Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২২:৫৮

খোলা মত

আত্মাহুতি দিতে চাইলে ডাক্তারদের বাঁচাবে কে?

ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

আত্মাহুতি দিতে চাইলে ডাক্তারদের বাঁচাবে কে?

এবার অস্ট্রেলিয়া ফেরার আগের দিন অর্থাৎ গত ১২ ফেব্রুয়ারি ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা : বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে করণীয়’ শীর্ষক বিএমএর সেমিনারে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। বিশাল আয়োজন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী এসেছেন, আরও এসেছেন বিএমএর বিজ্ঞ নেতারা। বিএমএর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, অনুজপ্রতিম অধ্যাপক কামরুল হাসান মিলনের উপস্থাপনায় সেমিনারের মূল প্রবন্ধ পাঠ করেছেন ডা. জামালউদ্দিন চৌধুরী। অধ্যাপক মিলনের উপস্থাপনা সুন্দর হয়েছে, শুরুতে রোমেন রায়হানের ছড়াটি ছিল উল্লেখ করার মতো। সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনার পরে একমাত্র জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মিজানুর রহমান ছাড়া কেউ তেমন সেমিনারের মূল বিষয় নিয়ে কথা বললেন না। তার পরিবর্তে অধিকাংশ বক্তাই ডাক্তারদের সমসাময়িক কিছু সমস্যা যেমন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, ইমেজ সংকট, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য, প্রমোশনের জটিলতা বিষয়ে আলোচনা করলেন।

আমি গভীর দুঃখের সঙ্গে দেখলাম, বক্তাদের আলোচনা ছিল খুব গতানুগতিক এবং খি ত। কারও বক্তৃতা শুনে মনে হয়নি সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যখাতকে বিবেচনায় নিয়ে কেউ কথা বলছেন। আমরা জানি, অনেক কিছু নিয়েই স্বাস্থ্যখাত। যেমন স্বাস্থ্যখাতে নেতৃত্ব প্রদান ও সুশাসন, অর্থায়ন, জনবল, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ ও যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। এবার চিন্তা করে দেখুন সমগ্র স্বাস্থ্যখাতের কতটুকু জুড়ে ডাক্তারদের অবস্থান? সমগ্র স্বাস্থ্যখাতের জন্য প্রয়োজনীয় যে জনবল তার একাংশ কেবল ডাক্তার, অন্যরা নার্স, প্যারামেডিক্স, টেকনিশিয়ান ও অন্যরা। অথচ দেখুন, একটি ভগ্নাংশ হয়েও সমগ্র স্বাস্থ্য খাতের পুরো দায় কিন্তু কৌশলে ডাক্তারদের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়। অনেকটা উদোর পিি  বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মতো। আর আমরাও তখন দিগি¦দিক হারিয়ে কেবল নিজেদের আত্মরক্ষার চেষ্টা করি। আমাদের মধ্যে কোনো এক নেতা মাথা উঁচু করে বলতে পারেন না, ‘কেবল ডাক্তারদের কাঁধে দোষ চাপিয়ে লাভ নেই, সমগ্র স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আসুন কথা বলি’। স্বাস্থ্যবিষয়ক যে কোনো আলোচনা শুরু হওয়া উচিত এ খাতে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে। বাজেটের কত শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত এবং কত শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়? এ বাজেট বরাদ্দের দায় কার? তা কি স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত ডাক্তারদের না সরকারের? প্রয়োজনের চেয়ে কম বাজেট দিয়ে প্রতি অর্থ বছরের শুরুতেই স্বাস্থ্য খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।

তার পরেই আসে স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন এবং নেতৃত্ব প্রদানের বিষয়টি। এখানে সুশাসনের ক্ষেত্রে এক ধরনের হ-য-ব-র-ল অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। এমনিতেই কম বাজেট বরাদ্দ, তার পরে প্রশ্ন হলো, বরাদ্দকৃত বাজেটই বা কতটা দক্ষতা এবং সততার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়?  কেনাকাটার নামে ভয়ঙ্কর সব দুর্নীতির কথা অনেক দিন ধরেই বাতাসে ভাসে। অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা, ক্রয়কৃত পণ্যের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দেখানো, দামি কোম্পানির যন্ত্রপাতি বলে অন্য কোম্পানির নিম্নমানের মাল গোছানোসহ অনেক খানেই দুর্নীতি। কারা করে এসব? কাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি হয় মহাদুর্নীতিবাজ কর্মচারী, শত-হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পত্তির মালিক আবজালরা? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে এ প্রশ্নের জবাব চাওয়া উচিত। এসব দুর্নীতির জন্য অনেক সময় মাঠ পর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্য খাতের কর্মচারীদের নানান ভোগান্তি হয়। ডাকাতি করে রাঘব-বোয়াল, আর গণরোষে পড়ে ডাক্তার। কী চমৎকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা! স্বাস্থ্য খাতে ওষুধ কেনার জন্য কত টাকা বরাদ্দ থাকে আর কত টাকার ওষুধ কেনা হয়? তৃণমূলের হাসপাতাল পর্যায়ে বিনামূল্যে রোগীকে দেওয়ার জন্য কী কী ওষুধ পাওয়া যায়? রোগীদের প্রয়োজনের তুলনায় তা কতটুকু? এ অপ্রতুলতার জন্য দায় কার? ডাক্তারের? প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে জনবল অনেক কম। যেখানে একজন ডাক্তারপ্রতি তিন-চারজন নার্স থাকা জরুরি, সেখানে বাংলাদেশে চিত্রটা উল্টো। এখানে নার্সের চেয়ে ডাক্তারের সংখ্যা বেশি। গত ১০ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে কয়েক হাজার ডাক্তার এবং নার্স নিয়োগ করা হয়েছে। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় দেশে এখনো ডাক্তার-নার্সের সংখ্যা অনেক কম। এই সীমিত জনবল এবং শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সারা দেশে ডাক্তাররা হাসপাতালে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। এ জন্য তো তাদের বাহবা পাওয়া উচিত, অথচ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সময় সব সীমাবদ্ধতার দায় ডাক্তারদের কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি ওয়ার্ডের ফ্যান কেন ঘোরে না, সেই দোষও ডাক্তারের। উপজেলা পর্যায়ে এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে সরকারি ডাক্তারদের মতো আর কোনো ক্যাডারের কর্মকর্তারা কাজ করেন না। অনেকটা হাত-পা বেঁধেই ডাক্তারদের যেন জলে নেমে সাঁতার কাটতে বলা হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে শতকরা কতভাগ হেলথ কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটারসহ কাগজে-কলমে লিখিত সুযোগ-সুবিধা বর্তমানে বাস্তবে বিদ্যমান? অথচ সেখানে জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে তরুণ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পাঠানো হচ্ছে। তারা কি সেখানে তাদের অর্জিত শিক্ষা ও দক্ষতার সঠিক প্রয়োগ করতে পারছে? স্বাস্থ্যসেবা মানে তো কেবল চেয়ার-টেবিলে বসে রোগী দেখা নয়।


আপনার মন্তব্য