হয়েছে।

সর্বশেষ কী হয় তা আল্লাহই ভালো জানেন।’  খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হালদা নদী মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। নদীর অংকুরিঘোনা থেকে রামদাশ হাট পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার এলাকায় ছিল কুম। কিন্তু নদীর পাড় রক্ষা ও ভাঙন রোধে এসব কুমের মধ্যে জিওব্যাগ ফেলায় অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। ফলে প্রজনন মৌসুমে কুমে পানির স্রোত কমে গেছে। মা মাছ এখানে ডিম না ছাড়ার শঙ্কা আছে। আগে কুমগুলোর গভীরতা ছিল ১০০ হাত, এখন ভরাট হয়ে আছে ২০ হাত। আগে কুম ছিল ২০টি, এখন আছে ১০টি। অন্যদিকে, হালদার ফটিকছড়ির ভূজপুর এবং ১০ কিলোমিটার দূরে হারুয়ালছড়ি খালে তৈরি করা হয় দুটি রাবার ড্যাম। বছরে হালদার উজানের অন্তত ৬ কিলোমিটার প্রায় পানিশূন্য অবস্থায় থাকে। এতে নদীর পরিবেশ-প্রতিবেশগত ক্ষতি ও নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ে। তাছাড়া, এ নদীর আশপাশের এলাকায় আছে অনেক শিল্প-কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানে নেই তরল বর্জ্য শোধনাগার। ফলে তরল বর্জ্যগুলো গিয়ে পড়ছে নদীতে। আছে আশপাশের এলাকার আবাসিক বর্জ্য। হালদা নদীর সঙ্গে যুক্ত আছে ১৯টি খাল। এসব খাল হয়ে দূষিত পানি পড়ছে নদীতে। হালদা নদীর উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়ির রামগড়, মানিকছড়িসহ পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে নদীটির দুই তীরে দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে তামাক চাষ। তামাকের নির্যাস ও চাষে ব্যবহৃত সার এবং রাসায়নিক মিশ্রিত পানি সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। ফলে রাসায়নিক দূষণে হালদার জলজ প্রাণী হুমকিতে পড়ছে। হালদা নদীতে তৈরি করা হয়েছে স্লুুইসগেট। ফলে শাখা নদীতে প্রবেশ করছে না মা মাছ। এ কারণে এখন মা মাছ শাখা নদীতে গিয়ে নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারছে না। তদুপরি, মা মাছ ডিম ছাড়ার পর দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন তারা ডলফিনের আক্রমণ থেকে বাঁচতে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শাখা নদীতে প্রবেশ করে। কিন্তু স্লুইসগেটের কারণে মা মাছ শাখা নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। গেটের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে হালদার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ফসলি জমি। সেখানে হচ্ছে না চাষ। হালদা নদীর ১৯ স্থানে কাটা হয়েছে বাঁক। ফলে কমছে মাছের বিচরণ ও প্রজনন। বাঁক না থাকায় প্রাকৃতিকভাবে কুমও তৈরি হচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে না মা মাছের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত পরিবেশ। তাছাড়া, কয়েক স্থানে চর জেগে ওঠায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।    

জানা যায়, ২০০৭ সাল থেকে হালদা নদীর মাছের ডিম সংগ্রহের তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ২০০৭ সালে সংগ্রহ করা হয় ২২ হাজার ৩১৪ কেজি। ২০০৮ সালে ২ হাজার ৪০০ কেজি, ২০০৯ সালে ১৩ হাজার ২০০ কেজি, ২০১০ সালে ৯ হাজার কেজি, ২০১১ সালে ১২ হাজার ৬০০ কেজি, ২০১২ সালে ২১ হাজার ২৪০ কেজি, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ২০০ কেজি, ২০১৪ সালে ১৬ হাজার ৫০০ কেজি, ২০১৫ সালে ২ হাজার ৮০০ কেজি, ২০১৬ সালে ৭৩৫ কেজি (নমুনা ডিম), ২০১৭ সালে ১ হাজার ৬৮০ কেজি, ২০১৮ সালে ২২ হাজার ৬৮০ কেজি, ২০১৯ সালে প্রায় ৭ হাজার কেজি, ২০২০ সালে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি এবং ২০২১ সালে ৬ হাজার ৫০০ কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর