শিরোনাম
রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

জনবল সংকটে বন্ধ ১৩১ স্টেশন

রেলে অব্যবস্থাপনায় লোকসান বাড়ছে কমছে সেবা

শিমুল মাহমুদ, কাজী শাহেদ, রাজশাহী ও সাইদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম

জনবল সংকটে বন্ধ ১৩১ স্টেশন

দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একদিকে রেলওয়েতে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন রুট। সংযোজন হচ্ছে ইঞ্জিন, কোচ। বিদ্যমান ৪৪ জেলার নেটওয়ার্কের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হচ্ছে আরও ১৫টি জেলা। অন্যদিকে কারিগরি জনবল সংকটে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রেলস্টেশন। বিপুল বিনিয়োগে রেলপথ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও জনবল সংকটের কারণে কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না লাখ লাখ যাত্রী। রেলপথের দুই অঞ্চলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন বন্ধ রয়েছে। ফলে অপারেশনাল কার্যকারিতা না থাকায় রেলপথের সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রীরা। রেল গুনছে ধারাবাহিক লোকসানের বোঝা। বন্ধ হয়ে যাওয়া একেকটি রেল স্টেশন যেন ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে মোট স্টেশন সংখ্যা ৪৬৬টি। এর মধ্যে স্টেশন মাস্টার ও অন্যান্য জনবলের অভাবে ১৩১টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ২৩৮টি স্টেশনের মধ্যে ৬৯টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে পাকশি রেল বিভাগে ৪৭টি এবং লালমনিরহাট বিভাগে ২২টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের ২২৮টি স্টেশনের মধ্যে বন্ধ রয়েছে ৬২টি। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যাত্রীদের প্রয়োজনের নিরিখেই এসব রেল স্টেশন স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু স্টেশন মাস্টার ও অন্যান্য জনবলের অভাবে এসব স্টেশন সচল রাখা সম্ভব হয়নি। কোনো কোনো স্টেশন ১০ বছর ধরেই বন্ধ। ট্রেন না থামায়, রেলওয়ের কর্মী না থাকায় বন্ধ হয়ে যাওয়া অধিকাংশ স্টেশন পরিত্যক্ত হয়েছে। কার্যকর তদারকির অভাবে চুরি হয়ে যাচ্ছে রেলের মূল্যবান সরঞ্জাম। 

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের (ঢাকা-চট্টগ্রাম) ২২৮টি রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৪৩টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৮৫টি স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে মোট ৬২টি স্টেশন (বি এবং ডি ক্লাস) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ ৬২ স্টেশনের মধ্যে মেইন লাইনে ৫০টি এবং শাখা লাইনে ১২টি স্টেশন রয়েছে। লোকবল     সংকটের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগে বি-ক্লাস স্টেশনের মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে ভাটিয়ারী, বাড়বকুন্ড, বারৈয়াঢালা, মীরসরাই, মস্তাননগর, মুহুরীগঞ্জ, কালীদহ, শর্শদী, নাওটি, আলী শহর, ময়নামতি, রাজাপুর, মন্দবাগ, খিলা, দৌলতগঞ্জ, বজরা, শাহাতলী, ঝাউতলা, সরকারহাট। আর আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে হাসানপুর, চিতোষী রোড ও মেহের স্টেশন। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগে বন্ধ স্টেশনগুলো হলো- বেগুনবাড়ী, বাউসি, কালিয়াপ্রসাদ, লস্করপুর, টিলাগাঁও, ভাটেরাবাজার, খাজাঞ্চিগাঁও, আফজালাবাদ, ইজ্জতপুর, নরসিংদী, সুতিয়াখালী, নীলগঞ্জ, মোশারফগঞ্জ, ঠাকুরাকোনা, ইটাখোলা ও বিষকা। একই বিভাগে আংশিকভাবে বন্ধ স্টেশনের মধ্যে রয়েছে কেন্দুয়া, জামালপুর, ছাতকবাজার, শহীদনগর, বারৈপটল, হরষপুর ও বারহাট্টা। প্রতিটি বি-ক্লাস স্টেশনে সর্বনিম্ন তিনজন স্টেশন মাস্টারের প্রয়োজন। তবে ডি-ক্লাস স্টেশন পরিচালনা শুধু বুকিং ক্লার্ক থাকলেই হয়। কিন্তু স্টেশন মাস্টারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বুকিং সহকারী না থাকায় এসব স্টেশন বন্ধ রয়েছে।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, এখানে নতুন জনবল নিয়োগ না হলেও বছরের কোনো না কোনো সময় অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবসরে যাওয়ায় নতুন করে স্টেশন বন্ধের উপক্রম দেখা দিয়েছে। দ্রুততম সময়ে নতুন নিয়োগ শুরু না হলে ২০২২ সালের মধ্যে আরও অনেক রেল স্টেশন বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানান রেল সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় দেশে ৮৫৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েল গেজ রেল লাইন ও ১ হাজার ১৮১ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন রেলওয়ে ট্র্যাক নির্মাণ এবং ৭২৫ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসন, রেল সেতু ও লেভেল ক্রসিং গেট নির্মাণের কাজ চলছে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে সিমুলেটর, রিলিফ ট্রেন, বেশ কিছু লোকোমোটিভ ও বগি সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই সঙ্গে বগি সংস্কারের কাজ চলছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত সংযোগের পুরনো রেলরুটগুলো চালু করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্ক সচল রাখার লোকবল নেই রেলওয়ের। সর্বশেষ রেলের জন্য আগের তুলনায় ১০ হাজারের বেশি জনবল বাড়িয়ে মোট ৪৭ হাজার ৬৩৭ জনবল অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু রেলে কর্মরত আছে ১৪ হাজার ৩৫৮ জন। নতুন অনুমোদিত জনবলের বিবেচনায় রেলে ৩৩ হাজার ২৭৯ জনের পদ শূন্য রয়েছে। এই না থাকা জনবলের মধ্যে ৭০ শতাংশই কারিগরি পদের, যাদের দরকার হয় ট্রেন চালানো, লাইন দেখাশোনা বা সিগনালের কাজে। লোকবলের অভাবে নতুন করে রেল স্টেশন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পুরনো দক্ষ কর্মীরা চলে যাচ্ছেন অবসরে। এই লোকবল সংকটের প্রভাব সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে রেলওয়ের জন্য। কারণ, নতুন করে জনবল নিয়োগের পরও তাদের ট্রেনিং দিয়ে কাজের উপযোগী করে তুলতে যথেষ্ট সময় লাগবে। রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, কম গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন বন্ধ রেখে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন চালু রাখা হচ্ছে। সূত্র আরও জানায়, রেলের উন্নয়নে গত এক দশকে নতুন নতুন রেলপথ ও স্টেশন ভবন নির্মাণসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। যাত্রীদের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু বন্ধ স্টেশন চালু না হওয়ায় সেবা পাচ্ছেন না যাত্রীরা। সর্বশেষ ২০১৮ সালে কিছু জনবল নিয়োগ করা হয়েছিল। এরপর নানা জটিলতায় নিয়োগ আটকে আছে। গত ১১ বছরে সারা দেশে নতুন স্টেশন নির্মাণ হয়েছে ৯৫টি। আর ১৩৩টি নতুন ট্রেন চালু হয়েছে। তবে নিয়োগ হয়নি জনবল। নিয়োগ নিয়ে রেলের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলাও ঝুলছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল জোনের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মিহির কান্তি গুহ বলেন, স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টস ম্যানের স্বল্পতার কারণে স্টেশনগুলো বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজন ছিল বলেই এসব স্টেশন স্থাপিত হয়েছিল। তিনি বলেন, জনবল সংকট কেটে গেলে এসব স্টেশন আবার অপারেশনে আসবে। আমরা বর্তমানে ৪১ শতাংশ কম জনবল দিয়ে এ অঞ্চলের রেল চালাচ্ছি। 

অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলেও ১০ বছর ধরে অনেক স্টেশন বন্ধ রয়েছে। এসব স্টেশন সচল করার উদ্যোগও আপাতত নেই। এতে একদিকে যাত্রীরা যেমন চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন রেল স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় প্রতিনিয়ত রেলওয়ের মূল্যবান সম্পদ চুরিও হচ্ছে। স্টেশন মাস্টার ও প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের ভাটেরা, টিলাগাঁও, লস্করপুর ও ইটাখোলা রেলস্টেশনসহ বি এবং ডি ক্লাসের আরও গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্টেশন। শিল্পকারখানা ও চা বাগানবেষ্টিত কয়েকটি রেল স্টেশন বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় আছে। লোকবলের অভাবে দীর্ঘদিন থেকে টিলাগাঁও স্টেশনে ক্রসিং বন্ধ থাকার কারণে লংলা অথবা শমশেরনগর স্টেশনে দেওয়া হয় ট্রেনের ক্রসিং। লস্করপুর বন্ধ থাকায় শায়েস্তাগঞ্জ অথবা রশীদপুর স্টেশনে ক্রসিং দেওয়া হয়। এতে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম আন্তঃনগর ট্রেনকে ক্রসিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়। রেলওয়ে সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মোখলেছুর রহমান বলেন, লোকবল না থাকায় চালু থাকা স্টেশনগুলোতেও সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে দীর্ঘদিন স্টেশনগুলো বন্ধ থাকায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রেলওয়ের মূল্যবান সম্পদগুলো চুরি হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলো দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ থাকায় যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে দুর্ভোগে। কাছের স্টেশন বন্ধ থাকায় অনেক দূরে গিয়ে ট্রেনে চড়তে হচ্ছে। এতে একদিকে রেলের রাজস্ব আয় কমে গেছে অপরদিকে যাত্রীরা সড়কনির্ভর হয়ে পড়ছে বলে জানান তিনি। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রেলে জনবল সংকট রয়েছে সারা দেশে। সত্তরের দশকে সারা দেশে রেলের লোকবল ছিল প্রায় ৬৮ হাজার। যা কমতে কমতে এখন এসে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজারের মতো। এরই মধ্যে রেলের অনেক স্টেশন বন্ধও রয়েছে। এসব বন্ধ স্টেশন চালুর জন্য রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনাও চলছে। নতুন জনবল যোগ হলে পর্যায়ক্রমে এসব স্টেশন চালু হবে বলেও জানান তিনি।