শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ জুলাই, ২০২১ ২৩:৫৯

প্রাণের রমনা পার্ক

তপন কুমার ঘোষ

প্রাণের রমনা পার্ক
Google News

রাজধানী ঢাকায় থাকেন অথচ রমনা পার্ক চেনেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। পাশেই ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ দুটি উদ্যান মহানগরীর ‘ফুসফুস’ বলে খ্যাত। অধুনা মানুষ অনেক বেশি স্বাস্থ্যসচেতন, এ মানতে হবে। শরীরটাকে ফিট রাখতে কত কিছুই না করতে হয়! প্রাতঃকালীন ভ্রমণ অনেকেরই রোজকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এক দিন ছেদ পড়লে উশখুশ করে মন। অনেকে সকাল-বিকাল দুই বেলা হাঁটতে বের হন। কেউ চিকিৎসকের পরামর্শে, কেউ বা নিজে থেকেই শরীরের ঘাম ঝরাতে ছুটে আসেন খোলা জায়গায়, কোনো পার্কে বা উদ্যানে।

ভোর থেকেই নানা বয়সী ভ্রমণকারীর পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে রমনা পার্ক। দিনের আলো ফোটার আগেই অনেকে বেরিয়ে পড়েন ঘর থেকে। অনেকে ফজরের নামাজ আদায় করে মসজিদ থেকেই সরাসরি চলে আসেন। তখনো পার্কের গেট খোলেনি। পাখিদেরও ঘুম ভাঙেনি। তাতে কি! প্রকৃতির কাছাকাছি এসে বুকভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ তো হয়। পুবাকাশে তখন লাল আভা। সূর্য উঠি উঠি করছে। ভোরের পাখিরা স্বাগত জানায় প্রাতর্ভ্রমণকারীদের। রমনায় সূর্যোদয় একটু অন্যরকম। উঁচু গাছের পাতায় রোদের ঝিকিমিকি। পাতার ফাঁক গলিয়ে সূর্যের আলো একসময় পৌঁছে যায় মাটিতে। বৃক্ষতলে রৌদ্রচ্ছায়া। কি অপরূপ সে দৃশ্য! যেন শিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা ছবি!

পার্কের ভিতরে একমুখী চলাচল। সবাই স্রোতের মতো ছুটছেন। এখানে ওখানে দলবেঁধে শরীরচর্চা করছেন অনেকে। কেউ বা হাঁটা শেষ করে বেঞ্চে একাকী বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। মহিলা অঙ্গন, শতায়ু অঙ্গন, ব্যাংকার্স চত্বর বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে শরীরচর্চা কেন্দ্রগুলো। ক্যারাতে প্রশিক্ষণ, যোগব্যায়াম, শোকসভা, দোয়া অনুষ্ঠান কী না হয় রমনায়! দুপুরের দিকে ঝিমিয়ে পড়ে পার্ক। বিকাল না গড়াতেই বৈকালিক ভ্রমণকারীদের পদচারণে আবার মুখরিত হয়ে ওঠে রমনা। উৎসবের দিনগুলোয় রমনা পার্ক বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়। পয়লা বৈশাখের প্রভাতে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আকর্ষণই আলাদা।

রমনা পার্কের মোট আয়তন ৬৮ একর। জন্মকাল ১৯৪৯ সাল। অবশ্য পার্কের গোড়াপত্তন হয় বহু আগেই। ফলদ, বনজ, ওষুধি সব ধরনের বৃক্ষের সমাহার রমনায়। বিশাল আকৃতির শতবর্ষী সব গাছ! বাহু বিস্তার করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। বৃক্ষপ্রেমীদের বড় আকর্ষণ দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ।

ঋতুর পরিবর্তন সহজেই চোখে পড়ে রমনায়। ঝরাপাতা আর কোকিলের কুহুতান জানান দেয় বসন্ত এসে গেছে। রমনা রঙিন হয়ে ওঠে পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার রঙে। গ্রীষ্মে লেকের জল নেমে যায় নিচে। লেকের পাড়ের দখিনা হাওয়ায় জুড়িয়ে যায় প্রাণ। বর্ষায় অপরূপ সাজে সেজে ওঠে রমনা। কত ফুল ফোটে! সবুজ ঘাস, গাছভর্তি সবুজ পাতা, পাখির ডাক, কাঠবিড়ালির দুরন্তপনা, ভেজা মাটি, টইটম্বুর লেক- সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জগৎ। বাদল দিনে রিমঝিম বৃষ্টিতে গা ভেজান অনেকে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে রমনায়। হাঁটার অভ্যাস যারা এক দিনের জন্যও ছাড়তে পারেন না তারা ছাতা মাথায় হেঁটে চলেন এক মনে। যাদের ঘরে ফেরার তাড়া আছে তারা কাকভেজা হয়ে বাড়ির পথ ধরেন। অন্যরা আশ্রয় নেন শেডের নিচে। শীতে শ্রীহীন রমনা পার্ক। ন্যাড়া গাছের শূন্যতা আর শুকনো বিবর্ণ ঘাস মনকে বিষণœ করে দেয়।

রমনা পার্কে রয়েছে অনেক প্রবেশদ্বার। উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম যে কোনো প্রান্ত থেকেই পার্কে প্রবেশ করা যায়। উত্তরায়ণ, অরুণোদয়, অস্তাচল, বৈশাখী, শ্যামলিমা, স্টার গেট- প্রবেশদ্বারের কি সুন্দর সব নাম! পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা পাহারা দেন নিরাপত্তাকর্মী। পার্কে খাবার নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। ধূমপান নেষধ। ভিক্ষা করা মানা।

প্রতিদিন কতজন রমনা পার্কে প্রবেশ করেন তার সঠিক সংখ্যা অজানা। অনেকে অনুমান করে বলেন হাজার পাঁচেক হবে হয়তো। কেউ একটু ভেবেচিন্তে বলেন স্বাভাবিক সময়ে এ সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। পরিচিত-অপরিচিত কত মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় পার্কে। কুশল বিনিময় হয়। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ঠাট্টা-মশকরা সবই চলে। অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। করোনার কারণে রমনা পার্ক আপাতত বন্ধ। এর আগেও দুই দফা বন্ধ ছিল পার্ক। ভোর হলেই রমনার গাছগাছালি-পাখপাখালি হাতছানি দেয়। এটা কি উপেক্ষা করা যায়! এত দিনের অভ্যাস। তাই তো অনেকে ছুটে আসেন রমনায়। তালাবদ্ধ পার্কের আশপাশ দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ঘরে ফিরে যান।

রমনা পার্কের উন্নয়নকাজ চলছে। লাল ইটের হাঁটাপথগুলো প্রশস্ত করা হয়েছে। নতুন টয়লেট নির্মাণাধীন। দুটি সেতু পুনর্র্নির্মাণ করা হচ্ছে। লেক পাড় ঘেঁষে গোল পিলারের ওপর কংক্রিটের রাস্তা বানানো হয়েছে। রমনা পার্ক দেখভালের দায়িত্বে গণপূর্ত অধিদফতর। পার্কের উন্নয়নে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু কাজের ধীরগতি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও মনোযোগী হতে হবে। উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম বরাবর ওয়াকওয়ের সংস্কার জরুরি।

মানুষ এখন অনেক বেশি পরিবেশ-সচেতন। রাজধানীতে ছাদবাগান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সবুজ বাংলাকে আরও সবুজ করতে হবে। ৫ জুন জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান, ২০২১-এর উদ্বোধন করতে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানিয়েছেন। প্রাণের রমনা পার্ক হোক আরও সবুজ, আরও সুন্দর- এটাই রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা।

                লেখক : প্রাতর্ভ্রমণকারী।