Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৭:০৪

কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, বিএসপি-সকলের বিরুদ্ধেই অভিযোগ!

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, বিএসপি-সকলের বিরুদ্ধেই অভিযোগ!

কেন্দ্র থেকে নরেন্দ্র মোদির সরকারকে উৎখাত করতে ‘মহাজোট’ গঠন করেছে বিরোধীরা। গত মাসে কলকাতার ব্রিগেডে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘ঐক্যবদ্ধ ভারত’ সমাবেশের মোড়কে মোদি বিরোধী ওই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ২৩ টির মতো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। কেন্দ্র থেকে বিজেপিকে হঠাতে কলকাতার সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে হাতে হাত রেখে যারা ‘মোদি হটাও-দেশ বাঁচাও’এর স্লোগান তুলেছিলেন-মহাজোটের সেইসব নেতাদের অনেকেই গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত। কারও বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ‘সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’ (সিবিআই), কেউ আবার রয়েছে ‘এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট’ (ইডি)-এর আতশ কাঁচের তলায়। 
জাতীয় কংগ্রেস থেকে শুরু করে আম আদমি পার্টি (আপ), রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি), বহুজন সমাজ পার্টি (বসপা), সমাজবাদী পার্টি (সপা), তৃণমূল কংগ্রেস-এর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলি। যদিও বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের ধরপাকড় বা অভিযান চালানোর ‘সময়’ নিয়ে বারে বারেই প্রশ্ন ওঠেছে। বিরোধীদের অভিযোগ কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে ব্যবহার করে মোদি তথা বিজেপি সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালাচ্ছে। 
বিজেপি বিরোধী মহাজোটের বৃহত্তম দল শতাব্দী প্রাচীন জাতীয় কংগ্রেস। অথচ এই দলেরই বর্তমান ও সাবেক সভাপতি রাহুল ও সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড’ দুর্নীতির মামলা কয়েক বছরের পুরানো। এছাড়াও ‘অগাস্তা ওয়েস্টল্যান্ড’ ভিভিআইপি হেলিকপ্টার কেনা-বেচা মামলাতেও নাম জড়িয়েছে রাহুল-সোনিয়া গান্ধী এবং এই পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নেতা আহমেদ প্যাটেলের নামও। দলের নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি.চিদাম্বরম, হরিয়ানার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বি.এস.হুডা-বিরুদ্ধে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির মামলায় সিবিআই ও ইডি একযোগে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। চিদাম্বরম ও তার পুত্র কার্তি উভয়েই কোটি কোটি রুপির এয়ারসেল-ম্যাক্সিস কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত। হরিয়ানায় জমি কেলেঙ্কারির মামলায় অভিযুক্ত কংগ্রেস নেতা মোতিলাল ভোরা, অন্যদিকে হুডার বিরুদ্ধে ২০০৪-২০০৭ সালে জমি বন্টনে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
মহাজোটের আরেক দল আরজেডি। দলের প্রধান তথা বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব একাধিক মামলায় অভিযুক্ত। যার মধ্যে অন্যতম হল-পশু খাদ্য কেলেঙ্কারি। এই মামলায় বর্তমানে কারাবন্দী রয়েছেন লালু। আর কারাগারের মধ্যে থেকেই দল পরিচালনা করছেন তিনি। স্ত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী রাবরী দেবী এবং পুত্র তেজস্বী যাদবের বিরুদ্ধেও আইআরসিটিসি, জমি কেলেঙ্কারি সহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। 
এই মুহুর্তে মোদি বা বিজেপি বিরোধী দলের অন্যতম মুখ হলেন মমতা। নিজে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষ হলেও দলের একাধিক নেতা নারদা, সারদা সহ একাধিক আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত। সারদা, রোজভ্যালি সহ বিভিন্ন চিটফান্ড-এর আর্থিক লেনদেনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে জেল খেটেছেন দলের সাংসদ সুদীপ ব্যানার্জি, সাংসদ ও অভিনেতা তাপস পাল, সাবেক মন্ত্রী মদন মিত্র-রা। এছাড়াও সৌগত রায়, কাকুলী ঘোষ দস্তিদার, শোভন চ্যাটার্জি, ফিরহাদ হাকিম, শুভেন্দু অধিকারী, সুব্রত মুখোপাধ্যায় সহ ১১ জন তৃণমূল নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধে ঘুষের রুপি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্টিং অপারেশনে এইসব নেতাদের হাত পেতে রুপি নিতে দেখা গেছে-যা নিয়ে একসময় তোলপাড় হয়েছিল গোটা দেশ। দেড় সপ্তাহ আগে মমতা ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত চলচ্চিত্র প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতাকেও চিটফান্ড মামলায় গ্রেফতার করে সিবিআই। 
আর সম্প্রতি রাজ্যের এক আইপিএস পুলিশ কর্মকর্তার পাশে যেভাবে মমতা দাঁড়িয়েছেন-তা একথায় নজিরবিহীন। সারদা আর্থিক কেলেঙ্কারি মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা বর্তমান কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে তদন্তে অসহযোগিতা, তথ্য লোপাটের অভিযোগ এনে গত রবিবার তার বাসায় যায় সিবিআই। 

মহাজোটের আরেক দল সমাজবাদী পার্টি (সপা) প্রধান অখিলেশ যাদবের বিরুদ্ধে রয়েছে অবৈধ বালু খাদান (মাইনিং) কান্ডে কেলেঙ্কারির অভিযোগ। সিবিআই’এর অভিমত ২০১২-১৩ সালে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে একাধিক সপা নেতাদের সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন। ওই কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ায় তৎকালীন খাদান (মাইনিং) গায়েত্রী প্রসাদ প্রজাপতির। এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশে এসম্পর্কিত একটি মামলাও চলছে। অখিলেশের সময় যে ১৪ টি টেন্ডারের বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল, এলাহাবাদ আদালত তার সবকয়টি বাতিল করেছে। 
ভারতীয় রাজনীতির বহেনজী বলে পরিচিত মায়াবতীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। মহাজাটের অন্যতম দল বিএসপি সুপ্রিমো তথা উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর বিরুদ্ধে পৃথক তদন্ত চালাচ্ছে সিবিআই ও আয়কর দফতর। বহেনজীর ওপর চিনি কল কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। ২০১০-২০১১ সালে মায়াবতীর নির্দেশেই ২১ টি সরকারি চিনি কল বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যার ফলে ক্ষতি হয় ১১৭৯ কোটি রুপি। মায়াবতীর শাসনকালেই তার ভাই আনন্দ কুমারের সম্পদ সাত বছরে ১৮ হাজার শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এই মামলায় তদন্ত চালাচ্ছে আয়কর দফতর। 
অন্যদিকে দেশ থেকে দুর্নীতি মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিল্লি (ন্যাশনাল ক্যাপিটাল টেরিটরি)-তে ক্ষমতায় আসা আপ’এর প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল সহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে। দিল্লির উপ-মুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া’এর বিরুদ্ধে ‘টক টু একে’ মামলা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন-এর বিরুদ্ধে হাওয়ালা কেলেঙ্কারির মামলায় তদন্ত করছে সিবিআই। 
আর বিরোধীদের এই ‘মহাজোট’কে লক্ষ্য করে তোপ দাগতে ছাড়ছে না বিজেপি। আজ বুধবারই নিজের ফেসবুক পেজে মহাজোটকে তোপ দেগে নরেন্দ্র মোদি লেখেন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমার লড়াই  তৃণমূল কংগ্রেস সহ অনেকের ঘুম কেড়েছে। তাই তারা সকলেই কলকাতায় জমায়েত হয়েছিল এবং সম্মিলিত ভাবে আমাকে গালমন্দ করে। তারা তাদের পরিবারকে বাঁচাতে এবং দুর্নীতিকে গোপন করতেই একত্রিত হয়েছিল। দুর্নীতিকে খতম না করা পর্যন্ত আমি বিশ্রাম নেবো না।’ 
সম্প্রতি কানপুরের একটি জনসভা থেকে মহাজোটকে কটাক্ষ করে অমিত শাহ বলেন ‘কেন্দ্রে যদি এই মহাজোট ক্ষমতায় আসে তবে সপ্তাহের প্রতিদিনই আমরা নতুন নতুন প্রধানমন্ত্রী দেখতে পাবো। আর রবিবার গোটা দেশ ছুটি কাটাবে।’ গত রবিবার চঁচুড়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় এসে মহাজোট নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং’এর প্রশ্ন ‘মহাজোটের স্টিয়ারিং কে ধরবে? কে ব্রেক কষবেন? আর কে এক্সেলেটর চাপবে?’ পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ কটাক্ষ করে বলেন ‘সব বাতিল এবং দুর্নীতিতে যুক্ত মানুষদের নিয়েই আমাদের মুখ্যমন্ত্রী জোট গঠনের চেষ্টা করছেন।’ 

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন


আপনার মন্তব্য