শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২২:৫৯

কী হবে চলচ্চিত্রের

শীর্ষ প্রযোজনা সংস্থাগুলোর ৯৫ ভাগ বন্ধ

আলাউদ্দীন মাজিদ

কী হবে চলচ্চিত্রের
Google News

নব্বই দশকের শেষভাগ থেকেই একের পর এক বন্ধ হচ্ছে চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। এখন একডজনেরও কম প্রযোজনা সংস্থা কোনোমতে টিকে আছে। এগুলোও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে ছবি প্রযোজনায়। ছবির ব্যবসা মন্দা। তাই প্রযোজকরা ক্রমেই ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। এমন প্রতিকূলতায় কাকরাইলের ফিল্মপাড়া এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে।

এ অবস্থার জন্য আসলে দায়ী কে? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার কাজী হায়াৎ আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভালো মানুষ এখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন না। কারণ এখানে লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত আসে না। অনেক মেধাহীন নির্মাতা শুধু ব্যবসার কথা চিন্তা করে চলচ্চিত্র নির্মাণে নেমেছেন। শিল্পটি তাদের কাছে মুখ্য নয়। এসব মানহীন ছবির কারণে দর্শক চলচ্চিত্রবিমুখ হয়ে পড়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ কমে গেছে। জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, ইবনে মিজান প্রমুখের মতো শিক্ষিত চলচ্চিত্রকার এখন আর এই অঙ্গনে আসেন না। বোদ্ধাদের আগে চলচ্চিত্র আকৃষ্ট করত। এখন চলচ্চিত্র আর বোদ্ধাদের আকৃষ্ট করে না। কারণ মেধাবী ও উচ্চবিত্তের মানুষ অনেক আগেই সিনেমা হলে যাওয়া ছেড়েছেন। একসময় অশ্লীলতা রুচিশীল দর্শকদের সিনেমা হল থেকে তাড়িয়ে দেয়। এরপর ভিডিও পাইরেসি প্রযোজকদের নিরুৎসাহিত করে। তারপর মুঠোফোনে চলে এলো সিনেমা। গ্রামগঞ্জের ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনে মোবাইলে সিনেমা দেখে। তা ছাড়া এখন যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তাদের বেশির ভাগই চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার রফিকুজ্জামান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং তাদের মতো মেধাবীদের কাছে যেতে সাহস পান না। চলচ্চিত্রের নিম্নগামিতার জন্য এসব অবস্থাই দায়ী।’

দেশ স্বাধীনের আগেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত হয় চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার অফিস। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, তোপখানা রোড, নয়া পল্টন, কাকরাইল, গ্রিন রোড, সিদ্দিকবাজার, নবাবপুর, ওয়াইজঘাট, ইসলামপুর, গুলিস্তান, দিলকুশা, মতিঝিল, বিজয়নগর, ওয়ারী, পুরানা পল্টন, গুলশান, ধানমন্ডি, আরামবাগ, ফকিরাপুলসহ নানা স্থানে ছিল প্রযোজনা সংস্থার অফিস।

১৯৫৬ সালে এ দেশে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মিত হলে স্থাপিত হয় প্রযোজনা সংস্থার অফিস। ইকবাল ফিল্মসের ব্যানারে ছবিটি নির্মাণ করেন আবদুল জব্বার খান। তখন এই সংস্থার অফিস স্থাপিত হয় বাহাদুর শাহ পার্কে অবস্থিত প্রুভেনশিয়াল বুক ডিপো ভবনের দ্বিতীয় তলায়। দেশ স্বাধীনের পর গুলিস্তানে গুলিস্তান সিনেমা হল ভবনে প্রযোজনা সংস্থার অফিসগুলো একত্রিত হয়ে গড়ে তোলে ফিল্মপাড়া। দুই হাজার সালের প্রথমদিকে গুলিস্তান সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হলে প্রযোজনা সংস্থাগুলো কাকরাইলে চলে আসে। এখানে রাজমণি ভবন, ভূঁইয়া ম্যানশন, ফরিদপুর ম্যানশন, যমুনা ভবন, ইস্টার্ন কমার্শিয়াল ভবনে খোলা হয় প্রযোজনা সংস্থার অফিস। তখন থেকেই চলচ্চিত্রপাড়া হিসেবে খ্যাতি লাভ করে কাকরাইল। এই ফিল্মপাড়ায় শতাধিক চলচ্চিত্র প্রযোজনার অফিস এই শিল্পটিকে সরব করে রেখেছিল। ২০০৭ সালের পর থেকে নানা কারণে চলচ্চিত্র ব্যবসায় মন্দাভাব শুরু হলে ধীরে ধীরে প্রযোজনা সংস্থাগুলো বন্ধ করে দিয়ে অফিস গুটিয়ে নিতে শুরু করে প্রযোজকরা। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির কর্মকর্তা মিয়া আলাউদ্দীন উদ্বেগের সঙ্গে জানান, এখন এই ফিল্মপাড়ায় একডজন অফিসও নেই। যেগুলো আছে তাতে চলচ্চিত্রের কোনো কাজ নেই। বাধ্য হয়ে অন্য ব্যবসায় অফিসগুলোকে ব্যবহার করছেন সংশ্লিষ্ট প্রযোজকরা। মিয়া আলাউদ্দীনের ক্ষোভ, কাকরাইল ফিল্মপাড়ায় বর্তমানে রয়েছে একডজনেরও কম প্রযোজনা সংস্থার অফিস। যেগুলো ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে। তার মধ্যে কয়েকটি হলো-আশীর্বাদ চলচ্চিত্র, এন এন ফিল্মস, বেনানা ফিল্মস, মালঞ্চ

কথাচিত্র, জননী কথাচিত্র, টি ও টি ফিল্মস, শাপলা মিডিয়া, কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্র এবং হার্টবিট প্রোডাকশন প্রভৃতি। এসব সংস্থা থেকেও নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় না। বর্তমানে কাকরাইলের বাইরে বিভিন্ন স্থানে হাতেগোনা কয়েকটি প্রযোজনা সংস্থার অফিস রয়েছে। যেমন জাজ মাল্টিমিডিয়া, এস কে প্রোডাকশন, লাইভ টেকনোলজি ইত্যাদি। এগুলো থেকেও নিয়মিত ছবি পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিন ধরে প্রযোজনায় অনিয়মিত রয়েছে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রযোজনা সংস্থা জাজ মাল্টিমিডিয়া। আরেক বড় প্রযোজনা সংস্থা হার্টবিট প্রোডাকশন হাউসের কর্মকর্তা তাপসী ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সিনেমা হলে পরিবেশের অভাব, সিনেমা হল হ্রাস। অপর্যাপ্ত সিনেপ্লেক্স এবং দর্শকগ্রহণযোগ্য নায়ক-নায়িকার অভাবে ছবি এখন আর ব্যবসাসফল হয় না। একমাত্র শাকিব খানকে নিয়ে ছবি নির্মাণ করলে সেই ছবি ব্যবসার মুখ দেখে। কিন্তু এই শীর্ষ নায়ককে নিয়ে ছবি নির্মাণ করতে গেলে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা দরকার। সিনেমা হলের সংখ্যা দেড়শরও নিচে নেমে আসায় এই অর্থ ফেরত আনা সম্ভব নয়। আর কলকাতার ছবি এখানে একসঙ্গে মুক্তি দিতে না পারায় দর্শক তা দেখে না। ফলে প্রযোজনা সংস্থা টিকিয়ে রাখতে গেলে স্টাফদের বেতনসহ নানা ব্যয় নির্বাহ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। ফলে প্রযোজনা সংস্থাগুলো এখন চরম অশনি-সংকেতের কবলে পড়েছে।