শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ অক্টোবর, ২০২০ ২৩:২৭

রাজনীতি যদি হয় আধিপত্য বিস্তার তাহলে দূরে আছি

রাজনীতি যদি হয় আধিপত্য বিস্তার তাহলে দূরে আছি

রাজনীতিবিদ সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও মাদারীপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক। ব্যক্তিগত জীবনে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার সময় তিনি ছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী। তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান, পদ্মা সেতু বিতর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। শিক্ষার বিকাশে দীর্ঘদিন কাজ করার বিষয়গুলো উঠে এসেছে এ আলাপচারিতায়। সৈয়দ আবুল হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি।

 

প্রশ্ন : রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। ব্যস্ততা এখন কী নিয়ে?

উত্তর : রাজনীতি থেকে দূরে আছি কথাটা ঠিক নয়। রাজনীতি যদি হয় আধিপত্য বিস্তার করা- তাহলে আমি সেই রাজনীতি থেকে দূরে আছি। আসলে রাজনীতির উদ্দেশ্য হলো দেশের জন্য কাজ করা, জনকল্যাণে কাজ করা। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা। আমি এলাকার উন্নয়নে, এলাকার শিক্ষা প্রসারে কাজ করি, পড়াশোনা করি। লেখালেখি করি। নিজের সক্ষমতা দিয়ে দেশের উন্নয়নে, মানুষের কল্যাণে কাজ করে চলেছি।

প্রশ্ন : আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন কি?

উত্তর : দেশের উন্নয়নের রাজনীতি এবং জনকল্যাণে আমি এখনো সক্রিয় আছি এবং আজীবন থাকব ইনশা আল্লাহ।

প্রশ্ন : এ ব্যাপারে আপনার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা হয়েছে কি?

উত্তর : নেত্রীর সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা হয়, কথা হয়।

প্রশ্ন : পদ্মা সেতুর যে বিষয় নিয়ে আপনাকে বিতর্কে পড়তে হয়েছিল সে বিষয়ে বিস্তারিত বলবেন কি?

উত্তর : এ প্রশ্নের উত্তর আমার দীর্ঘ হবে। একটু লক্ষ্য করুন- পদ্মা সেতুর বিষয় নিয়ে যে বিতর্কে আমাকে জড়ানো হয়েছিল তা ছিল অসত্য, মনগড়া ও গালগল্প। তা ছিল নীতিভ্রষ্ট কাজ। কল্পনাপ্রসূত ও উদ্দেশ্যমূলক। এ বিতর্কে কোনো সত্য উপাদান ছিল না। আমি চেয়েছিলাম পদ্মা সেতু দ্রুত বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ স্বাভাবিক পথে এগিয়ে নিতে দেয়নি।

২০০৮-এর নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। আমি যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভের পর ডে-ওয়ান থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করি। ২০০৯ সালের ৯ জানুয়ারি, দায়িত্ব গ্রহণের চার দিনের মাথায় অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় বহুমুখী সেতুর ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। একই মাসের ২৯ তারিখ সেতুর ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিস্তারিত ডিজাইন প্রণয়নের কাজ শুরু করে এবং ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব দাখিল করে। এরপর ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি মূল সেতুর দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০১১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাংকের বোর্ডসভায় ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তা অনুমোদিত হয়। ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২৮ মে, ২০১১ জাপানের জাইকার সঙ্গে এবং ২৪ মে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও ৬ জুন এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

দেশে প্রথম মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক প্রতিটি কাজে আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলা হয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। মূল সেতু নির্মাণ ও পরামর্শক নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এসব কার্যক্রমে কোনো গোপনীয়তা ছিল না। কাউকে প্রভাবিত করা হয়নি। বিদ্যমান আইন ও বিধি কোনোরকম ভঙ্গ করা হয়নি। ঋণদাতা সংস্থার তদারকিতে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিটি ধাপ এগিয়েছে।

পদ্মা সেতুর নির্মাণ ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অঙ্গীকার। তাই সেতু নির্মাণ যাতে দ্রুত হয়, টার্গেট অনুযায়ী বাস্তবায়ন হয় সে ব্যাপারে আমি সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করেছি। আমি প্রতি মুহূর্ত, প্রতি ক্ষণকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেছি। দ্রুততম সময়ে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক দাতা সংস্থার সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করেছি। স্বল্প সময়ে পদ্মা সেতু নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, ভূমি উন্নয়ন করা কমিউনিটি সেন্টার, মার্কেট, স্কুল ও মেডিকেল সেন্টার নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও ওয়াটার ট্যাংক নির্মাণের কাজ শেষ করেও প্লট বরাদ্দের কাজের কার্যক্রম গ্রহণের পর্যায়ে নিয়ে আসি। প্রাকযোগ্য দরদাতা নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করি। ২০১৩-এর ডিসেম্বরে সেতুর কাজ শেষ করার টার্গেট নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়েছি। যেখানে বঙ্গবন্ধু সেতুর প্রস্তুতি কাজ করতে ১০ বছর লেগেছে, সেখানে মাত্র দুই বছরে আমরা পদ্মা সেতুর সব প্রস্তুতির কাজ শেষ করেছি।

পদ্মা সেতুর প্রস্তুতি কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, অবলোকন করেছি জাপানি গৃহীত ডিজাইন। আমি কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোক নই, তবে ব্যবসাকালীন যে জ্ঞান আমি অর্জন করেছি- চায়নার থ্রি গরজেস প্রকল্প একাধিকবার পরিদর্শন, নির্মাণকাল থেকে চায়নার ৩৫ কিলোমিটার ব্রিজ, ৩৩ কিলোমিটার ব্রিজ, পানামা ব্রিজ স্বচক্ষে আমি দেখেছি, মুম্বাইতে সি-বে ব্রিজ, উহানে ডাবল-ডেকার ব্রিজ এবং কোরিয়ার ডাবল-ডেকার ব্রিজ আমি দেখেছি- এসব থেকে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি, তার আলোকে কারিগরি কমিটিকে ডিজাইনে কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা তা ভাবতে অনুরোধ করেছিলাম। এ ডিজাইনের বিষয়ে আমি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) রফিক সাহেবকে নিয়ে ডিজাইন কনসালট্যান্ট মনসেল এইকমের সঙ্গে বসেছিলাম। তাদের সঙ্গে আমার ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছি। হংকংয়ে গিয়ে এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে মিটিং করেছি। মিটিংয়ে সচিব, প্রকল্প পরিচালক ও কনসালট্যান্ট উপস্থিত ছিলেন। সেতু দ্রুত বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ডাবল ডেকার ব্রিজ স্টিল স্ট্রাকচারের বিষয়ে কথা বলেছি। উহানের আদলে এ ধারণা নিলে তিন বছরে পদ্মা সেতু করা সম্ভব। একজন চাইনিজ বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডিজাইনার মনসেল-এইকম দিয়ে ডিজাইন তৈরি করায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তা উপস্থাপিত হয়।

আমি প্রস্তাব রেখেছিলাম, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এমনভাবে করতে হবে যাতে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলেও ব্রিজের তেমন কোনো ক্ষতি না হয়। এ ক্ষেত্রে জাপানি বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে অনুরোধ করি। কারণ, জাপানিরা ভূমিকম্পসহনীয় ডিজাইনে এক্সপার্ট। আমি তখন অভিজ্ঞতার আলোকে জামিলুর রেজা চৌধুরীকে বলেছিলাম, পাইলিং করতে গিয়ে যদি শক্ত মাটি পাওয়া না যায়, নরম মাটি স্তর আসে তাহলে কনক্রিট ফাউন্ডেশন দেওয়ার বিধান রাখতে অর্থাৎ নরম মাটি এলে তা কেমিক্যাল দিয়ে কংক্রিটে রূপান্তর করা সম্ভব। চায়নার উদাহরণও আমি দেখিয়েছি। পাইলিং করতে গিয়ে মাটির গভীরে গ্যাস পাওয়া গেলেও ফাউন্ডেশন করা সম্ভব- এ উদাহরণ চায়নায় রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এলে কাজ যাতে বিলম্বিত না হয়, ব্যয় না বাড়ে, এ শর্ত রাখতে আমি কারিগরি কমিটির প্রধান জামিলুর রেজা চৌধুরীকে অনুরোধ করেছিলাম এবং চুক্তির আগে চীনে গিয়ে সরেজমিন দেখতে বলেছিলাম। এ ক্ষেত্রে Variation-এর পরিবর্তে Lumpsum চুক্তির provision রাখতে বলেছিলাম। যাতে পরবর্তীতে সেতু নির্মাণের ব্যয় না বাড়ে। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে তা করা যৌক্তিক ছিল। কিন্তু জামিলুর রেজা চৌধুরী আমার মতামতের গুরুত্ব বিবেচনায় নেননি।

আমার আশঙ্কা অনুযায়ী নির্মাণ পর্যায়ে যখন দেখা গেল মাটির তলদেশে শক্ত মাটি নেই, তরল মাটি যা পাইলিংয়ের উপযুক্ত নয়। তখন বর্তমান ঠিকাদার, যারা নির্মাণকাজে অভিজ্ঞ, তারা কেমিক্যাল ব্যবহার করে মাটি শক্ত করে পাইলিং করার পরামর্শ দেয়। তাদের এ পরামর্শ আমার আগের পরামর্শের সামঞ্জস্য ছিল। কিন্তু অনভিজ্ঞ কনসালট্যান্ট সে পথে না গিয়ে গবেষণার নামে দুই বছর ক্ষেপণ করল। ঠিকাদারের সে পরামর্শ অনুযায়ীই বর্তমানে ‘স্ক্রিন গ্রাউটিং’ পদ্ধতিতে কেমিক্যাল ব্যবহারের পথ বেছে নিল। এর ফলে সেতুর নির্মাণে সময় ক্ষেপণ হলো। খরচ বাড়ল।

মূলত পদ্মা সেতুর বিভিন্ন স্তরে সব কার্যক্রমে বিশ্বব্যাংক অনুমোদন দিয়েছে। আমি শুধু কারিগরি কমিটির সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাংকে অগ্রায়ন করেছি। আমার কোনো মতামত তাতে ছিল না। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতা সংস্থার সন্তুষ্টিতে, অনুমোদনে সব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে কাজ সম্পাদিত হওয়ায় দাতা সংস্থাগুলো আমাদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। কিন্তু শুধু মূল সেতুর টেন্ডার আহ্বানের সময় বিশ্বব্যাংক একপর্যায়ে একজন দরদাতাকে বাদ দিতে বলে এবং অন্য একজন Disqualified দরদাতাকে Qualified করতে বলে। বিশ্বব্যাংকের নির্দিষ্ট ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়ে তদবির থাকায় এবং কারিগরি কমিটি তাদের টেন্ডারের জালিয়াতি পাওয়ায় উল্লিখিত কোম্পানি পানামা ব্রিজের ফাউন্ডেশন হুবহু ড্রয়িং নিজেদের ড্রয়িং হিসেবে দাখিল করে। ফলে কারিগরি কমিটি তাদের Disqualified করে। এবং বিষয়টি জানিয়ে বিশ্বব্যাংককে অবহিত করে। সম্ভবত বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব না রাখায় বিশ্বব্যাংক খুশি হতে পারেনি।

বিশ্বব্যাংক ঠিকাদার নিয়োগে কারিগরি কমিটির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে নানা কোয়ারি করে। উদ্দেশ্য, বিশ্বব্যাংকের পছন্দকৃত নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়া। কিন্তু কারিগরি কমিটি সেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে বৈধতা দিতে না পারার কারণে শেষের দিকে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক অনীহা প্রকাশ করে। বিশ্বব্যাংকের গোঁয়ার্তুমি এবং দেশীয় স্বার্থান্বেষী মহল ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের যোগসাজশে গৃহীত ষড়যন্ত্রে পদ্মা সেতু নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হয়। মূলত দ্রুততম সময়ে, অল্প সময়ে যাবতীয় প্রস্তুতিকাজ শেষ হওয়ায় এবং পদ্মা সেতু ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চালু হবে- এ কথা স্বার্থান্বেষীরা মেনে নিতে পারেনি। তারা সর্বাত্মক চেষ্টায় এ কার্যক্রমে বাদ সাধে এবং এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক তার নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এদের সঙ্গে যোগ দেয়। বিশ্বব্যাংক ও দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীর ষড়যন্ত্র আমি তখন বুঝতে পারি যখন বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি গোল্ড স্টেইন আমাকে এক ডিনারের সময় বলেন,

Mr. Hossain, don’t go fast. Don’t complete the bridge during the tenure of this government. আমি এতে কান দিইনি বরং পরিকল্পনা অনুযায়ী পদ্মা সেতু নির্মাণের কার্যক্রম চালিয়ে যাই। এরপর শুরু হয় পত্রপত্রিকায় আমাকে জড়িয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজের অনিয়মের নানা গাঁজাখোরি গল্প। চারদিকের সাঁড়াশি আক্রমণে জনগণ বিভ্রান্ত হয়। পদ্মা সেতু ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে। আমাকে জড়িয়ে পরামর্শক ও মূল দরদাতা নির্বাচনে যে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়, শেষ পর্যন্ত তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আমি এবং পদ্মা সেতু সততায় উদ্ভাসিত হয়। মাঝখানে অসত্য অভিযোগে পদ্মা সেতু নির্মাণ বিলম্বিত হয়।

প্রথমে বলা হয় যে, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক পরবর্তীতে বলে দুর্নীতি হয়নি, দুর্নীতির চেষ্টা হয়েছে। এরপর বলে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এ কথাগুলো বিশ্বব্যাংক বলেছে তখন, যখন বিশ্বব্যাংক একটি চীনা কোম্পানিকে মূল সেতুর ঠিকাদারি পেতে মূল্যায়ন কমিটি দ্বারা যোগ্য করতে ব্যর্থ হয়। নানা অজুহাত, বিভিন্ন ব্যাখ্যা এবং ব্যাখ্যা চেয়েও যখন কোম্পানিটিকে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির দ্বারা যোগ্য করা যায়নি, তখন তারা দুর্নীতির অভিযোগ আনে। চীনা প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রতারণার জালে ধরা পড়ার পরই প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের প্রতিযোগিতা থেকে Withdraw করে নেয়। পরবর্তীতে মূল সেতু নির্মাণের পরামর্শক নিয়োগে প্রতিটি পদক্ষেপ বিশ্বব্যাংকের সরাসরি তদারকি ও অনুমোদন সাপেক্ষে অগ্রসর হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংকের আগের প্রস্তাব ছিল আমাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরালেই সেতুর কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু মন্ত্রীকে, আমাকে সরানোর পরও তারা স্থগিত কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেনি। সরকারের উপর মহল থেকে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, বিষয়টি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জুলিকের হাতে। শোনা যায়, নিচের দিকে কিছু চেষ্টা হলেও জুলিকের অনীহার কারণে কাজ শুরু করা যায়নি। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়ে দেয়, কানাডিয়ান পুলিশ কর্তৃক এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সেতুর কাজ শুরু করা হবে না।

এদিকে সরকারের উপর মহল বুঝতে পারে, পদ্মা সেতুর কাজে এ যাবৎ কোনো দুর্নীতি হয়নি। তা সত্ত্বেও পদ্মা সেতুর কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের চাহিদামাফিক মন্ত্রীকে বদল করা হলো। তার পরও বিশ্বব্যাংকের কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ এবং একজন মাননীয় উপদেষ্টার বিশ্বব্যাংকে গমন করে নেগোসিয়েট করা সত্ত্বেও দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে। তদন্তে মূল সেতুর বিষয়ে যোগাযোগমন্ত্রীর কথিত দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সরকার মনে করে, সরকারি কর্মকর্তারা সুনির্দিষ্ট আইন, বিধি ও নিয়মের অধীনে প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োজিত। তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি ছাড়া কাউকে বিশ্বব্যাংকের কথায় বিদায় করা অযৌক্তিক, যেখানে পুরো অভিযোগটিই প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারের উচ্চমহলের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চলাকলে হঠাৎ করে ঋণচুক্তি বাতিল করার বিষয়টি স্বেচ্ছাচারিতার শামিল।

যখন বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর কো-অর্ডিনেটর হিসেবে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত জনৈক এক বিহারিকে নিয়োগ দেয়, তখনই আমার আশঙ্কা হয়েছিল, পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক বিলম্বের আশ্রয় নেবে। আমি তাই পদ্মা সেতু দ্রুত নির্মাণের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের পরিবর্তে এডিবির কো-অর্ডিনেটর নিয়োগের প্রস্তাব রেখেছিলাম।

পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিলের পর বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট জুলিখের সঙ্গে চীনের বোয়ায় সম্মেলনে এক ডিনারে আমার সাক্ষাৎ হয়। তখন আমি পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিলের প্রসঙ্গ টেনে আনলে মি. জুলিখ বলেন, বাংলাদেশের কতিপয় লোক এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছিল। তাই আমরা ঋণচুক্তি বাতিলে বাধ্য হয়েছি। এজন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। আসলে পদ্মা সেতু নির্মাণ- দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল।

কনসালট্যান্সির বাজেট ছিল মাত্র ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এসএনসির প্রস্তাব ছিল ৩৭ মিলিয়ন ডলার। তাদের জয়েন্ট ভেঞ্চারে ছিল আরও দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এবং দুটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৬ হাজার দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ জনবলের পাঁচ বছরব্যাপী ব্রিজ নির্মাণ কার্যক্রমের তদারকির কাজ। এ প্রেক্ষাপটে তাদের দ্বারা ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব নিছক অমূলক। এটা বিশ্বাসযোগ্যতার কোনো মাপকাঠিতে পড়ে না। এ ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের উপস্থিতি হাস্যকর ও অনভিপ্রেত।

নিজের টাকায় আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণ করছি- এটা গর্বের। তবে আমাদের যে এত অর্থ নেই, তাও ঠিক। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য আমাদের অনেক বিনিয়োগ রিশিডিউল করতে হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়েই আমার লক্ষ্য ছিল, ডিজাইন বিল্ট ফাইন্যানসিংয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার। সে সময় পদ্মা সেতু ডিজাইন বিল্ট ফাইন্যানসিং করা সম্ভব হলে সরকারি অর্থের ওপর চাপ পড়ত না। ডিজাইন বিল্ট ফাইন্যানসিংয়ে গেলে খরচ কম হতো। ২০১৩ সালের শেষে ব্রিজ চালু করা যেত। পরবর্তীতে যখন মাওয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতু নির্মাণে বাধা দেখা দিল, তখন আমি পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে অগ্রসর হই এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাস্তবতা অবলোকন করে তাতে অনুমোদন দেন। কিন্তু তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর বাধায় তাও করা সম্ভব হয়নি। সামগ্রিকভাবে এক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের পাঁকে পড়ে পদ্মা সেতু। দেশের মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের স্বার্থে আমি সরে আসি মন্ত্রিত্ব থেকে। ফলে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ বিলম্বিত হয়। আমি এখনো মনে করি, Bidders Financing বা PPP-এর মাধ্যমে এই পাটুরিয়া পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বর্তমান সেতু বিভাগ যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছে তার চেয়ে এ প্রকল্প অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

PPP বা Bidders Financing-এ প্রকল্প শুরু করলে এতে সরকারের কোনো নিজস্ব অর্থের প্রয়োজন হবে না। এ ক্ষেত্রে Viability gap funding-এরও প্রয়োজন হবে না।

প্রশ্ন : কানাডার আদালত এ ব্যাপারে রায় দিয়েছে। রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এখনকার মূল্যায়ন কী?

উত্তর :       পদ্মা সেতুর স্ক্যান্ডাল নিয়ে বাংলাদেশের পত্রিকার কাটিং ও কিছু টেলিফোনের কথোপকথন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছিল। কানাডার পুলিশও তদন্তে ঘটনার কোনো সম্পৃক্ততা পায়নি। ফলে বিষয়টি আদালতে একটি অখাদ্য ও গালগল্প স্টোরি ছাড়া কিছু প্রমাণিত হয়নি। বিচারক রায়ে এসব যুক্তিতর্ক টেলিফোনিক কলকে গালগল্প বলে খারিজ করে দেন। এদিকে দুদকও পদ্মা সেতুর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে। আমি দুদকের ডাকে দুদক অফিসে যাই এবং জিজ্ঞাসিত বিষয়ে উত্তর দিই। পুরোপুরি তদন্তে আমি নির্দোষ প্রমাণিত হই। এ প্রসঙ্গে স্যার হেনরি ওটনের একটি উক্তি আমার মনে পড়ে। উক্তিটি হলো- ‘সমালোচনা হচ্ছে মহৎ লোকের পোশাক পরিষ্কার করার ব্রাশ’। পৃথিবীর যেখানেই আমি যাই, সেখানেই আমি এখন সম্মানিত হই।

প্রবাদ আছে- অসত্য বক্তব্য শেষ পর্যন্ত অসাড় প্রমাণিত হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কিন্তু এ মিথ্যা অভিযোগ, পত্রিকার রিপোর্টে আমার ব্যক্তিগত সুনামের যে ক্ষতি হয়েছে, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে যে বিলম্বিত হয়েছে এবং এর ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে- এ ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে? দেশের কতিপয় পত্রিকা সব জেনেশুনে যে মিথ্যা অপবাদ আমাকে দিল, দেশের যে ক্ষতি করল- এর দায় কি তারা নিতে পারবে? আমার সুনাম কি ফিরিয়ে দিতে পারবে?

প্রশ্ন : আপনার গৃহীত বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে। এখন এ ব্যাপারে অনুভূতি কী?

উত্তর :       আমি প্রায় তিন বছর যোগাযোগমন্ত্রী ছিলাম। তিন বছর প্রচুর পরিশ্রম করেছি। প্রচুর কাজ করেছি। সরকারি প্রকল্পের জন্য প্রচুর বৈদেশিক সাহায্য মবিলাইজ করেছি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ এবং বর্তমান রেল মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নে নানা কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছি। আমি যখন দায়িত্ব নিই, তখন সেতু বিভাগের বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায় করা ছাড়া কোনো কাজ ছিল না। আমি দায়িত্বে এসে সেতু বিভাগের কার্যক্রমে গতি সঞ্চার করি। মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে পদ্মা সেতু নির্মাণ, ঢাকা-এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, ঢাকা ও চট্টগ্রামে টানেল নির্মাণ, গুলিস্তান গোলাপশাহের মাজার হতে দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ, পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণসহ ১১টি প্রকল্প গ্রহণ ও কিছু প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন শুরু করি। সড়ক বিভাগের অধীনে ১৬০টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় যার মধ্যে ৪৪টি অগ্রাধিকার প্রকল্প। অনুরূপভাবে রেলওয়ের উন্নয়নে ৪৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর অনেকটির কাজ বাস্তবায়নধীন ছিল। এসব উন্নয়ন কার্যক্রমের ফিরিস্তি আমি দেব না। জোর দিয়ে বলতে পারি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে আমি গত তিন বছরে যে কাজ করে দিয়ে এসেছি, যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছি, সেসব প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, অগ্রগতি হয়েছে- সে কাজ ১০০ বছরের ভিতরে পাঁচ বছর মেয়াদি কোনো সরকার উদ্যোগ নিতে পারেনি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে আমি সেসব প্রকল্প গ্রহণ করেছি, বাস্তবায়ন করেছি, তা হবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক এবং একটি ঐতিহাসিক দলিল। ক্রমান্বয়ে আমার সময়ে গৃহীত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে। দেশের জনগণ, ঢাকাবাসী শিগগিরই এসব প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করবেন। আমি যখন দেখি, এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, হচ্ছে- তখন অবশ্যই ভালো লাগে। তবে যখন দেখি নানা অজুহাতে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি হয়, তখন খারাপ লাগে।

প্রশ্ন : আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা বলবেন কি?

উত্তর : আওয়ামী লীগের সংবিধান ও মেনিফেস্টোভিত্তিক কর্মসূচিই আমার রাজনীতি। আমি এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চাই। মানবসেবায় নিজেকে আরও সম্পৃক্ত করতে চাই।

প্রশ্ন : আপনি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেছেন। মোট কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেছেন? সেগুলোর অবস্থা কী?

উত্তর : আমি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে এলাকায় ৬টি কলেজের মধ্যে ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ১৫০টির বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি- এখন যা সরকারি প্রাথমিক স্কুল। এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করেছি। আমার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে অবদান রেখেছি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নতমানের। আমি নিয়মিত এসব প্রতিষ্ঠানের লেখাপড়ার দিক তদারকি করি। যে কোনো অপূর্ণতা শিক্ষার্থীদের স্বার্থে পূরণ করে দিই। আজ মাদারীপুর দেশের শিক্ষাঞ্চল হিসেবে পরিচিত।               

 

 

 


আপনার মন্তব্য