শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:২৮

নারীর প্রতি সহিংসতা

এ কে এম শহীদুল হক

নারীর প্রতি সহিংসতা

প্রতিদিন সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে নানারকম অপরাধের সংবাদ দেখে থাকি। শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, নৈতিকতার স্খলন, মানবতার লঙ্ঘন, নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা ইত্যাদি জঘন্য অপরাধের সংবাদ প্রতিনিয়ত প্রচারিত হয়। নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলছে। অতি সম্প্রতি তিনটি ঘটনা যারা জেনেছেন আমার বিশ্বাস তাদের সবার হৃদয়কেই নাড়া দিয়েছে। ২৬ অক্টোবর ২০১৯ রংপুরের পীরগাছায় এক নব পরিণীতা গৃহবধূ শিউলি নির্মম নির্যাতনের শিকার হন।  শিউলির স্বামী শাহজাদা ও স্বামীর আত্মীয়স্বজন মিলে যৌতুকের টাকা না পেয়ে তার হাত ও পায়ের রগ কেটে দিয়ে গুরুতর জখম করে। সংবাদ পেয়ে শিউলির মা ও মামি শিউলির শ্বশুরবাড়ি গেলে তাদের বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। মেয়েটির বাবা ফজলুল হক পরের দিন পীরগাছা থানায় অভিযোগ করলে থানা থেকে পুলিশ গিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে পীরগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। মেয়ের বাবা জানান, বিয়ের সময় জামাইকে যৌতুক বাবদ ৮৫ হাজার টাকা এবং মেয়েকে স্বর্ণালঙ্কার দেওয়া হয়েছিল। তবুও বিয়ের পর থেকেই আরও দুই লাখ টাকা যৌতুকের জন্য পাষ- জামাতা মেয়েকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন অব্যাহত রেখেছিল। সর্বশেষ মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে হাত ও পায়ের রগ কেটে মেয়েটিকে হত্যা করতে চেয়েছিল।

শাহজাদা ও শিউলির বিয়ের মাত্র ৩৬ দিনের মাথায় এ নির্মম ঘটনা। নির্যাতন তার আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। মেয়েটির বিয়ের মেহেদিও হাত থেকে মুছে যায়নি। কেন এমন নির্মমতা? বিয়ের মাধ্যমে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সারা জীবনের জন্য ঘর বাঁধেন। স্ত্রীকে বলা হয় স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী। ইংরেজিতে বলা হয় better half। বিয়ের আগে দুজনের মনে কত স্বপ্ন থাকে, কল্পনা থাকে, পরিকল্পনা থাকে। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাঁধভাঙা আবেগ ও একের প্রতি অন্যের প্রবল আকর্ষণ থাকে। তারা সার্বক্ষণিকভাবে একে অপরের সাহচার্য পেতে চায়। প্রেম ও ভালোবাসার এ আবেগ, এ আকর্ষণ, দু-এক বছরেও শেষ হয় না। এটাই আমরা দেখেছি। আমাদের প্রায় সবার জীবনেই এ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি এসেছিল। মনুষ্য সমাজে এটাই স্বাভাবিক। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। প্রেম ও ভালোবাসা দিয়েই দাম্পত্য জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিবার গঠিত হয়। সামাজিক প্রথার মধ্যে প্রেম ভালোবাসা প্রবহমান থাকে যুগে যুগে, অনন্তকাল। নইলে মনুষ্য সমাজ ও পরিবার তো টিকে থাকত না। কিন্তু শিউলির জীবনে স্বামী-স্ত্রীর প্রেম, ভালোবাসা ও আবেগ কেন বিয়ের মেহেদির রং মুছতে না মুছতেই উবে যায়? যৌতুকের দাবিতে নববধূর ওপর নেমে আসে স্বামীর নির্যাতন। এটা কি মেনে নেওয়া যায়?

নীতি-নৈতিকতা, মানবতা ও মায়া-মমতা কি মানব জীবন থেকে মুছে গেল? কিন্তু কেন এত অবক্ষয়? এত নিষ্ঠুরতা? আইনে যৌতুক দেওয়া-নেওয়া উভয়ই ফৌজদারি অপরাধ। ইসলাম ধর্মেও যৌতুক হারাম। বরং বিয়ের সময় বধূকে দেনমোহর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ধর্মে আছে। স্বামী, স্ত্রীকে দেনমোহর পরিশোধ না করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অব্যাহত রাখলে তা হবে জেনার সমতুল্য। নারীর মর্যাদা সমুন্নত রাখতেই এ বিধান ইসলাম ধর্মে আছে। অথচ আইনকানুন ও ধর্মীয় বিধান তোয়াক্কা না করে মেয়েটির স্বামী তার পিতামাতার কাছ থেকে যৌতুক দাবি করে। যৌতুক না পেয়ে শারীরিক নির্যাতন করে। তার ওপর নির্মমভাবে সহিংসতা চালায়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ভোলা জেলার। এক মা তার আড়াই বছরের শিশুকে নিয়ে ২৬ অক্টোবর ২০১৯ দুপুরে চরফ্যাশন থেকে মনপুরা যাবেন। লঞ্চঘাটে লঞ্চ না পেয়ে তিনি স্পিডবোটে ওঠেন। ওই বোটে আরও চারজন পুরুষ যাত্রী ছিলেন। পথিমধ্যে স্পিডবোট জোরপূর্বক থামিয়ে শিশুটিকে বোটে রেখে মাকে চরের মধ্যে নিয়ে চার যাত্রী পালাক্রমে ধর্ষণ করেন। শিশুটি স্পিডবোটে চিৎকার করে কাঁদছিল। চালকের মুঠোফোন থেকে সংবাদ পেয়ে স্পিডবোটের মালিক নজরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি ওই চার যাত্রীকে গালমন্দ ও কিলঘুষি মেরে তাদের কাছ থেকে থাকা টাকা-পয়সা কেড়ে নেন। পরে তিনি নিজেও ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। মেয়েটিকে উদ্ধার করে মনপুরা থানায় নিয়ে যান। থানায় মামলা হয়। নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এ ঘটনাটি হৃদয়বিদারক। একটি শিশুর মা তার আড়াই বছরের শিশুটিসহ অন্য চারজন পুরুষ যাত্রীর সহযাত্রী ছিলেন। ওই নারী যাত্রীর নিরাপত্তা ও সম্ভ্রম রক্ষার দায়িত্ব ওই পুরুষ যাত্রী ও চালকের ছিল। তারা যদি মানুষ হতো তাহলে এ মানবিক দায়িত্ব তাদের পালন করা অবশ্য করণীয় ছিল। কিন্তু পক্ষান্তরে তারা কি করল। শিশুটিকে তার মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করলেন। কী আমানবিক। কী পাশবিক। কী পৈশাচিকতা। মানুষরূপী এ অমানুষগুলো মানুষ জাতির কলঙ্ক। মানুষ কীভাবে এত জঘন্য হতে পারে, নিষ্ঠুর হতে পারে? যারা এ পৈশাচিক কর্মটি করলেন তাদের মা-বোনদের যদি কেউ এমনভাবে ধর্ষণ করে তখন তাদের মনের প্রতিক্রিয়া কী হবে? তারা কি কখনো তাদের নিজেদের বিবেকের কাছে এমন প্রশ্ন রেখেছেন?

তৃতীয় ঘটনাটি বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাটে ২২ অক্টোবর ২০১৯ ঘটেছে। এক প্রতিবেশী যুবক (১৮) দুই বছরের এক প্রতিবেশী মেয়ে শিশুকে চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তার রুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। শিশুটির গুপ্তস্থান থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হলে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। থানায় মামলা হয়। যে যুবক দুই বছরের শিশুকে ধর্ষণ করতে পারে তাকে কি মানুষ বলা যায়? বিকৃত মানসিকতার এ অমানুষগুলো মনুষ্য সমাজে থাকলে ওই সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়? এ নারী তো আপনার আমার মা, বোন বা সহধর্মিণী। তাদের কাছে আপনি আমি কী জবাব দেব? নারী ও শিশুর ওপর এ ধরনের সহিংসতা, নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিকতা কেন? অতীতে তো এ ধরনের জঘন্য, হিংস্র ও বিকৃত আচরণের সংবাদ পাওয়া যেত না। এখন তো প্রায়শই এ ধরনের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে আসে। এর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নিরূপণ করা কঠিন। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যে মানুষের মধ্যে ইডের প্রভাব বেশি থাকে সে যে কোনো অপরাধ ও জঘন্য কাজ করতে দ্বিধাবোধ করে না। তবে এটা ঠিক যে মানুষের নৈতিক, মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের জন্যই এসব ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়াও প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসনের শিথিলতা, সামাজিক অস্থিরতা, নৈতিকতার চেয়ে ভোগ ও বৈষয়িক প্রাপ্তিকে প্রাধান্য দেওয়াই সমাজে নানা অপকর্ম ও দুর্বৃত্তায়নের প্রধান কারণ। নৈতিকতাবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাজবিরোধী ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভোগবিলাসী মনোবৃত্তির জন্ম দেয়। যার কারণে এসব অনৈতিক ও অমানবিক ঘটনা ঘটে।

এর প্রতিকার কী? শিশু ও কিশোর মনে উত্তমকে লালন করা এবং অধমকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করার মানসিক কাঠামো তৈরি করার জায়গাটি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে না। এখন একাডেমিক ভালো রেজাল্ট করার প্রতিযোগিতা। ধর্মীয়, নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের সংস্কৃতি তৈরি করা এবং এসব সুকুমার বৃত্তির চর্চা ও অনুশীলন তেমন একটা হয় না। সুকুমার চর্চার মাধ্যমে মানুষের ভিতরের ইডের প্রভাব কমিয়ে ইগো ও সুপার ইগোর প্রভাব বৃদ্ধি করে অপরাধ প্রবণতাকে হ্রাস করা যায়। বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা অপরিহার্য। কারণ, সামাজিক মিডিয়া, ইন্টারনেট ও ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে অসংখ্য বিচিত্র তথ্যপ্রবাহ অবারিতভাবে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। অশ্লীল তথ্যপ্রবাহ ও পর্নোগ্রাফিকেও ঢেকে বা বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও সমষ্টির চিন্তা-চেতনা ও মননশীলতায় শুদ্ধ, পরিশীলিত ও গঠনমূলক শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি রচনা করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুপথে ধরে রাখার মানসে উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া চলমান রাখা অত্যাবশ্যক। শিশু বয়স থেকেই তাদের সুস্থ, উদার ও নৈতিক মানসিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এটা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও অপরিসীম। স্বশিক্ষার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের সুশিক্ষিত করে তুলতে সহায়তা করতে হবে, যাতে তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে খারাপকে পরিহার করে। কিন্তু এ কাজটিই কার্যকরভাবে হচ্ছে না।

ইসলাম ধর্মে নারীর মর্যাদা সমুন্নত করা হয়েছে। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিতেন। নারীর প্রতি তিনি সর্বদা শালীনতা প্রদর্শন করতেন। তাঁর উম্মত অর্থাৎ আমাদের তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমরা সেই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে সরে এসেছি। নারীকে ভোগের সামগ্রী ভাবা বা পরিবারে কন্যা সন্তানকে ছোটভাবে দেখা কোনোক্রমেই উচিত নয়। নারীদের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করার আন্তর্জাতিক রীতিও আছে। যেমনÑ আপনার অফিসে যদি আপনার অফিসের কোনো পরিচ্ছন্ন কর্মীর স্ত্রী আসে, আপনি তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখাবেন এবং চেয়ারে বসার জন্য অনুরোধ করবেন। কোনো অনুষ্ঠানে স্ত্রীকে নিয়ে যোগদান করলে স্ত্রী আপনার সামনে এবং আপনি পেছনে হাঁটবেন। কোনো সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় মহিলাদের আগে সম্বোধন করবেন, যেমন-ভদ্র মহিলা ও মহোদয়গণ (Ladies and Gentlemen)। আপনি বসে আছেন, কোনো মহিলা আপনার সামনে এলে আপনি দাঁড়িয়ে তাকে বসতে বলবেন। কোনো ভদ্র মহিলার সামনে ধূমপান করবেন না এবং তার সঙ্গে কর্কশ ভাষায় কথা বলবেন না। এটাই আন্তর্জাতিক রীতি। এ সংস্কৃতি শিশুকাল থেকে রপ্ত করলে বড় হয়ে সবাই নারীদের যথাযথ মর্যাদা দেবে।  নারীর সঙ্গে সদাচরণ করার আদব পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজে তথা সর্বত্র চর্চা হলে নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতা প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সৃষ্টি হবে। এর পাশাপাশি প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ কঠোর অবস্থানে থেকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বিচার নিশ্চিত করে ব্যাপক গণসচেতনতা জাগাতে পারলে এবং গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতাসহ  অন্যান্য অপরাধের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ ও  হ্রাস করা সম্ভব।

                লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ।


আপনার মন্তব্য