শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৫০

রাজপথের শিকারি

মির্জা মেহেদী তমাল

রাজপথের শিকারি

মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে সিএনজিচালক ইসকেন্দার হাওলাদারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ক্লু-বিহীন এ হত্যা মামলাটির তদন্তে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসে। এ হত্যার সঙ্গে জড়িতরা ধরা পড়ে। এরা  ছিনতাইচক্রের সদস্য। পুলিশ এদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য বের করে।  এরা দিনের বেলায় নিরীহ মানুষ। কেউ ফল বিক্রেতা। আবার কেউ ফুল বিক্রেতা। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে হকারি করে। কিন্তু দিন শেষে আঁধার নামতেই ওরা ভয়ঙ্কর মানুষ। তাদের কোনো মায়া-দয়া থাকে না। তাদের প্রয়োজন তখন শুধু টাকা। এতে কেউ সমস্যা করলে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিতেও তাদের হাত কাঁপে না। পুলিশের খাতায় ওরা ভয়ঙ্কর ছিনতাইকারী। রাতের আঁধারে ওরা শিকারের খোঁজে রাজপথে বেরিয়ে পড়ে। যাত্রী সেজে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে তারা। পথে চালকদের অচেতন করে রাস্তায় ফেলে সিএনজি নিয়ে চম্পট দেয়। ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাই চক্রের এমন সদস্য অনেক। গত ছয় বছরে অন্তত দুই হাজার সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, রাজধানীতে সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাইয়ে ১০টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে থাকে চার থেকে পাঁচজন সদস্য। তাদের একজন দলনেতা। দলনেতার নেতৃত্বে দুই ভাগে ভাগ হয়ে রাতে সিএনজি ছিনতাইয়ে নামে তারা। দিনের বেলায় নানা পেশায় জড়িত এসব লোক রাতে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর। চক্রের দুই সদস্য চালককে টার্গেট করে যাত্রী সেজে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে। নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে চক্রের অন্য সদস্যরা। সিএনজিতে উঠে পথিমধ্যে চালকের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। তারপর বাকি দুজনকে রাস্তা থেকে তুলে নেওয়ার কথা বলে ওই নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় সিএনজিচালককে। সেখানে গিয়ে সবাই চা খেতে বসে। চালককেও চা খেতে বলা হয়। সিএনজিচালককে চা দেওয়ার সময় কৌশলে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। চা খেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে চালক অচেতন হয়ে পড়েন। তখন চক্রের কোনো এক সদস্য সিএনজি চালিয়ে অচেতন চালককে রাস্তায় ফেলে সিএনজি নিয়ে পালায়। অনেক সময় অতিরিক্ত ওষুধ সেবনে মারা যান চালকরা। এ ছাড়াও ভয়ভীতি দেখিয়ে অস্ত্রের মুখে সিএনজি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

সূত্রটি জানায়, চক্রের সদস্যরা দিনে কেউ হকার আবার কেউ ভ্যান দিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ফুল, ফল বিক্রি করে। অতিরিক্ত টাকা আয় করতেই রাতে ছিনতাইয়ে নামে তারা। ছিনতাই করা প্রতিটি সিএনজি বিক্রি হয় ৮০ হাজার টাকায়। চক্রের সদস্যরা সিএনজি ছিনতাই করেই দালাল চক্রের মাধ্যমে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। দালাল চক্রের সদস্যরা থানা পুলিশকে না জানিয়ে চাহিদামতো টাকা দিয়ে সিএনজি নিয়ে যেতে বলে। সিএনজিচালক ইসকেন্দার হত্যার ঘটনায় ছিনতাইকারী চক্রের ইলিয়াস গ্রুপের দলনেতা ইলিয়াস, তার তিন সহযোগী ফল বিক্রেতা লিটন, জসিম ও আনোয়ারকে গ্রেফতার করে ডিবি। তারা আগারগাঁও থেকে সিএনজি ভাড়া করে। রাস্তা থেকে আরও দুজনকে ওঠানোর কথা বলে ফার্মগেটে আসে। সেখানে থাকা চক্রের সদস্য মিন্টু চা খাওয়ার সময় কৌশলে চেতনানাশক ওষুধ খাওয়ায়। ওষুধের পরিমাণ বেশি থাকায় মারা যান চালক ইসকেন্দার। পরে তাকে মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকায় ফেলে সিএনজি নিয়ে যাওয়া হয় গাবতলীর সনি সিনেমা হলের পাশে। গোয়েন্দারা বলছে, একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র সিএনজি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। মূলত চালকদের সচেতনতার অভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। যাত্রী উঠানোর সময় তাদের গতিবিধি লক্ষ করা প্রয়োজন। সিএনজিতে ওঠার পর তারা মোবাইলে কী ধরনের কথা বলছে সেটাও খেয়াল রাখা চালকের দায়িত্ব। সন্দেহজনক কোনো স্থানে সিএনজি না থামানো এবং যাত্রী থেকে কোনো খাবার না খাওয়া- এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। সিএনজি মালিকদেরও বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। সিএনজি চুরি হলে দালালচক্রের সাহায্য না নিয়ে বিষয়টি পুলিশ ও ডিবিকে জানাতে হবে। তাহলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সিএনজি উদ্ধার ও জড়িতদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর