শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩৫

আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণে খুনের মিশন

ব্যাপক তৎপরতার সময় জিসানের সহযোগীকে আটক করেছে র‌্যাব, জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণে খুনের মিশন

ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ নিতে দুবাই থেকে ঢাকায় আসে শাকিল। তার পরিকল্পনা- পেশাদার অপরাধীদের দিয়ে ঢাকায় খুনসহ বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত করা। আর এর মধ্য দিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার নিজের অবস্থান ও শক্তিমত্তার জানান দেওয়া। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছিল। সব ঠিকঠাক। কখনো গোপনে, কখনো ছদ্মবেশ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে শাকিল। যোগাযোগ করতে থাকে কিলার গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে। নিজেকে আড়ালে রাখতে হাসপাতালেও ভর্তি হয়েছিল। আর এসব কিছুর পেছনে ছিল দেশান্তরিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। মূলত জিসানের ছক অনুযায়ী মিশন সাকসেস করতে দুবাই থেকে ঢাকায় উড়ে আসে শাকিল। তাদের ছকে মূল নিশানায় ছিল যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। তার এ মিশনের খবর পৌঁছে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কাছে। এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) গোয়েন্দারা তার পিছু নেয়। তার খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে। অনুসন্ধানে এমন কিছু তথ্য পেয়ে যায়, তাতে র‌্যাব কর্মকর্তারা হতবাক। বেশি সময় তারা নেয়নি। গতকাল ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের দখল নিতে আসা ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী শাকিলকে। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন এবং ৬ রাউন্ড গুলি। ভেস্তে যায় অপরাধীদের বড় ধরনের এক নাশকতার পরিকল্পনা। পুরো নাম মাজহারুল ইসলাম। শাকিল এবং শাকিল মাজহার নামেও ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে তার। দুবাই থেকে গত জানুয়ারি ঢাকায় আসে শাকিল।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, সম্প্রতি ক্যাসিনোকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বাত্মক অভিযানের পর টালমাটাল হয়ে পড়ে আন্ডারওয়ার্ল্ড। প্রকাশ্যে থাকা দাগি প্রভাবশালী অপরাধীরাও আত্মগোপনে চলে যায়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসীরা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে পড়ে তাদের। এ অবস্থায় ফাঁকা আন্ডারওয়ার্ল্ড দখলের নানা মেরুকরণ শুরু হয় শীর্ষ অপরাধীদের মধ্যে। দেশ-বিদেশ এমনকি জেলখানায় বসে ঢাকা দখলে বৈঠক চলে। নির্দেশনা পাঠানো হয় অনুসারীদের কাছে। বিশেষ করে শীর্ষ দুই সন্ত্রাসী নতুন করে মাঠ দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এদের একজন কারাবন্দী কিলার আব্বাস, অপরজন কখনো মধ্যপ্রাচ্য আবার কখনো ইউরোপের কোনো দেশে আত্মগোপনে থাকা জিসান। সংশ্লিষ্টরা বলছে, কিলার আব্বাস এবং জিসান এ মুহূর্তে আন্ডারওয়ার্ল্ডে সবচেয়ে বেশি তৎপর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, ক্যাসিনো নিয়ে যে ধরনের অভিযান শুরু হয়েছে, তা প্রকৃত অর্থে শেষ হয়নি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাতবদল করতে এক বছর ধরেই টপটেররদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। নানা সমীকরণ দেখা দেয় তাদের মধ্যে। দীর্ঘদিনের পলাতক ও দেশান্তরী শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ঢাকা নিয়ন্ত্রণে বিদেশে বসেই তৎপরতা চালাতে থাকে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মহড়া শুরু করে। চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ কর্মকা  নিয়ন্ত্রণে তার অনুসারীদের সক্রিয় রাখে। দুবাইয়ে থেকেই সে তার পরিকল্পনা মতো কাজ করতে থাকে। ক্যাসিনোকান্ডে র আগে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার ঠিকাদার জি কে শামীমসহ ঢাকার কয়েকজন গডফাদার দুবাই গিয়ে তার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে। নিয়মিত মাসোয়ারাও দিয়ে আসতেন তারা। আর কারাবন্দী কিলার আব্বাস ইতিমধ্যে ঢাকার মিরপুর, কাফরুল, ভাষানটেক, আগারগাঁও, শেওড়াপাড়াসহ উত্তরের বিরাট অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারি টেন্ডারসহ সেখানকার চাঁদাবাজিও এখন তার নিয়ন্ত্রণে। জেলে থেকেই এসব নিয়ন্ত্রণ করছে তার লোকজন দিয়ে। এখন সে পুরো ঢাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। জিসানও রয়েছে সর্বাত্মক চেষ্টার মধ্যে।

সূত্র মতে, সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের দুই সহযোগীকে দুটি একে-২২ এবং গোলাবারুদসহ গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। একজন ঠিকাদার একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার টার্গেটে এসব অস্ত্র সংগ্রহ করেছিল জিসানের সহযোগীরা। দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করলেও ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। বিরোধকে কেন্দ্র করে কিলিং মিশনের সিদ্ধান্ত নেয় জিসান। আর এ মিশন সাকসেস করতেই শক্তিশালী দুটি অস্ত্র ঢাকায় আনা হয়। নেতৃত্বদানকারী ললাট নামের একজনকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে মাঠে সক্রিয় রয়েছে জিসান গ্রুপের অন্তত অর্ধশতাধিক ক্যাডার। সর্বশেষ গতকাল দুটি পিস্তলসহ জিসানের সহযোগী শাকিলকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। সূত্র জানায়, ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলে কোনো বাহিনীর সদস্যই আর মাঠে থাকে না। দুই মাস ধরে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড অনিয়ন্ত্রণ অবস্থায় রয়েছে। এ সুযোগটি কাজে নেওয়ার চেষ্টা করছে শীর্ষ অপরাধীরা।

শাকিল গ্রেফতারের বিষয়ে গতকাল শনিবার বিকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম জানান, শাকিল চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুবাই থেকে দেশে আসে। মূলত তার দেশে আসার উদ্দেশ্য হলো শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের নির্দেশ ও সহযোগিতায় বাংলাদেশে তার সন্ত্রাসী কার্যক্রম নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা। রাজধানী ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতৃত্ব দেওয়া। র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, প্রথমে এ উদ্দেশ্যে তিনি রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। ভর্তির উদ্দেশ্য ছিল হাসপাতালের কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা সৃষ্টি করে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া।

সারওয়ার বলেন, শনিবার ভোর ৫টায় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে শাকিলকে গ্রেফতার করা হয়। শাকিল একটি সিএনজিতে যাচ্ছিল। চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তি হিসেবে তাকে তল্লাশি করা হয়। তল্লাশি করে তার কোমরে গোঁজা অবস্থায় দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন ও ৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। পরে দেখা যায় সে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সহযোগী মাজহারুল ইসলাম শাকিল। জানা যায়, ২০১৬ সালের জুন মাসে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সম্পাদক রাজীব হত্যার এজাহারে নাম আসার চার দিন পরে শাকিল চীনে চলে যান। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি বসবাস করেন এবং কার্গো সার্ভিস কাজ করেন। ২০১৮ সালে চীন থেকে দুবাই চলে যান এবং ২০১০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দুবাই ছিলেন। আর সেখানেই জিসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, সে দীর্ঘদিন সন্ত্রাসী জিসানের পক্ষে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি করে আসছে। ২০০৫ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র রাজনীতি শুরু করে। পরবর্তীতে সে ঢাকা মহানগর ও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এরপর ২০০৯ সাল থেকে যৌথভাবে টেন্ডার বাণিজ্য শুরু করে।’ ‘এরপর যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সঙ্গে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে ২০১৩ সালে সে গ্রামের বাড়ি ফেনীতে গিয়ে পারিবারিক ব্যবসা ও স্থানীয় রাজনীতিতে জড়ায়। ২০১৫ সালে পুনরায় ঢাকা এলে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।’ এদিকে শাকিলের পারিবারিক সূত্রের দাবি, অসুস্থ অবস্থায় শাকিলকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। পর দিন হাসপাতালে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে শাহবাগ থানায় একটি জিডিও করা হয় বলে দাবি পরিবারের।


আপনার মন্তব্য