শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩৮

বেঁচে থাকতে খুব বেশি ধনসম্পদ প্রয়োজন কি?

তপন কুমার ঘোষ

বেঁচে থাকতে খুব বেশি ধনসম্পদ প্রয়োজন কি?

দুর্নীতি এখন দেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘টাকা বানানো একটা রোগ। এ রোগে একবার আক্রান্ত হলে শুধু বানাতেই ইচ্ছা করে।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘দুর্নীতি করে টাকা উপার্জন করা যায়, কিন্তু সম্মান পাওয়া যায় না।’ দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এর সমাধান একক কোনো প্রতিষ্ঠান, সরকার বা গোষ্ঠীর পক্ষে করা সম্ভব নয়।’ সবাইকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান। এরপর আসে চিকিৎসা ও শিক্ষা। এসব কিছুর জন্য প্রয়োজন অর্থ। জীবনে অর্থের প্রয়োজন অস্বীকার করার জো নেই। তাই বলে আত্মসম্মান, নীতি-নৈতিকতা, পারিবারিক মানমর্যাদা- সবকিছু বিসর্জন দিয়ে নয়। সৎ উপার্জনে দোষের কিছু নেই। বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি ধনসম্পদের প্রয়োজন হয় না। বিশ্বসেরা ধনীদের অনেকে খুবই সাধারণ জীবনযাপন করেন। ভুললে চলবে কেন, শূন্য হাতে সবাইকে একদিন বিদায় নিতে হবে এই মাটির পৃথিবী থেকে।

নৈতিকতা বলে যে একটা বিষয় রয়েছে, তা সমাজের একশ্রেণির মানুষ বেমালুম ভুলে আছেন। তাদের যুক্তি, ‘টাকায় বাঘের দুধ মেলে’। যারা সততার বড়াই করেন, তারা আসলে ‘সুযোগের অভাবে সৎ’Ñ নিন্দুকেরা এমনটাই বলেন। কোনো সদুপদেশ, নীতিকথা তারা গায়ে মাখতে চান না। কথায় বলে না, ‘চোরের মার বড় গলা’।

মানুষের মধ্যে লোভ-লালসা যেমন আছে, তেমন আছে ন্যায়বোধ ও বিচারবুদ্ধি। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও অভাব-অনটনে পড়ে অনেক সময় মানুষের মনের সদ্গুণগুলো হারিয়ে যায়। প্রবাদ আছে, ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’। তাই বলে সবাই স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন, এমনটি নয়। মূল্যবোধের এ অবক্ষয়ের মধ্যেও কারও কারও সততা ও ন্যায়বোধ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কোনো লোভ-লালসা বা প্রলোভন তাদের নীতিবিচ্যুত করতে পারে না।

অর্থ-সম্পদ কি সুখী হওয়ার পূর্বশর্ত? আসলে কে কীসে সুখ খুঁজে পায়, বলা মুশকিল। কেউ অর্থের পেছনে পাগলের মতো ছুটছে। কেউ একমনে ব্যবসা করছে। কেউ খেলা নিয়ে মেতে আছে। কেউ বা রাজনীতি নিয়ে। কেউ নাটক বা সংগীতপাগল। কেউ সমাজসেবা নিয়ে ব্যস্ত। একটা সমীক্ষা বলছে, পরার্থপরতায় যত সুখ। বিশ্বের শীর্ষ ধনী বিল গেটস। তার বিপুল সম্পদের কানাকড়িও সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই তার। গেটস দম্পতি চান, সন্তানরা সুশিক্ষিত হয়ে চাকরি করুক, নিজের ক্যারিয়ার নিজে গড়–ক। এতেই জীবনের প্রকৃত স্বাদ খুঁজে পাবে তারা।

অর্থলোভী মানুষ কখনো সুখী হতে পারে না। এ উপমহাদেশের প্রাচীন মুনি-ঋষি, সাধু-সন্ন্যাসী, ফকির-দরবেশ-বাউলরা সম্পদকে হেয়জ্ঞান করেছেন। আধ্যাত্মিকতার জয়গান গেয়েছেন। তবে আধ্যাত্মিক ধ্যান-ধারণার প্রভাব এ অঞ্চলের কর্মবিমুখতা ও দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করেন।

সব মানুষের জীবনেই সমস্যা আছে। নিশ্চিত করে বলা যায়, একমাত্র অবুঝ শিশু ও পাগল ছাড়া সবাই আনন্দের পাশাপাশি কমবেশি হতাশায় ভুগছে। সম্ভবত আমরা কেউই বর্তমান নিয়ে সন্তুষ্ট নই। যা চেয়েছি, তা পাইনি। যা হতে পারতাম, তা হতে পারিনি। হিসাব মেলে না। প্রত্যেক মানুষের মনের ভিতরে একটা নিভৃত জগৎ আছে। রাত গভীর হলে মানুষ ফিরে আসে ওই জগতে। ওই জগতে আছে বাইরের জগতের মতো আলো-ছায়া, আনন্দ-বেদনা। হিসাব-নিকাশ শেষে অসীম এক শূন্যতা হৃদয়ের মধ্যে বাজে। এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। ধনসম্পদ এ শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।

একটা ধারণা প্রচলিত আছে, যাদের আছে অঢেল সম্পদ, তারা দুর্নীতি করে না। এ বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই কবে ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় বলে গেছেন, ‘এ জগতে হায়, সেই বেশি চায়, আছে যার ভূরি ভূরি,/রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’

সোনার ডিম পাড়া সেই রাজহাঁসের গল্পটা মনে পড়ে কি? গল্পের নীতিকথা, ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’। একজন কৃষকের ছিল একটি রাজহাঁস। রাজহাঁস প্রতিদিন একটা করে সোনার ডিম পাড়ত। ডিম বিক্রি করে কৃষকের সংসার ভালোই চলছিল। এক রাতে কৃষকের মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি এলো। রাতারাতি ধনী হওয়ার বাসনা তার মনে জাগে। সে বুদ্ধি আঁটে, রাজহাঁসটির বুক চিরে সব ডিম একসঙ্গে বের করে আনবে। পরদিন সকালে কৃষক একটা ধারালো ছুরি দিয়ে হাঁসটির বুক চিরে দেখতে পেল, ভিতরে একটাও ডিম নেই। রাজহাঁসটিকে হারিয়ে কৃষক পাগলপ্রায়। অভাব-অনটন তার নিত্যসঙ্গী হয়।

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’। অতিলোভের পরিণতি কী হয় সাম্প্রতিক সময়ে আমরা তা প্রত্যক্ষ করছি। ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়’। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে’। দুর্নীতি দমন কমিশন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। অর্থ, যশ, খ্যাতি এসবের কোনো শেষ বিন্দু নেই। সব ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে বিত্তের পেছনে হন্যে হয়ে ছুটলে বিপর্যয় অনিবার্য।

লেখক : সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক লিমিটেড।


আপনার মন্তব্য