শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:১২

নোবেল বিজয়ী বাঙালি অভিজিৎ

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

নোবেল বিজয়ী বাঙালি অভিজিৎ

বিশ্বের কোনো একটি অংশ বা গোটা বিশ্বেই সার্বিকভাবে দারিদ্র্যের কারণ ও তা দূরীকরণের উপায় নিয়ে এর আগে বহু গবেষণা হয়েছে এবং নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন বহু অর্থনীতিবিদ। তাদের কৃতিত্ব, দর্শন ও মেধার প্রতি বিন্দুমাত্র তির্যক দৃষ্টিপাত না করেও বলা যায়, দারিদ্র্যবিষয়ক সেই গবেষণাগুলো ছিল বেশির ভাগই গজদন্তমিনারে বসে করা। কলকাতার বালিগঞ্জের আদি বাসিন্দা, সাউথ পয়েন্ট স্কুল, প্রেসিডেন্সি, জেএনইউ এবং হার্ভার্ডের কৃতী ছাত্র অভিজিতের কাজের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি দারিদ্র্য দেখা, দারিদ্র্যের কারণ খোঁজা এবং সে কারণ দূর করার উপায় ভেবে বের করা সবটাই করেছেন দরিদ্রের চোখ দিয়ে। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, তিনি নিজে দরিদ্র পরিবারের সন্তান কিংবা তাকে জীবনযাত্রায় কঠিন অর্থসংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এসবের কোনোটাই নয়। তা সত্ত্বেও তিনি দরিদ্রের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক কঠিন তত্ত্বগুলো বোঝার কথা করেছেন। আর তা সম্ভব হয়েছে তার আপাদমস্তক বাম-মননের জন্য। মনে মনে নিজেকে একটি দরিদ্র পরিবারের সদস্য হিসেবে ভেবে নিয়ে তিনি সমস্যার গভীরে ঢোকার চেষ্টা করেছেন। দরিদ্রের সমস্যা বুঝে দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায় খুঁজেছেন। ছাত্রাবস্থায়ই বাম আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন অভিজিৎ। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর করার সময়ই ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হয়ে তিহার জেলে ১০ দিন কাটাতে হয় অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এমনকি পুলিশের লাঠির বাড়িও খেতে হয়েছিল তাকে। ২১ বছর পর আরও একবার অর্থনীতির নোবেল এলো কলকাতায়। ১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেনের পর ২০১৯-এ সম্প্রতি ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অধ্যাপক অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। দুনিয়াব্যাপী দারিদ্র্য দূর করার জন্য পরীক্ষামূলক পথের স্বীকৃতি হিসেবেই এলো তার পুরস্কার। তার সঙ্গে পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছেন তার স্ত্রী এবং একদা ছাত্রী এস্থার দুফেলো ও হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমার। অভিজিৎ ও এস্থার হলেন আবদুল লতিফ জামিলা পোভার্টি অ্যাকশন ল্যাব নামক গবেষণা কেন্দ্রের যুগ্ম-প্রতিষ্ঠাতা। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে অভিজিৎ আর এস্থার ষষ্ঠ দম্পতি। বালিগঞ্জের একটি বর্ধিষ্ণু পরিবারে জন্ম অভিজিতের। তার বাবা দীপক ব্যানার্জি ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান।

মা নির্মলা দেবীও একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। অর্থনীতির পরিম-লেই কার্যত বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। নোবেলজয়ী অশ্বেতাঙ্গ অর্থনীতিবিদ হিসেবে অভিজিৎ তৃতীয়। সেই তিনজনের মধ্যে দুজনই বাঙালি; বঙ্গবাসীর তা নিয়ে গর্ব হওয়াই স্বাভাবিক। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল জয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত। তিনি বলেছেন, তাদের গবেষণার অভিমুখ বৈষম্য দূরীকরণ। ওর গবেষণার নির্দিষ্ট বিষয় হলো একটি দেশের উন্নয়নের সঙ্গে বৈষম্য দূর করার সম্পর্কের ওপর। এ বিষয়ে শুধু তাত্ত্বিক গবেষণা নয়, কোথায় এবং কীভাবে, তা স্থির করার জন্য এমআইটি অর্থনীতি বিভাগে একটি গবেষণা কেন্দ্রও চালু রেখেছে। অমর্ত্য সেনের পর নোবেল বিজয়ী দ্বিতীয় বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভিনন্দন জানিয়েছেন সিপিআই (এম) রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্য মিশ্রও। গতকাল কলকাতায় তিনি বলেছেন, ‘আমরা খুবই আনন্দিত যে অমর্ত্য সেনের পর অভিজিৎও দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে কাজ করেছেন।’ প্রসঙ্গত নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে অভিজিৎ যে সাহসী মন্তব্য করেছিলেন তার জন্যও অভিজিৎকে সাধুবাদ জানিয়েছেন মিশ্র।

অভিজিতের নোবেলপ্রাপ্তিতে খুশির হাওয়া জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়েও। এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন অভিজিৎ। তার শিক্ষকরাও মগ্ন হয়েছেন স্মৃতিচারণায়। তাদের অনেকেই বলেছেন, অভিজিৎ যে একদিন নোবেল পাবেন তা তারা আশাই করেছিলেন। সেটাই বাস্তবায়ন হলো। আন্তর্জাতিক স্তরে দারিদ্র্য দূরীকরণের পরীক্ষামূলক উদ্যোগে তার ভূমিকার জন্যই ২০১৯ সালের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। জেএনইউর সেন্টার ফর ইকোনমিক স্টাডিজ অ্যান্ড প্ল্যানিংয়ে পড়ার সময় অভিজিতের শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক অঞ্জন মুখার্জি। তিনি বলেন, ‘আমি ওকে ইমেইল মারফত অভিনন্দনবার্তা পাঠিয়েছি। সহপাঠীদের মধ্যে ও-ই ছিল সেরা। আমরা সব সময় মনে করতাম নোবেল ও একদিন পাবেই এবং সেটাই করে দেখাল।’ অনেক দিন ধরেই বিশ্বের সেরা অর্থনীতিবিদের আসনে অভিজিৎ অধিষ্ঠান করছেন। এবার তিনি শীর্ষে পৌঁছালেন। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেন অভিজিৎ।

লিভার ফাউন্ডেশনের সচিব অভিজিৎ চৌধুরী বলেছেন, ‘দারিদ্র্য নিয়ে কাজের সূত্রেই আমার সঙ্গে অভিজিতের আলাপ। যে কাজটা অভিজিৎ বিনায়ক সাফল্যের সঙ্গে অর্থনীতির ক্ষেত্রে করে চলেছেন, সে কাজটা লিভার ফাউন্ডেশনের তরফে আমরা বীরভূমের গ্রামগুলোয় করার চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের কাজ ছিল কোয়াক ডাক্তারদের প্রশিক্ষিত করে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো। আমাদের সেই গবেষণার উল্লেখযোগ্য সমর্থন ও সাহায্য পেয়েছিলাম অভিজিৎ বিনায়কের থেকে।’ নোবেলে তার পূর্বসূরি অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত দারিদ্র্য বিষয়ে নতুন ধরনের অত্যন্ত মূল্যবান কাজ তারা করেছেন এবং সেই কাজের ফল নানা দিক দিয়েই দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের সাহায্য করবে। আমি নিজে একাধিক কারণেই ভীষণ খুশি। একটা কারণ এই যে, অভিজিৎকে আমি তার শৈশব থেকে ভালোরকম জানি এবং তার চিন্তাশক্তিকে আমি বরাবর বাহ্বা দিয়ে এসেছি। আমার একমাত্র দুঃখ এই যে, ওর বাবা, আমার বন্ধু দীপক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এটা দেখে যেতে পারলেন না। তবে অভিজিতের মা নির্মলা এ উৎসবে যোগ দেবেন।’

আরেক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ তথা বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছেন, ‘খুবই মজা লাগছে এটা ভেবে যে রবিবার রাতেই খাবার টেবিলে বসে বলেছিলাম অভিজিৎ-এস্থার-ক্রোমার নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন। আমার ছেলে এসেছিল রবিবার। ও অভিজিৎ-এস্থারের কাছে পিএইচডি করেছে। অভিজিৎদের নোবেলপ্রাপ্তি অসম্ভব ভালো খবর। প্রত্যাশিত খবরও বটে। র‌্যান্ডমাইজ কন্ট্রোল ট্রায়ালের যে ব্যবহার অভিজিতরা শুরু করেছিলেন, তা সারা বিশ্ব ব্যবহার করছে।’ লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আরেক বিশিষ্ট অধ্যাপক মৈত্রীশ ঘটক বলেছেন, ‘আমি উচ্ছ্বসিত। হার্ভার্ডে অভিজিৎদা আমার পিএইচডি সুপারভাইজার ছিলেন। আমরা একসঙ্গে বেশকিছু প্রবন্ধও লিখেছি। মজার কথা হলো, অভিজিৎদার নোবেলপ্রাপ্তির খবর যখন পেলাম, আমি তখন ক্লাসে তাদেরই একটা পেপার পড়াচ্ছিলাম। এত দিন আরেক নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে সামলাতে হচ্ছিল। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হলেন সদ্য নোবেলজয়ী আরেক বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।’ আগে থেকেই মোদি সরকারের আর্থিক নীতির কড়া সমালোচক ছিলেন অভিজিৎ। নোবেলপ্রাপ্তির পর এমআইটির সংবাদ সম্মেলনেও সেই একই শানিত, তীক্ষè শ্লেষ বজায় রাখলেন। স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, ভারতের অর্থনীতি খুব খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে বলে আমার ধারণা। এখন সরকারও স্বীকার করছে অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। ভবিষ্যতের কথা বলতে পারব না, এখনকার কথা বলছি। অর্থনীতিতে চাহিদা নেই। ক্রয়ক্ষমতা নেই। কোষাগারীয় ঘাটতি কত শতাংশে দাঁড়াল তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। বাজারে চাহিদার অভাব খুব তীব্র। আসল কথা হলো লোকের হাতে পয়সা চাই। বড়লোকের হাতে পয়সা দিলে চলবে না। গরিবের হাতে পয়সা চাই। সরকার সব অংশকে খুশি করার চেষ্টা করছে বলে দেখাচ্ছে, কিন্তু আসলে তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না।

অভিজিতের এহেন সমালোচনার মুখে কার্যত অস্বস্তিতে পড়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। সামনেই তিন রাজ্যে ভোট। তাই গলা চড়িয়ে আজগুবি তথ্য খাড়া করে অভিজিতের বক্তব্য খ-ন করার রাস্তায়ও যেতে পারছে না সরকার। আবার ভোটের মুখে সদ্য নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের ধারালো আক্রমণ হজমও করতে পারছে না। এদিকে বর্তমান অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের স্বামী পরকাল প্রভাকর এক নিবন্ধে মোদি সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, আজগুবি অর্থনীতি নিয়ে মূর্খের স্বর্গে বাস না করে অবিলম্বে নরসিমা রাও ও মনমোহন সিংয়ের অর্থনৈতিক মডেলে ফেরা উচিত মোদি সরকারের। তার পরই এসেছে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া সমালোচনা। দুই অর্থনীতিবিদের এই জোড়া আক্রমণকে হাতিয়ার করতে মোদি সরকারকে পাল্টা আক্রমণ করেছে কংগ্রেসও। লোকসভা ভোটের আগে অভিজিৎ রাহুল গান্ধীর ন্যায় প্রকল্প তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন। রাহুল গতকালই অভিজিৎকে অভিনন্দন জানিয়ে সে কথা লিখেছিলেন। গত কয়েক দিন কংগ্রেস সারা দিনই অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজেদের নতুন আইকন হিসেবে মেলে ধরার চেষ্টা করেছে। নোবেল পাওয়ার কয়েক দিন আগেও ভারতের অর্থনীতি ও প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রভাব নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন অভিজিৎ বাবু। এমনকি অতিসম্প্রতি তিনি বলেছেন, ভারতীয় অর্থনীতির হাল খুব খারাপ। অর্থনীতির গতি দ্রুত হারে শ্লথ হচ্ছে।

সরকারও তা বুঝছে। মোদি সরকার সম্পর্কে অভিজিতের মনোভাব বিলক্ষণ জানেন বিজেপি নেতৃত্ব। সে কারণেই অভিজিৎকে অভিনন্দন জানাতে ঘণ্টা চারেক বাড়তি সময়ও নিয়ে ফেলেন প্রধানমন্ত্রী। এরই মধ্যে কংগ্রেসের নতুন কৌশল বিজেপির বিড়ম্বনা আরও বাড়িয়েছে। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল জয়কে মুক্তচিন্তার জয় বলেই মনে করছে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা বিভাগে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য অভিজিতের স্বীকৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও ভবিষ্যতে চলার পথ আরও মজবুত করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠনের সম্পাদক অবিনাশ কুমার বলেছেন, ‘খুব শিগগির ওঁকে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানানো হবে। যখন দেশে আসবেন তখন জেএনইউতে এসে যেন বক্তৃতা দেন, তার অনুরোধ করব আমরা।’ অবিনাশ বলেন, তিনি অনেকবার বলেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তচিন্তার উদার পরিসর ওঁকে তৈরি হতে অনেকটা সাহায্য করেছে। ২০১৬ সালে যখন জেএনইউ আক্রান্ত হয়, তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় গোটা ঘটনার নিন্দা করেছিলেন।

লেখক : ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক।


আপনার মন্তব্য

close