শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:১৮

ছাত্র রাজনীতির কি প্রয়োজন আছে?

জাকারিয়া চৌধুরী

ছাত্র রাজনীতির কি প্রয়োজন আছে?

আছে। তবে দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থের জন্য নয়। ছাত্র রাজনীতি হতে হবে নাগরিক স্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ ও মানব স্বার্থের প্রয়োজনে। যখনই যেখানে এসব বৃহত্তর স্বার্থবিরোধী রীতিনীতি ও কার্যকলাপ মাথাচাড়া দেবে তখন মুক্ত ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারী ও রক্ষাকারী তরুণ ছাত্রসমাজ এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে ও রুখে দাঁড়াবে, এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। ন্যায্য অধিকার আদায় ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বে যেমনটি ছিল ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’, যেমনটি চলছে পরিবেশ রক্ষার জন্য সুইডেনের ১৬ বছরের ছাত্রী গ্রিটা থান বার্গের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী স্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। দলভুক্ত হয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সহিংসতায় লিপ্ত হবে এটা জাতি চায় না। ছাত্রসমাজকে আমরা দেখতে চাই জাতির বিবেক হিসেবে, দলীয় স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে নয়। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় আমাদের দেশে দলীয়করণ এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আমলা, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী- সমাজের কোনো পেশা ও স্তর আর দলীয়মুক্ত নয়। দলীয় তুষ্টি না হলে কোনো ক্ষেত্রেই নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ সম্ভব নয়। ফলে মেধা ও দক্ষতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য ও তোষামোদী এখন প্রধান বিবেচ্য। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাগামহীন আর্থিক দুর্নীতি। উন্নয়নের জন্য গৃহীত কোনো সরকারি প্রকল্প নির্ধারিত সময় ও অর্থ বরাদ্দে শেষ হয় না। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজ এক দশক পরে এখনো সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়নি দুর্নীতির কারণে। প্রকল্প যাও বা হয়, হয় নিম্নমানের। জাতিকে দিতে হয় এর খেসারত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশকে যতই উন্নয়নের পথে নিয়ে যান না কেন, তার এই শ্রম ও প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে, ব্যর্থ হবে যদি সর্বগ্রাসী দুর্নীতির ঢল রোধ করা না যায়। দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের মনকে দুর্নীতিমুক্ত করার জাদুকাঠি তো প্রধানমন্ত্রীর হাতে নেই। এর জন্য প্রয়োজন নৈতিকতা ও মানবতার চর্চা।

আমি যদি প্রশ্ন করি একজন ডাক্তার যার নৈতিক দায়িত্ব রোগীকে সুস্থ করা, একজন প্রকৌশলী যার নৈতিক দায়িত্ব দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেতু তৈরি করা, একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব ছাত্রকে সঠিক শিক্ষা দান, একজন বিচারকের নৈতিক দায়িত্ব সব রকম প্রভাবমুক্ত থেকে ন্যায়বিচার করা, একজন পুলিশের নৈতিক দায়িত্ব নিরপেক্ষতা বজায় রেখে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা তাহলে তারা কেন দলভুক্ত বা দলীয় প্রভাবযুক্ত হয়ে তাদের নৈতিকতা ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে পশুর চেয়ে অধম জীবন কাটাবে? তাহলে কি আমাদের সমাজে বিবেক-বিবেচনা বলে কিছু থাকবে না? থাকবে শুধু টাকার গরমি ও ক্ষমতার দাপট। খাঁচায় থাকা পোষা পাখি ভালো খেয়ে থেকে তবু কেন মুক্ত জীবনের জন্য ছটফট করতে থাকে? আর আমরা ভোগ-বিলাসিতার জন্য দুর্নীতির খাঁচায় বন্দী থেকে উড়তে শেখা ভুলে যাব? আমরা কি তাহলে পশু-পাখির চেয়েও অধম জীব হয়ে জীবন পার করব? আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন শুধু মেধা ও বুদ্ধি  দিয়ে নয়, সেই সঙ্গে দিয়েছেন বিবেক। তাই আমরা আল্লাহর কাছে, বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ।

আমার সময়ে আমরা ছাত্র রাজনীতি করেছি আদর্শের জন্য, ব্যক্তিগত লাভ ও ফায়দার জন্য নয়। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলন, ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল কোনো দলীয় স্বার্থ আদায়ের জন্য নয়। ভাষা আন্দোলন হয়েছিল বাংলা রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। ’৬৯ সালের আন্দোলন হয়েছিল স্বাধিকারের জন্য বঙ্গবন্ধুর উপস্থাপিত ছয় দফার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে দেশদ্রোহিতার মিথ্যা অভিযোগে বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য। ’৯০ সালে আন্দোলন হয়েছিল স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে।

মেধার সঙ্গে বিবেক না থাকলে কী হয় তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত বুয়েটের ঘটনা। বুদ্ধির জোরে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা যায় কিন্তু তার বিশ্বব্যাপী ধ্বংস থেকে মানব-জাতিকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন জাগ্রত বিবেক ও বিবেচনা। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে তারই সহপাঠীরা শুধু হত্যাই নয়, যেভাবে হত্যা করল তা পৈশাচিক ও বিকৃত মনের পরিচয় বহন করে। অথচ তারা পেশাদার খুনি বা অপরাধী নয়। আপনার আমার মতো স্বাভাবিক মানুষ। তারা শিক্ষিত। তারা সবাই মেধাবী। আমাদের সমাজকে নিয়ে ভয় এখানেই। তাহলে কি আমাদের গোটা সমাজেই পচন ধরেছে বিবেকহীনতা ও মানবতাহীনতার কারণে? এই অভিশপ্ত সমাজজীবন থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি থাকবে শুধু ছোট মনের বড় ডাক্তার, বড় ইঞ্জিনিয়ার, বড় উকিল, ব্যারিস্টার, বড় প্রযুক্তিবিশারদ হওয়ার জন্য? অতীতে মানুষ নৈতিকতা শিখত ধর্ম ও দর্শন শাস্ত্র থেকে, যার চর্চা এখন নেই বললেই চলে। বুয়েটে এই মর্মান্তিক ঘটনায় শুধু একটি মেধাবী ছেলের প্রাণ গেল তা নয়, সেই সঙ্গে আরও ১৯ জন সম্ভাবনাময় ছাত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে গেল এবং দেশ হারাল উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার বিনীত আবেদন, তিনি যেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও মানবিকতা চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যসূচি প্রচলন করেন। সেই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা করে গোটা মানবজাতিকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাদানের জন্য এ ব্যাপারে স্কুল-কলেজে জ্ঞান অর্জন করার ব্যবস্থা নেন।

লেখক : বাংলাদেশ সরকারের সাবেক উপদেষ্টা।


আপনার মন্তব্য