শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ জুন, ২০২১ ২৩:১৮

৮৬ বছরে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ছবি পাওয়া গেল না

নিজস্ব প্রতিবেদক

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ছবি পাওয়া গেল না
Google News

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ৮৬ বছরে পা দিয়েছেন। জীবনসায়াহ্নে এসে এক বৈশ্বিক মহামারীতে এখন ‘ঘরবন্দী’ অবস্থায় পড়াশোনা আর লেখালেখি করেই সময় কাটছে প্রবীণ এই শিক্ষকের। ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে কেমন বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল সেই অনুভূতিও ব্যক্ত করেন তিনি। এ ছাড়া করোনাকালীন বাংলাদেশের নানা সংকট নিয়েও কথা বলেন বাম আদর্শে বিশ্বাসী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, যে বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল সেটা ভিন্ন রকমের। আমরা যে বাংলাদেশের জন্য এত আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, এমন একটা রাষ্ট্র চেয়েছিলাম, যা হবে গণতান্ত্রিক। মানুষের অধিকারের সঙ্গে থাকবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিদের একটি কর্তৃত্ব থাকবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ছবি, সেটা পাওয়া গেল না। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত সেই আমলাতান্ত্রিকতা আর গেল না। পুরনো আমলাতান্ত্রিকতা আরও বেড়েছে বহুগুণে।

প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি আমলেও পুঁজিবাদী ধারা ছিল। এখনো সেই পুঁজিবাদী ধারা অব্যাহত রয়েছে। এখন আরও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। দালানকোঠা বেড়েছে। রাস্তাঘাট-কালভার্ট ব্রিজ হচ্ছে। এসব উন্নয়নেও সমাজে এক ধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়েছে। আবার প্রকৃতির এর একটি বৈরী সম্পর্কও রয়েছে। বায়ু ও শব্দদূষণসহ নানাভাবে দূষণও বেড়েছে। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এত উন্নতির মধ্যেও মানুষ স্বাস্থ্য নিরাপত্তা পাচ্ছে না। দেশে একটি স্বাস্থ্যনীতি নেই। সমাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম বেড়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রসার ঘটেছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান বাড়েনি। শিক্ষার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। এটা যে একটি মূল্যবান তা নয়, এক্ষেত্রে সবারই আগ্রহ কমে যাচ্ছে। করোনাকালে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণœতা ও হতাশা বাড়ছে। এতে শিক্ষার চরম ক্ষতি হচ্ছে। শিক্ষাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এ সময় শিল্প-কলকারখানা খোলা থাকলেও বন্ধ রাখা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

বাম আদর্শে বিশ্বাসী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, করোনাভাইরাস, এটা অস্বাভাবিক বিষয় না। এটা পুঁজিবাদী সমাজের পরিণতি। পুঁজিবাদী ধারার উন্নয়ন আজ দৃশ্যমান। এই উন্নয়নের ফলে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। কেবল তাই নয়, প্রকৃতি বিরূপ হচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারী হানা দেওয়ার পর প্রকৃতির ওপর মানুষের অত্যাচার বন্ধ করার আওয়াজটি আরও জোরেশোরে উঠেছে। করোনা পরিস্থিতি হয়তো নিয়ন্ত্রণে আসবে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের যে শঙ্কা, সেটা আমাদের দেশে কঠিন আঘাত ফেলবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপক বলেন, করোনাকালে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে, মানসিক স্বাস্থ্যে একটা বড় রকমের আঘাত এসেছে। সেটা কতটা দৃশ্যমান হবে, জানি না। তবে রাষ্ট্রের উচিত বিষয়টাতে গুরুত্ব দেওয়া। শিক্ষাকে যে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল, সেটা দেওয়া হয়নি। বাজেটে শিল্প-কারখানাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, এ রকম শিক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ব্যক্তি জীবনের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে প্রশ্নে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমি যে কাজগুলো করেছি, এগুলোই আমার করার কথা। কিন্তু এই কাজগুলোতে আরও মনোযোগ ও শ্রম দিতে পারলে হয়তো গুণগতভাবে আরও ভালো কিছু করতে পারতাম। লেখালেখি করা, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যোগদান করতে পেরেছি, এটাই আমার বড় অর্জন। জীবনের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈখালী গ্রামে। তিনি পড়াশোনা করেছেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল, নটর ডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের লিডস ও লেস্টার ইউনিভার্সিটিতে। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৫৭ সালে। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখিতে সমান সক্রিয় ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। প্রবন্ধ, অনুবাদ ও কথাসাহিত্য মিলিয়ে তাঁর রচিত বই প্রায় ১১০টি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় তিনি মাসিক পরিক্রমা (১৯৬০-৬২), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা (১৯৭২), ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র (১৯৮৪) ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ‘নতুন দিগন্ত’ নামে সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার কাজ করছেন এখনো। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যকর্মে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বাংলা একাডেমি স্বর্ণপদক’, ‘বিচারপতি ইব্রাহিম পুরস্কার’, ‘অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার’, ‘বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবুল্লাহ ফাউন্ডেশন পুরস্কার’সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৯৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর