শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২২:৪১

উন্নয়নের এই ট্রেন চলতে থাকুক

ড. আতিউর রহমান

উন্নয়নের এই ট্রেন চলতে থাকুক

টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মতো দেশে অনেক সময় সরকারের বদল হলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হয় বন্ধ হয়ে যায় কিংবা শ্লথ হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিভাজনের জের গিয়ে পড়ে উন্নয়ন অভিযাত্রায়। জানি, এমনটি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবে তা বহুবার ঘটতে দেখেছি। আর এর মূল্য দিতে হয়েছে ভুক্তভোগী জনগণকে। সেই বিবেচনায় নতুন  সরকারের জন্য যেমন নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে তেমনি জনগণের আকাশচুম্বী আকাক্সক্ষার চাপ মোকাবিলার নয়া চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে।  সাধারণত যখন উন্নয়নের ট্রেন খুব দ্রুত বেগে চলতে থাকে তখন জনগণ সেই ট্রেনকে ইচ্ছা করে থামিয়ে দেয় না। এবারের নির্বাচনেও তাই ঘটেছে। উন্নয়নের ট্রেনটি চলতে থাকুকÑ এ প্রত্যাশায় জনগণ তাদের ভোটের রায় দিয়েছেন। তাদের এ সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েই আমরা বুঝতে চেষ্টা করছি কী কী অর্থনৈতিক কারণে তারা ক্ষমতাসীন দলকে এমন ব্যাপক সমর্থন জানালেন।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এবারের নির্বাচনে কোনো ‘অ্যান্টি ইনকারবেন্সি’ ঢেউ জনমনে ওঠেনি। ক্ষমতাসীনরাই ফের ক্ষমতায় আসছে এমনটিই আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। এর পেছনে নিঃসন্দেহে ক্ষমতাসীনদের উন্নয়ন অভিযাত্রায় লাগাতার সাফল্য বড় ভূমিকা রেখেছে। সারা বিশ্বে যখন অর্থনৈতিক মন্দার লু হাওয়া বইছে তখনো বাংলাদেশ তার আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। মানুষ খেয়েপরে মোটামুটিভাবে স্বস্তিতেই জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়েছে। বিগত পাঁচ বছরে একটি হরতালও হয়নি। ‘হলি আর্টিজান’ সংকট ঘিরে সামাজিক যে ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছিল তাও সরকার শক্ত হাতেই মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। আর সে কারণেই সমাজ এখন অনেকটাই শান্ত। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকরা ফের বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছেন। নির্বাচনের বছর সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। অর্থনৈতিক এ সাফল্যের ধারাবাহিকতার পেছনের কার্যকারণ বুঝতে হলে সরকারপ্রধানের দৃঢ় প্রত্যয় ও বিচক্ষণতার সঙ্গে দেশ পরিচালনার সূত্রগুলোর দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের বিগত সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে তারা সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এর আগে অনেক সরকার তাদের ভিশনটা সেভাবে আর্টিকুলেট করতে পারেনি। এখন কোথায় তারা আছে এবং কোথায় তারা যাবে সে কথাটিও ঠিকমতো বলতে পারেনি। আমি বলব, ক্ষমতাসীন আগের সরকারের এটি একটি বড় ধরনের কৃতিত্ব যে তারা ভিশনটা দিতে পেরেছিল এবং সেই ভিশন তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’ এ স্থান পেয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে আমিও সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। সেই ভিশনে তারা বলেছিল, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বে। ডিজিটাল বাংলাদেশ একটি বড় কনসেপ্ট। এটা শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার বা সংস্কৃতির বিষয় নয়, দ্রুত কর্ম সম্পাদনের বিষয়। প্রযুক্তিনির্ভর এ কর্ম পদ্ধতি এখন ডিজিটাল সংস্কৃতির অংশ। ডিজিটাল কালচারের সবচেয়ে বড় কথা হলো, পরিকল্পনার পাশাপাশি সঠিক বাস্তবায়ন বা ইমপ্লিমেন্টেশন। অর্থাৎ শুধু পরিকল্পনা করলেই চলবে না, সেই পরিকল্পনা সঠিকভাবে নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, বর্তমান সরকার নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং সেই পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিগত মেয়াদের সরকারের একটি বড় সুবিধা ছিল তারা দুই টার্ম ধরে ক্ষমতায় ছিল। শুরুতেই বলেছি যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ধারাবাহিকতা না থাকলে এক সরকার যে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা মাঝপথে এসে আটকে যায়। এতে উন্নয়ন কার্যক্রম বিঘিœত হয়।

আমরা দেখেছি, ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার অনেক জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পরিবর্তন সাধিত হলে সেসব পরিকল্পনার বেশিরভাগই মাঝপথে থেমে যায়। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় ফিরে আসার পর অব্যাহতভাবে দুই টার্ম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন ছিল। ফলে তাদের পক্ষে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে সুবিধা হয়েছে। তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি। আমরা এর ফলও হাতে হাতেই পেয়েছি। সে সরকারের ধারাবাহিকতায় নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একই রয়েছেন। তাই তার নেওয়া নীতিমালাগুলো আরও ‘ধারালোভাবে’ নতুন পর্বে রূপায়ণের সুযোগ মিলেছে দেশবাসীর জন্য। বর্তমান সরকার আমলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তা এক কথায় বিস্ময়কর। উন্নয়ন কার্যক্রমের পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সঠিকভাবে তা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাতে পেরেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সময় এবং খরচ বেশি লাগলেও জনগণ তার সুফল পেতে শুরু করেছে। আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন খাতভিত্তিক আলোচনা করতে পারি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হচ্ছেÑ একটি দেশের জনগণের মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি পাওয়া। আমরা লক্ষ্য করছি, ২০০৮ সালে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় ছিল ৬৮৬ মার্কিন ডলারের মতো। ১০ বছরের মাথায় এসে এটা বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ বর্ণিত সময়ে মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় তো এমনি এমনি বাড়েনি। এ জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করব, শুধু বিনিয়োগ বাড়েনি একই সঙ্গে ভোগব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে বিনিয়োগ ও ভোগ তিনগুণ বেড়েছে। অর্থাৎ দেশে যে বিনিয়োগ হচ্ছে, তার ফসলটা সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছতে পেরেছে। তারা শুধু কেকটাই বড় করেনি, সেই কেকটা সবার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করেছে। যার প্রমাণ মেলে পরিসংখ্যানে।

২০০৮ সালে বাংলাদেশের জিডিপির পরিমাণ ৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরে সেই জিডিপির আকার ২৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এটা ২৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে বলে আমরা আশা করছি। ২০২০ সাল নাগাদ আমাদের জিডিপির আকার ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যাবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। সুতরাং এ কথা বললে ভুল হবে না যে বিগত ১০ বছরে দেশের অর্থনীতিতে চমৎকার গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও এ বিষয়টি প্রতিফলিত হতে দেখেছি আমরা। আমরা আরও লক্ষ্য করেছি, প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ টেকসইভাবে ৬ শতাংশের ওপরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। গত তিন বছর ধরে এটা ৭ শতাংশের ওপরে ছিল। গত অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আমরা আশা করছি, চলতি অর্থবছরে এটি হয়তোবা ৮ শতাংশ স্পর্শ করবে। পুরো বিশ্বে যে ১০টি দেশ টেকসইভাবে উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবার শীর্ষে রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়েও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। চলতি অর্থবছরের গত ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। আমরা তো চলতি অর্থবছরে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি স্পর্শ করব বলে প্রত্যাশা করছি। ভারত এবং চীনও প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে পেছনে পড়ে রয়েছে। আমি বলব, বিগত দশক ধরেই আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের গতি এসেছে। ডিজিটাল কালচারের একটি বড় গুণ এবং সাফল্য নির্ভর করে প্রধান নির্বাহী কীভাবে নেতৃত্ব দেন তার ওপর। আমাদের বড়ই সৌভাগ্য যে,  প্রধানমন্ত্রী, যিনি আমাদের প্রধান নির্বাহী, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দিনবদলের সনদ তিনি শুধু তৈরি করেননি, একে হৃদয়ে ধারণ করেছেন এবং সফলভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছেন। আর তার গতিশীল নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখেই জনগণ তাকে ফের সরকার পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছে। নতুন সরকার গঠন করেই তিনি পুরো উদ্যমে কাজে নেমে পড়েছেন। তার এই উদ্যম ও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেই আগামীর বাংলাদেশ আরও গতিময় ও উন্নতর হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই শুধু ব্যাপক মাত্রায় উন্নয়ন অর্জন করেছে তা নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অর্জন ঈর্ষণীয়। বিশেষ করে সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের উন্নয়ন যে কোনো বিচারেই বিস্ময়কর। এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের উত্থান আমরা লক্ষ্য করেছি। অনেক দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামাজিক উন্নয়ন ঘটে না। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক উন্নয়ন তাল মেলাতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে যখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন সীমিত ছিল, মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় কম ছিল তখনো আমাদের সামাজিক উন্নয়নের একটি গতি ছিল। গত দশকে সামাজিক উন্নয়নে গতি আরও বেগবান হয়েছে। কোনো কোনো সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকেও অতিক্রম করে গেছে। শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু ইত্যাদি সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে কমেছে তা পুরো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ঈর্ষণীয়। আমাদের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় যে গতিতে বেড়েছে তা ভারতের তুলনায় তিন গুণ বেশি। ২০২০ সালে আমরা ভারতের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়ের যে অঙ্ক তাকে ধরে ফেলব। আমরা এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে অনেক আগেই পেছনে ফেলে চলে এসেছি। মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় বৃদ্ধির প্রতিফলন আমরা সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। আর তাই জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রাথমিক ছাড়পত্র দিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট সত্ত্বেও আমাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা মজবুত। সারা বিশ্ব আমাদের অর্থনীতি ও সমাজের এ গতিময়তা দেখে বিস্মিত। মাতৃমৃত্যু হ্রাস এবং অন্যান্য সামাজিক সূচকে উন্নয়নের কারণে আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এক দশক ধরেও গ্রাম পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে কমিউনিটি হাসপাতালগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এর মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে এবং নানাভাবে উন্নতি হচ্ছে। শুধু প্রচলিত শিক্ষা নয় কারিগরি শিক্ষা ক্ষেত্রেও জোর দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক শিক্ষা বিস্তারের হারও বেশ ভালো। সরকার এ জন্য প্রাইভেট সেক্টর, এনজিও সবাইকে কাজ করতে দিয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রে ভালো উন্নতি হচ্ছে।

সরকার সবাইকে নিয়ে একযোগে কাজ করছে। বাংলাদেশ জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ব্যাপকভাবে সফল হয়েছে। ১৯৭২ সালে একটি দম্পতির কম করে হলেও ৫ থেকে ৬টি সন্তান থাকত। সেটা হ্রাস পেয়ে এখন ২ দশমিক ১-এ নেমে এসেছে। তার অর্থ হচ্ছে প্রায় রিপ্লেসমেন্ট রেটের সমান হয়ে গেছে আমাদের সমাজে। এর ফলে আমাদের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয়ও বাড়ছে। মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় বাড়ছে কিন্তু মানুষ সেভাবে বাড়ছে না। এ আয়টা যেহেতু আমরা সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে পারছি সে কারণেই ভোগের পরিমাণও বাড়ছে। মানুষের আয় এবং ভোগ বাড়ার কারণে পুষ্টি গ্রহণের মাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি দারিদ্র্যের হার হ্রাসের মাধ্যমে। দারিদ্র্য এবং অতিদারিদ্র্য- দুই-ই একযোগে কমছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ের ইতিবাচক এ ধারাকে আরও বেগবান করার সংকল্প প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাচনী ইশতেহারে প্রকাশ করেছেন। নতুন সরকারের দায়িত্ব নিয়েই তিনি বলতে শুরু করেছেন, সমৃদ্ধির এ ইশতেহার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন। নিঃসন্দেহে, এটি আমাদের সবার জন্যই এক আশাজাগানিয়া বার্তা। আগামী দিনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্যও যথেষ্ট কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আমরা সমুন্বয় থেকে অনেক দিন ধরেই চর উন্নয়নে কাজ করছি। ‘ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্স’-এর আওতায় দেশি-বিদেশি অনেক বেসরকারি সংগঠন চর নিয়ে কাজ করছে। চরের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আমরা আন্দোলন করছি। কিছু দিন আগে আমরা বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসেছিলাম। এ বিষয়টি যেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্ব পায় সেই দাবি পেশ করেছি। আমরা চরের মানুষের উন্নয়নের জন্য চর ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীও চরের মানুষের উন্নয়নের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ সমর্থন করেন। কয়েক বছর ধরেই তিনি জাতীয় বাজেটে চরের জন্য নিয়মিত টাকা বরাদ্দ রাখছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকায় চর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত এ অর্থ ব্যয় করা যাচ্ছে না। সে কারণেই আমরা প্রস্তাব করেছি, পিকেএসএফের আদলে চর উন্নয়ন ফাউন্ডেশন তৈরি করা হোক। যার মাধ্যমে সরকার, ব্যক্তি খাত, এনজিও সবাই মিলে চর উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারে। নতুন সরকার চরের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য এমন একটি ইতিবাচক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিশ্চয়ই নিতে পারে। নির্বাচন-উত্তর বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা যথেষ্ট বলেই মনে হচ্ছে। কারণ নির্বাচনের আগে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকে। নির্বাচনের মাধ্যমে সেই অনিশ্চয়তা কেটে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না বলে মনে করা অন্যায় হবে না।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তারা কার্যকর ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি অনেকটাই হ্রাস পাবে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে স্পেশাল ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তা বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে। দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ জোনগুলো বাস্তবায়ন করার প্রয়োজন রয়েছে।

এসব ইকোনমিক জোনে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও বিশেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে। আশার কথা এই যে, ইতিমধ্যেই বেশ কিছু স্পেশাল ইকোনমিক জোন কাজ করা শুরু করেছে। আগামীতে আমাদের দেশের বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অংশ আসবে এসএমই খাত থেকে। তারা হবেন ডিজিটাল উদ্যোক্তা। ছোট ছোট উদ্যোক্তারাই দেশকে অনেক দূর নিয়ে যাবেন। জাপানসহ অনেক দেশের বিদেশি উদ্যোক্তারাও এসএমই খাতে বিনিয়োগে দারুণ উৎসাহী। আর তাদের পছন্দ বাংলাদেশ। সরকার থেকে শুধু সহায়তা করবে। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলছেন, আমরা ব্যবসা করি না, ব্যবসায়ের সুযোগ তৈরি করে দিই। উদ্যোক্তাদের মাঝে তার এ আশ্বাসের ফলে এক ধরনের ভরসার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালে প্রায়ই বলতাম ভরসার পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের মূল কাজ। আশা করছি, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এ ভরসার পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তারা ভালো ব্যবসা করবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডকে আমরা মাত্র ৭ বছরে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে রেখে এসেছি। এটা এখন তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি সবুজ শিল্পায়নের জন্য বিদেশি মুদ্রায় বিশেষ তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে এ ধরনের আরও বেশি করে ডেভেলপমেন্টাল কাজ করতে পারে তাহলে বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাবিহীন সহজে ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এ কথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। সর্বত্র সুশাসন বজায় রাখার বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে সুশাসনের ভিত্তিতে বেশ খানিকটা প্রসারিত করেছে। গুণমানের পাবলিক সেবা প্রদানে মনোযোগী থেকে আমরা সুশাসনের পাটাতন আরও মজবুত নিশ্চয়ই করতে পারি।

আমরা ইতিমধ্যেই স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের কাজ শুরু করে দিয়েছি। একটি টাস্কফোর্স গঠন করে বাংলাদেশ অনেকের আগেই এ কাজটি শুরু করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এ উত্তরণের জন্য আমাদের হাতে এখনো পর্যাপ্ত সময় আছে। আমরা প্রায় ৮-৯ বছর সময় পাচ্ছি। এ সময়ের মধ্যে আমরা আমাদের প্রস্তুতিগুলো সম্পন্ন করতে পারব বলে আশা করছি। এ সময়ের মধ্যে আমাদের জনশক্তির দক্ষতাও বাড়াতে হবে। রপ্তানি আরও দ্রুত হারে বাড়াতে হবে। আমাদের সবুজ অর্থনীতির দিকে এগোতে হবে। কাজগুলো সঠিকভাবে করতে পারলে কারও কাছ থেকে আমাদের আর আর্থিক সহযোগিতা নেওয়া লাগবে না বরং আমরাই অন্যদের সহযোগিতা করতে পারব। ইতিমধ্যে আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রা সারা বিশ্বে সাড়া ফেলেছে। প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারাকে ধরে রাখতে পারলে নিশ্চয়ই আমাদের উন্নয়নের এ ধারা সর্বত্রই প্রশংসিত হবে। আমরা এই মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের একটি সুবিধা সাময়িকভাবে পাচ্ছি। তবে বাণিজ্য যুদ্ধ কারও জন্যই দীর্ঘ মেয়াদে সুবিধা বয়ে আনতে পারে না। বাণিজ্য যুদ্ধ সবারই ক্ষতি করে। আশার কথা এই যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা কর্তৃপক্ষ বলেছে, আপাতত তারা এ যুদ্ধ মিনিমাইজ করতে চান। তবে চীনা অর্থনীতি এ বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। চীন থেকে অনেক উদ্যোক্তা বাংলাদেশে চলে আসতে পারে। চীনে যে পণ্যটি তৈরি করতে ৪ মার্কিন ডলার খরচ হয় সেই পণ্য বাংলাদেশে তৈরি করতে খরচ হয় এক ডলার। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই অনেক বিদেশি উদ্যোক্তা বাংলাদেশে চলে আসবে। এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের বস্ত্র রপ্তানির হার বেড়ে গেছে। সামগ্রিকভাবেও এ বছর তৈরি পোশাক রপ্তানির হার খুবই বাড়ন্ত। তাই আমাদের স্পেশাল ইকোনমিক জোনগুলো খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার এবং যেসব নীতি সংস্কার করব বলে আমরা কথা দিয়েছি সেগুলো খুব তাড়াতাড়ি বাস্তবায়ন করা দরকার। একই সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নতি করতে হবে। বিমান পরিবহনে আমরা ইতিমধ্যেই প্রচুর উন্নতি করেছি। অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর সংস্কার কাজ এখন জোরেশোরেই চলছে। রেল ও নদী পথেরও উন্নতি হচ্ছে। সরকার চারদিকে খেয়াল রেখেই এগোচ্ছে এবং সে কারণেই এ সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় আমাদের উন্নয়নের গতি বেড়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। এক দশক ধরে ক্ষমতাসীন থাকার কারণেই ক্ষমতাসীন সরকার এতগুলো মেগা প্রকল্প হাতে নিতে পেরেছে। পাশাপাশি, জনকল্যাণধর্মী অনেক প্রকল্পও আবার সরকার হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধীসহ সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানের নানা অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তা ছাড়া উগ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক শান্তি রক্ষার দৃঢ় নীতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। ফলে বিনিয়োগের জন্য সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। আশা করছি, বিগত ১০ বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতার সুফল পুঁজি করে নতুন সরকার উন্নয়নবান্ধব নানামুখী কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করবে এবং জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে আগের মতোই সদা তৎপর থাকবে।  জনপ্রত্যাশা তুঙ্গে। তাই খুবই সতর্কতার সঙ্গে সরকারকে পা ফেলতে হবে।  সাফল্য অর্জনের দিকে নিরন্তর দৃষ্টি নিবন্ধ রাখতে হবে।

            লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।


আপনার মন্তব্য