Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ জুন, ২০১৯ ২২:৪৪

সম্প্র্রদায়ের দায়

তসলিমা নাসরিন

সম্প্র্রদায়ের দায়

এতদিনে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায় থেকে একটা ভালো কাজ করা হলো। ৫০ জন মুসলিম নাগরিক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লিখেছেন। চিঠিতে দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমটি নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে কর্তব্যরত ডাক্তারদের নিগ্রহ এবং দ্বিতীয়টি রাতের কলকাতায় প্রাক্তন মিস ইন্ডিয়া ঊষসী সেনগুপ্তের ওপরে আক্রমণ। দুটি ক্ষেত্রেই অপরাধীরা মুসলিম। চিঠিতে লেখা হয়েছে, মুসলিম অপরাধীদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরা মুসলিম বলে যেন প্রশাসন নিষ্ক্রিয় না থাকে, যেন অপরাধীদের ছাড় দেওয়া না হয়। মুসলিম তোষণের রাজনীতি তো সেই কতকাল ধরে চলছে। সিপিএমের আমলে মুসলিম তোষণ ছিল। তৃণমূলের আমলে তা বেড়ে ত্রিগুণ হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নারীবিরোধী ফতোয়াবাজ ইমামদের মাসে মাসে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা তো করেছেনই, মঞ্চে তুলে বক্তৃতা দেওয়ানোর ব্যবস্থাও করেছেন, গলায় তাদের মালাও পরিয়েছেন। নিজে তিনি কালীভক্ত হয়েও নামাজ রোজা সবই করেছেন, মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুসলমান হওয়ার কলেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’ বলেছেন, শুধুই মুসলিম তোষণের জন্য। তোষণ করলেই, তার বিশ্বাস ভোট জোটে। মুসলিমদের মধ্য থেকে কখনো যে এই তোষণ নিয়ে আপত্তি উঠবে, তা নিশ্চয়ই তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।

প্রশ্ন হলো, এত বছর পর হঠাৎ আজ কেন মুসলিম নাগরিকদের মনে হচ্ছে মুসলিম তোষণ বন্ধ হোক? রাজনীতিকরা ভোটের জন্য মুসলিম তোষণ করেন, এ নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাধারণ মুসলিমদের এ কারণে অভিযোগ শুনতে হয়, তারা অপরাধ করেও ক্ষমা পেয়ে যায় মুসলিম বলেই, তারা যোগ্যতা না থাকলেও সুযোগ-সুবিধে পেয়ে যায় মুসলিম বলেই! আজকাল অভিযোগ করেই মানুষ ক্ষান্ত হচ্ছে না, গালি দিচ্ছে, কখনো কখনো শুধু গালি নয়, হামলাও করছে। রাজনীতিকদের মুসলিম তোষণ করেন, এই রাগটা তো নিরাপত্তার বেষ্টনীতে থাকা রাজনীতিকদের পিটিয়ে মেটাতে পারে না কেউ। তাই হাতের কাছে নিরীহ গোবেচারা মুসলিম পেলেই ধরে বেঁধে পেটাচ্ছে কিছু কট্টর হিন্দু। সত্যি কথা বলতে কী, হিন্দুকে বেশি কট্টর হিন্দু, হিন্দুকে মুসলিমবিদ্বেষী বানানোর পেছনে কাজ করছে রাজনীতিকদের, বিশেষ করে হিন্দু রাজনীতিকদের, মুসলিম তোষণ। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমাকে, মানবতায় বিশ্বাস করা যে আমি ধর্ম নিরপেক্ষ, যে আমি কোনও অপরাধ করিনি, তাড়ানো হয়েছিল, সেও তো সামনের পঞ্চায়েত নির্বাচনে মুসলিমদের ভোট পাওয়ার জন্য। ভোটের জন্য রাজনীতিকরা আদর্শের বাইরে যেতে একটুও পিছপা হন না, এমনকি খুন করতেও দ্বিধা করেন না। সচেতন মুসলিম নাগরিকবৃন্দ তখন কোথায় ছিলেন আমাকে যখন গৃহবন্দী করেছিল সিপিএম সরকার, যখন মুসলিম তোষণের উদ্দেশে আমাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েছিল সরকার? কোথায় ছিলেন তাঁরা যখন ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বরে মুসলিম গুন্ডারা পাবলিক বাসগুলোয় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, জনগণের সম্পত্তি নষ্ট করেছিল, কলকাতার রাস্তা অচল করে দিয়েছিল?

জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, ‘সংখ্যালঘুদের মনে নিরাপত্তার বোধ তৈরি করার দায়িত্বটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর বর্তায়’। এই দায়িত্বটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় কিছু কিছু রাজ্যে নিশ্চয়ই চমৎকার পালন করেছে। সে কারণে সংখ্যালঘুর মনে নিরাপত্তার বোধ জন্ম নিয়েছে। আর সে কারণেই সংখ্যালঘুও সংখ্যাগরিষ্ঠকে রাগ হলে পেটাতে পারে। এই সেদিন সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের পিটিয়েছে রাজ্যের সংখ্যালঘুরা। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বোধ নেই বলে এমন কোনও ঘটনা ঘটে না। সংখ্যালঘুরা একাট্টা হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পেটায় না। নিরাপত্তার বোধ থাকাটা সংখ্যালঘুদের জন্য খুব জরুরি, কিন্তু তারা অপরাধ করলেও শাস্তি না পাওয়ার ব্যবস্থা যাঁরা করেন, তাঁরা অন্যায় করেন। এই অন্যায় পশ্চিমবঙ্গে অনেক বছর চলেছে বলেই আজ প্রতিবাদ হচ্ছে, ফলে হিন্দু কট্টরপন্থিরা, এমনকি হিন্দু রাষ্ট্রবাদীরাও জনপ্রিয় হচ্ছে রাজ্যে। যে রাজ্যে তাদের কোনও অস্তিত্বই ছিল না বলতে গেলে, সে রাজ্যে আজ তারা সবচেয়ে জনপ্রিয় দল তৃণমূল কংগ্রেসের শেকড় নাড়িয়ে দিয়েছে। তোষণের প্রতিক্রিয়া কী ভয়াবহ হতে পারে, তা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, পুরো দেশ দেখছে।

মুসলিম নাগরিকবৃন্দ যদি তোষণের বিরুদ্ধে আগেই সচেতন হতেন, তাহলে হয়তো রাজনীতিকরাও কিছুটা সামলে চলতেন, আর মুসলিম-বিদ্বেষ দেশজুড়ে এতটা ছড়িয়ে পড়ত না। এখন প্রশ্ন হলো, এই সচেতন মুসলিম নাগরিকবৃন্দ কি জানেন না ২০১১ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরতিহীন করে যাচ্ছেন মুসলিম তোষণ! মুসলিমদের তিনি দুধ দেওয়া গরুর মতোই মনে করেন। নিজেই বলেছেন তাঁর দুধ দেওয়া গরু কোনও অপরাধ করলেও তিনি গরুর বিচার করবেন না। তাহলে কি সচেতন মুসলিম নাগরিকবৃন্দ লোকসভা নির্বাচনের ফল দেখে তোষণের সমালোচনা করার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? কারণ মুসলিম তোষণ এখন হিতে বিপরীত হতে পারে। কলকাতার এই প্রতিবাদী মুসলিম নাগরিকবৃন্দ নিশ্চয়ই জানেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৩০ হাজার মসজিদের ইমামের জন্য প্রতিমাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা আর মুয়াজ্জিনের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা দান করবেন ঘোষণা করেছিলেন! ওই টাকা তো জনগণের করের টাকা থেকেই গেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এটাও ঘোষণা করেছিলেন যে, প্রতিটি ইমামকে তিনি জমি দেবেন বাড়ি বানানোর জন্য এবং টাকা দেবেন তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচের জন্য। মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পুরোহিতদের জন্য এই সুযোগ-সুবিধে পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেননি। এটি করে তিনি মুসলিমদের ভালোর চেয়ে বরং খারাপ করেছেন।

হিন্দু হয়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন নামাজ পড়তেন, মোনাজাতের হাত তুলতেন, বা রোজা করতেন, বা সূরার আয়াত আওড়াতেন, তখনো কিন্তু মুসলিম নাগরিকদের কেউ বলেননি, ‘আমাদের ভোট পেতে হলে আপনার মুসলমান সাজার দরকার নেই। আপনি স্বধর্মে থেকেই রাজ্যের সব নাগরিককে সমান চোখে দেখুন, সবার উন্নতির চেষ্টা করুন’। সচেতন নাগরিকবৃন্দ কিন্তু সব বুঝেছিলেন, কিন্তু মুখ খোলেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ, যার অর্থ ‘আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়, তার কোনও শরিক নেই’ বলার পর মন্দিরে গিয়ে দেব দেবীর পুজো করেছেন, তখনো কেন তাঁরা প্রতিবাদ করেননি, বলেননি, ‘আপনাকে আমাদের কলেমা মুখস্থ বলতে হবে না, আপনি স্বধর্মে থেকেই আমাদের সেবা করুন, দেশের অন্য নাগরিকদের সঙ্গে যে ব্যবহার করছেন, তা আমাদের সঙ্গেও করুন। আপনি ভালো কাজ করলে আমরা মুসলিমরা আপনাকে ভোট দেব, আমাদের ভোট পেতে হলে আমাদের ধর্ম গ্রহণ করার দরকার নেই, আমাদের মোল্লাদের সুবিধে দেওয়ার দরকার নেই, আমাদের চোর ছেচড় খুনিদের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার দরকার নেই। তা হিতে বিপরীত হতে পারে’। হয়েছেও বটে। আগে এমনভাবে মুসলিমদের ওপর হামলা হয়নি, এখন যেভাবে হচ্ছে। আগে গরুর মাংস খেয়েছে বলে মুসলিমদের মার খেতে হতো না, জোর করে তাদের জয় শ্রীরাম বলানোও হতো না।

কাশ্মীরের মুসলমানরা যে ৪ লক্ষ কাশ্মীরি পন্ডিতকে কাশ্মীর থেকে বের করে দিয়েছে, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ কি তখন এই সচেতন নাগরিকবৃন্দ করেছেন? কাশ্মীরে থাকতে হলে মুসলমান হতে হবে, নয়তো মরতে হবে, বাঁচতে হলে কাশ্মীর ছাড়তে হবে। এই ঘোষণার বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানরা কি কোনও বাক্য উচ্চারণ করেছেন? আমার তো মনে হয় না। তাদের শুধু কাঁদতে দেখেছি যখন কোথাও কোনও দেশে অমুসলিমরা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করে। আইসিস, বোকো হারাম, আল শাবাব নামের মুসলিম সন্ত্রাসী দল যখন মুসলমানদের জবাই করে, যখন সৌদি আরবের ধনী মুসলমান গরিব মুসলমান শ্রমিকদের অকথ্য অত্যাচার করে, তখন তো এই সচেতন মুসলিম নাগরিকবৃন্দ প্রতিবাদ করেন না!

ধুলাগড়, বসিরহাট, ডায়মন্ড হারবারে মুসলমানরা অপরাধ করলেও সরকার চুপ করে ছিল। টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম বরকতি কলকাতা শহরের ধর্মতলায় দিন-দুপুরে বিশাল এক জনসভায় আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিল, আমার মাথার দাম ঘোষণা করেছিল, কেউ যদি আমাকে খুন করে, তাহলে তাকে তিনি এত টাকা দেবেন, যে টাকার শেষ নেই, একেবারে ‘আনলিমিটেড এমাউন্ট’। অসংখ্য পুলিশ ছিল সে সভায়, বরকতিকে গ্রেফতার করা তো দূরের কথা, কেউ প্রশ্ন পর্যন্ত করেনি কেন সে মানুষের মাথার দাম ঘোষণা করেছে যা ভারতের আইনে অবৈধ? পুলিশেরা বরং তাকে নিরাপত্তা দিয়েছে। মন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী তাকে জামাই আদর করেছে। তাকে উপঢৌকন পাঠিয়েছে। সত্যি বলতে কী, রাজনীতিকরা কখনো সাধারণ মুসলিমদের তোষণ করেননি। তারা মূলত নারীবিরোধী মানবতাবিরোধী মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সভ্যতাবিরোধী অশিক্ষিত চতুর মুসলিম-মৌলবাদীদের তোষণ করেছেন বছরের পর বছর। যে মুসলিম মৌলবাদী মুসলিম সম্প্রদায়কে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে। সাধারণ মুসলমানদের অধিকাংশ আগেও বস্তিতে বাস করেছে, এখনো বাস করছে।

আগে মুখ বুজে থাকলেও মুসলিম নাগরিকবৃন্দের একটি ক্ষুদ্র অংশ যে মুসলিম তোষণ চান না বলেছেন, এটিই আশার আলো জাগিয়েছে। হয়তো মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষিত আরও অনেকে সমস্যা অনুধাবন করতে পারবেন। যদিও বখাটে মুসলমানদের সব অন্যায়ের দায় মুসলিম সম্প্রদায়ের সবার ওপর বর্তায় না, তারপরও যদি দায়িত্ব নিয়ে কেউ কেউ এগিয়ে আসেন সম্প্রদায়ের সবাইকে শিক্ষিত এবং সচেতন করতে, ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে নিজের কাজের পরিচয়কে বড় করায় উৎসাহ দিতে, তাহলে তারাও যেমন মানুষের মতো মানুষ হবে, আর রাজনীতিকরাও তাদের দুধ দেওয়া গরু না ভেবে মানুষ ভাবতে শিখবেন।             

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।


আপনার মন্তব্য