মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

দয়াময় প্রভু ফকিরকে বাদশাহর মর্যাদা দান করুন

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

দয়াময় প্রভু ফকিরকে বাদশাহর মর্যাদা দান করুন

এবারের ঈদে ছোটাছুটি ছাড়া কোনো স্বস্তি-শান্তি ছিল না। ধর্মীয় দায়দায়িত্বও তেমন বিশুদ্ধভাবে পালিত হয়েছে বলে মনে হয় না। আট দিন লকডাউন শিথিলের তামাশা বিশ্ব ইতিহাস হয়ে থাকবে। বলেছিলাম, ঈদের পর লকডাউন তেমন সুবিধার হবে না, হয়নি। মাঝখান থেকে কিছু মানুষের হয়রানি। ঠিক আছে, কঠোর লকডাউন যদি করতে পারেন করবেন তবে মানুষকে হেরাজ করে কেন? মানুষের সম্মতি নিয়ে তাদের সন্তুষ্টিতে কোনো কিছু করতে পারলে করুন, জোরজবরদস্তি করে কেন? জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের বাবা ’৭৫-এ মেহেরপুর জেলা গভর্নর ছিলেন। আমিও জেলা গভর্নর ছিলাম। বড় ভালো মানুষ তিনি। ফরহাদও যে খারাপ তা বলি কী করে। বিয়ে করেছে দাদু সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছোট ভাই পট্টু দাদুর মেয়ে। পট্টু দাদু আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতেন। লকডাউনের ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রী হিসেবে ফরহাদের কতটা কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব আছে বুঝতে পারি না। এত বড় একটা কাজ বা ঘটনা তার একার কর্তৃত্বে যে হবে না তা পাগলেও বোঝে। তা যা হোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও সাহসের ফসল পদ্মা সেতু। সেই পদ্মা সেতুতে আছড়ে পড়েছিল এক রো রো ফেরি। ফেরি ডুবে গেলে অর্ধশতাধিক গাড়িসহ কয়েক শ লোকের প্রাণহানি হতে পারত। তা হয়নি সে আল্লাহর ইচ্ছা। রো রো ফেরির চালককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আমার কাছে ব্যাপারটা খুব সহজ মনে হয় না। বাংলাদেশে তো বটেই পৃথিবীর অনেক দেশে অনেক সেতুর কলাম টু কলাম বা পায়ার টু পায়ার এত প্রশস্ত নয়, ১৫০ মিটার মানে ৪৫০ ফুট বলতে গেলে আরও ২-১ ফুট বেশি। এত প্রশস্ত জায়গায় ফেরি লাগিয়ে দেওয়া এটা কথার কথা নয়। বেখেয়ালিপনা, না হয় ষড়যন্ত্র। জানি, বললে কাজ হবে না তবু বললাম। যারা পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া বা কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া ফেরি পার হয়েছে তাদের দুর্দশার অন্ত নেই। ৭০-৭৫ বছর বয়সী মহিলাদের দুই হাতে ব্যাগ নিয়ে ক্লান্ত শরীরে হাঁটতে দেখেছি। ছোট ছোট বাচ্চাদের সে কি দুর্দশা। প্রতিকারের কেউ নেই। উত্তরবঙ্গের যে গাড়িগুলো দেরিতে এসেছে সেগুলোর যাত্রীদের বিড়ম্বনা বলে শেষ করা যাবে না। লঞ্চঘাটে অনেক যাত্রী রাত ৪টায় এসেও কোনো পরিবহন পাননি। তাদের কষ্ট সরকারকে অপ্রিয় করছে। আর যারা সরেজমিনে আছেন তারা যদি মানবিকভাবে এ মানুষগুলোর দুর্দশা দূর করতেন তাহলে তারা হজের সওয়াব পেতেন। মনে হয় সরকারের এবং নেতৃবৃন্দের কারোরই সাধরণ মানুষের সমর্থন বা ভালোবাসার দরকার নেই। দরকার থাকলে এমন নির্দয় আচরণ কেন করা হবে। চিৎকার করে বদদোয়া বা দোয়া কোনোটাই আল্লাহর আরশে ফল দেয় না। মানুষের অন্তর আপনা আপনি দোয়া বা বদদোয়া দিতে পারে। নদীপথে সদরঘাটে আসা যাদের গাজীপুর, টঙ্গী বা মিরপুরে যাওয়ার কথা তাদের যদি বিশেষ ব্যবস্থায় কর্তৃপক্ষ পৌঁছে দিতেন তাহলে তারা বিএনপি, জামায়াতের লোক হলেও মুখে চিৎকার করে বদদোয়া করলেও তাদের অন্তরাত্মা আল্লাহর দরবারে দোয়া করত এবং সে দোয়া আল্লাহর আরশে কবুল ও মঞ্জুর হতো। কিন্তু কেউ শোনে না, কেউ দেখে না। সবাই পাওয়ার দেখায়। যে পাওয়ারের সত্যিকারে কোনো মূল্য নেই। সকালবেলার আমির রে ভাই/ফকির সন্ধ্যাবেলা- এ তো প্রমাণিত সত্য। তবু কেন যে অনেকেই এসব বোঝে না বা বুঝতে চায় না ভেবে পাই না। একটা দীর্ঘ সময় গৃহবন্দী, কোথাও যেতে আসতে পারছি না। প্রতিদিন কারও না কারও মৃত্যুসংবাদ শুনতে পাই। করোনায় প্রতিদিন মৃত্যু কখনো দুই শর নিচে, কখনো ওপরে। তালিকায় প্রিয়জনদের নাম এলে বুক কেঁপে ওঠে। কদিন আগে এলাসিন মওলানা ভাসানী মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা এনামুল করীম শহীদ চলে গেল। বড় ভালো মানুষ ছিল এনামুল করীম। মুক্তিযোদ্ধা ছিল, একসময় জাসদ করেছে। কিন্তু হুজুর মওলানা ভাসানীর দারুণ ভক্ত। আমাকে ভালোবাসত পাগলের মতো। আমাদের যে কোনো সভা-সমাবেশে সব সময় অংশ নিত। আমি একবার এনামুল করীম শহীদের হুজুর মওলানা ভাসানী মহাবিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ শহীদ যে যত্ন নিয়েছিল তা ভোলার নয়।

লেখকের টাঙ্গাইলের বাসভবনে লেখক, প্রখ্যাত সাংবাদিক সায়মন ড্রিং ও আবদুল্লাহ বীরপ্রতীক

জানি সবাই যাবে। কিন্তু এ অসময়ে অনেকের জানাজায়ও শরিক হতে পারি না এটাই এক নিদারুণ কষ্ট। কাদেরিয়া বাহিনীর অন্যতম কমান্ডার লোকমান হোসেন এক সপ্তাহ হলো পরপারে চলে গেছে। তার জানাজায়ও শরিক হতে পারিনি। ভীষণ পরিশ্রম করেছে সে মুক্তিযুদ্ধে। তা ছাড়া ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদেও কমান্ডার লোকমান শরিক হয়েছিল। তার সে যে কি অপরিসীম আস্থা আমার ওপর যা লিখে বোঝানো যাবে না। মৃত্যুর কদিন আগেও ফোন করেছিল, ‘স্যার, দেখতে বড় ইচ্ছা করে।’ কিন্তু তার সে শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো না। আমারও বারবার ইচ্ছা করছিল বেতুয়ার কমান্ডার লোকমানকে দেখার। আল্লাহর যা ইচ্ছা তা-ই তো হবে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা লোকমান হোসেন কমান্ডার ও এনামুল করীম শহীদকে বেহেশতবাসী করুন।

এই তো গত পরশু আজীবন সংগ্রামী গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর, সেই সঙ্গে বিদেশি বন্ধু সায়মন ড্রিং চলে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধে সায়মন ড্রিংয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি যেভাবে পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম হত্যা-লুণ্ঠন, মা-বোনের সম্মান-সম্ভ্রমহানির খবর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্ববিবেককে জাগিয়ে ছিলেন, তেমনি বাঙালির শৌর্য-বীর্য বাঙালির শক্তি-সাহসকে সমানভাবে তুলে ধরেছিলেন। তুলে ধরেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের অমিয় তেজ। তার সেই ভূমিকা আমরা চিরকাল মনে রাখব। সায়মন ড্রিংয়ের সঙ্গে একসময় আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বেশ কয়েকবার তিনি আমার টাঙ্গাইলের বাড়িতেও গেছেন, সভা-সমিতিতে অংশ নিয়েছেন। তার মৃত্যু কেন যেন আমাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছে। অন্যদিকে ফকির আলমগীর ছিলেন একেবারে আপনজন। কতবার কত অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে ওঠাবসা করেছি। আমি যখন নির্বাসনে ছিলাম সে সময় মানিকগঞ্জ-টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ-জামালপুর-কিশোরগঞ্জ-নেত্রকোনা এসব জায়গায় গেলেই গানের মধ্যে আমাকে নিয়ে আলোচনা করতেন। আমি যে তার কত প্রিয়, আমাকে তিনি কত গভীরভাবে ভালোবাসেন তা তুলে ধরতেন। এমন পরম বন্ধু পাওয়া খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। তিনি যেমন হুজুর মওলানা ভাসানীর অনুরক্ত-ভক্ত, তেমনি বঙ্গবন্ধুকেও ভালোবাসতেন আমার মতো। তাই আজ তার সম্পর্কে কিছু না লিখে ’৮৯ সালের ৪ আগস্ট তাকে লেখা আমার একটা চিঠি হুবহু তুলে ধরছি। পরবর্তী কোনো সময় তার লেখা দু-একটি চিঠিও তুলে দেব।

‘ভাই ফকির আলমগীর,

আপনার ০৯.০৭.৮৯-র মধুমাখা আন্তরিকতায় ভরপুর চিঠিখানা সময়মতোই পেয়েছি। আমার ধারণা ছিল, বোধহয় আপনি আমার চিঠি পাননি। অনুলিপির ফাইল খুঁজে অবশ্যই সে চিঠির কপি পাঠিয়ে দেব। গত মাসের প্রথম সপ্তাহে একটা জরুরি কাজে দিল্লি গিয়েছিলাম। প্রায় ১৫ দিন সেখানে কাটিয়ে বাসায় ফিরে অনেক চিঠির মাঝে আপনার চিঠি পেয়ে ভীষণভাবে অভিভূত হয়েছি। আপনাকে এবং আপনার গান আমি ভীষণ ভালোবাসি। দেশের জন্য আপনার এ চারণের ভূমিকাকে আমি অত্যন্ত সম্মান করি। পতনোন্মুখ জাতিকে হতাশা ও দুঃখের অথই সাগর থেকে টেনে তোলা আমাদের কারও একার সাধ্য নয়। দুঃখ বেদনায় মুহ্যমান জাতিকে আবার উদ্দীপ্ত, কর্মচঞ্চল করে তুলতে আপনার মতো মানুষের প্রয়োজন মোটেই কম নয়। ষাটের দশকের শেষে সত্তরের গোড়ায় চট্টগ্রামের শাহ আলী বাঙালির গণজাগরণমূলক গানের সে যে কি তেজ, বঙ্গবন্ধুর বিশাল বিশাল মিটিংয়ে আমি উপলব্ধি করেছি। তারপর স্বাধীনতাযুদ্ধের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলিতে জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবের মাঝেও গানের সে যে কি দুর্দমনীয় সর্বজয়ী আবেদন, হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে মরমে মরমে উপলব্ধি করেছি। আপনার অনেক গানই শুনে আমি মোহিত অভিভূত হই। আপনার মরমি গানে বারবার নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করি।

আপনার বাবার মৃত্যুসংবাদে আমি গভীর বেদনাহত হয়েছি। স্বজনহীন বিদেশ বিভূমে এমনিতেই বেদনার থেকে আনন্দ অনেক কম। তার ওপর আবার প্রিয়জনরা স্বজন হারার ব্যথায় ব্যথিত হলে আমার বুকেও তা বাজে। পরম করুণাময় আল্লাহ আপনার পিতাকে বেহেশতবাসী করুন- কায়মনে এই কামনা করি। কোনো মানুষই অবিনশ্বর নয়। মৃত্যুর হাতছানি আমরা কেউ এড়াতে পারব না। বর্তমানে এই মৃত্যুপুরীতে আপনার পিতার সজ্ঞানে পরিণত বয়সে আল্লাহর প্রিয় হওয়া পুণ্যের ফল। আমরা তাঁর কীর্তি আপনার মতো সুসন্তানের জন্মের মধ্য দিয়ে মনে রাখব।

হুজুর মওলানা ভাসানী ছিলেন আমার জীবনে অফুরন্ত শক্তির উৎস। রাজনৈতিকভাবে তাঁকে অনুসরণ না করলেও তাঁর রাজনৈতিক কোনো পদক্ষেপই আমার কাছে সামান্যতম জনবিরোধী মনে হয়নি। তাঁর যৌবনের শুরুতে প্রজা আন্দোলন থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম লীগ, পাকিস্তানে আওয়ামী মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এমনকি শেষের দিনগুলিতে নানান জাতীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন পুনর্গঠনের কোনো পদক্ষেপই আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়নি। শত বছরের দীর্ঘ জীবনে কোনো রক্তচক্ষু ও ক্ষমতার প্রলোভন তাঁকে বশীভূত করতে পারেনি। আপনার বোধহয় মনে আছে, ষাটের দশকের মাঝামাঝি আমাদের প্রিয় হুজুর আইয়ুবের সাথে একটা বুঝাপড়া করেছিলেন। তখনকার সেই পদক্ষেপ অনেকের কাছে দারুণভাবে সমালোচিত হয়েছিল। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়ার পর ছাত্রকালে আমিও যে দু-চারবার হুজুরের সমালোচনা করিনি তা নয়। কিন্তু বড় হয়ে নানা বই-পুস্তক পড়ে কেন তিনি আইয়ুবের কাছে গিয়েছিলেন, কী তার উদ্দেশ্য ছিল তা যখন স্পষ্ট হয় তখন শ্রদ্ধায় বুক ভরে যায়। আমরা সাধারণত নিজের যশ, খ্যাতি, সুনামের জন্য অনেক সময় জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে তৈরি থাকি। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য জেনেশুনে নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে, লোকসমক্ষে নিন্দিত হতে চাই না। হুজুর কিন্তু তা করেছিলেন। প্রথমবার আইয়ুব খানের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা দীর্ঘ বৈঠক করে বাইরে বেরিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আমার কৃষককুল যদি খেতে পায়, তাদের মুখে সত্যিকারের হাসি ফোটে, পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পাটের ন্যায্য মূল্য ও মোহাজেরদের বাসস্থান এবং কর্মসংস্থান হয় তাহলে আইয়ুব খান কেন আমি শয়তান ইবলিশের সঙ্গে হাত মেলাতেও রাজি আছি।” একজন মহামানবের মানুষের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে এমন কথা বলতে পারেন, সত্তরের দশকেই তা উপলব্ধি করার মতো সামান্য বুদ্ধি আমার হয়েছিল। তাই হুজুরকে অহেতুক অশ্রদ্ধা নয়, শুধু শ্রদ্ধা আর শ্রদ্ধাই করতাম।

হুজুর আমায় দারুণ ভালোবাসতেন। বিশ্বাসও করতেন অপরিসীম। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর দূত হিসেবে গভীরভাবে মেলামেশা করতে পারায় তাঁর জীবন আমার কাছে কাগজের সাদা পাতার মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। আমি তাঁকে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। তাই আমার মধ্যে মোহ সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর কফিন কাঁধে নেওয়ার। বঙ্গবন্ধুর কফিন বইবার একটা সাধ জেগেছিল সমস্ত দেহ-মন অন্তরাত্মা জুড়ে। সে সাধ আমার পূর্ণ হয়নি। অনেক অপূর্ণ সাধের মধ্যে ওটিও আমার জীবনের অপূর্ণ সাধ। ’৭৬-এর ১৭ নভেম্বর রাতে বিবিসির খবরে হুজুরের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলাম। খবর শুনে বুকের ভিতর এমন একটা আঘাত পেয়েছিলাম যা ওর আগে কখনো পাইনি। সে রাতে আমি আর খেতে পারিনি। মনে হচ্ছিল আমার ওপর সমস্ত আকাশটাই যেন দুই ভাগ হয়ে গেছে। বঙ্গপিতাকে হারিয়ে এমনিতেই মুহ্যমান ছিলাম। আহত ব্যথাতুর বুকে হুজুরের শোক সইবার শক্তি ছিল না।

আমি আপনার সঙ্গে একমত, আমাদের অনেকে যুক্তি মানে না। গায়ের জোরের ভরসা করে। আওয়ামী লীগের জন্মবৃত্তান্ত তুলে ধরতে গেলে হুজুর মওলানা ভাসানী, জননেতা শামসুল হককে বাদ দেওয়া যায় না। আবার স্বাধীনতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে এড়িয়ে গেলে কিছুতেই পুরোপুরি বলা বা তুলে ধরা যাবে না। যেটা অসম্ভব সেটাকে অসম্ভব বলেই মানতে বা শিখতে হবে। সংকীর্ণ মন নিয়ে আর যা কিছুই হোক দেশের কল্যাণ সাধন ও জাতি পুনর্গঠন সম্ভব নয়। একজন নেতা যখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তখন তিনি যদি দলীয় গন্ডির বাইরে চিন্তা করতে না পারেন তাহলে তিনি কিছুতেই দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বের ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হবেন না। আমরা যখন দেশ ও জাতিকে নিয়ে চিন্তা করব তখন সবার কথাই ভাবতে হবে। আওয়ামী লীগ করি বলে শুধু আওয়ামী লীগের ভালোমন্দ ভাবলে চলবে না। সম্মান পাওয়ার জন্য অন্যকে সম্মান করা শিখতে হয়। নিজের সুকর্মের স্বীকৃতি পেতে হলে অন্যের গুণ স্বীকার করার সাহস থাকা চাই। আপনি নিশ্চয় আমার প্রতি আস্থা রাখতে পারেন, পরম করুণাময় আল্লাহ ও আমার আরাধ্য দেশবাসী যদি আমায় সুযোগ দেন, এই জাতীয় দৈন্য অবশ্যই অবশ্যই ঘোচাব। বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরতে হলে হুজুরকেও রক্ষা করতে হবে। আমি অসংখ্য মানুষের মতামত জানি, যারা স্বাধীনতার প্রশ্নে হুজুর এবং বঙ্গবন্ধুকে দুই মেরুতে চিহ্নিত করেন না। বরং এক ও অভিন্ন ভাবেন।

ডাকসুতে জাতির পিতার ছবি তোলা নিয়ে আমি আপনার সঙ্গে ভিন্নমত হতে পারলাম না। আমার মনে হয় সত্য একটাই। সত্যকে নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অস্বীকার করা যায় না। কেবল ছবি নিয়ে কাড়াকাড়ি তার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা দেখানো নয়। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর প্রকৃষ্ট উপায় হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ যোগ্যতার সঙ্গে সমাপ্ত করা। না ভাই, যারা আমায় মুক্তিযোদ্ধা বলে মনে করে না তারা মুক্তিযোদ্ধা নয়, বঙ্গবন্ধুকে যারা অপছন্দ করে তারা দেশপ্রেমিক নয়, এমন বোধ এখনো আমার হয়নি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে আমাকে মুক্তিযোদ্ধা না বলা, স্বাধীনতাপ্রেমী হয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার না করার ব্যাপারে তাদের গভীরভাবে ভেবে দেখতে বলা ছাড়া আমার দিক থেকে আর কিছু করার নেই।

আপনার শিল্পী গোষ্ঠী, আপনার পরিবারের সদস্যবৃন্দ আমায় যেভাবে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তা প্রবাসজীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকল। ভাতিজা রানা, রাজীব, রাহুলকে আমার প্রাণ নিংড়ানো ভালোবাসা ও আদর, আপনার শিল্পী গোষ্ঠীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং ভাবিকে সশ্রদ্ধ সালাম। শ্রেণিমত সবাইকে সালাম এবং শুভেচ্ছা জানিয়ে আজকের মতো এখানেই শেষ করছি।

আপনাদেরই একান্ত

কাদের সিদ্দিকী

০৪/০৮/৮৯’

লেখক : রাজনীতিক।

www.ksjleague.com