শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ জুন, ২০২১ ২৩:২৭

চট্টগ্রাম কাস্টমসে জাদুর কাঠির ছোঁয়া

পণ্য ব্যবস্থাপনায় গতি, বাড়ছে আয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম কাস্টমসে জাদুর কাঠির ছোঁয়া
মোহাম্মদ ফখরুল আলম
Google News

বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপের ফলে পণ্য এনে বন্দরে ফেলে রাখার প্রবণতা ও রাজস্ব ফাঁকি কমে এসেছে। করোনা মহামারীর মধ্যে রাজস্বে প্রবৃদ্ধি না কমে উল্টো বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্বে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়মের গোলকধাঁধা থেকে কাস্টমসকে আলোয় আনার বাতিঘর হিসেবে কাজ করছেন বর্তমান কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম। তিনি বলেন, ‘অনিয়মে একচুল ছাড় দিইনি।’ অন্ধকার থেকে আলোর পথে এই যাত্রার ধারাবাহিকতা চান ব্যবসায়ীরাও। তারা বলছেন, ‘কাস্টমসে সুশাসন বা গুড গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে আগে কেউ এত বড় উদ্যোগ নেননি।’ জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের আয়ের ওপরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। এর পরও প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল করে রাখা হয়েছে। জাহাজ থেকে পণ্য নামিয়ে ইয়ার্ডে বছরের পর বছর ফেলে রাখাই ছিল কিছু ব্যবসায়ীর ‘নিয়ম’। পরিত্যক্ত পণ্য প্রতি মাসে নিলামে তোলার কথা থাকলেও কাস্টমসের জন্মের পর থেকেই তা কখনো হয়নি। ফলে বন্দরে স্থান সংকোচন এবং পণ্য ওঠানো-নামানো ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলেও সুফল মেলেনি। সেই কার্যক্রমে এবার গতি এসেছে। এতে খুশি সৎ এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীরা। শুধু তা-ই নয়, নির্ধারিত সময়ের পর পণ্য নিলামেও গতি এনেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। আগে ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য না নিলে নিলামের নিয়ম থাকলেও তা কার্যকর হতো না। এখন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়ে বন্দর ব্যবহারকারী সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টমসে গত দুই বছরে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির সঙ্গে জড়িতদের লাইসেন্স বাতিল, জরিমানাসহ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অর্থ পাচার রোধে গঠিত ‘অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টিম’ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। দুই বছর ধরেই কাস্টমসে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ করে যাচ্ছেন ফখরুল আলম। তিনি বলেন, ‘অনিয়মের বিরুদ্ধে একচুল ছাড় দিইনি। এর ফলে সৎ আমদানিকারকরা হয়রানিমুক্ত থেকে ব্যবসাসহায়ক পরিবেশ পেয়েছেন। এখন অনিয়ম করার আগে ব্যবসায়ী একাধিকবার চিন্তা করছেন ছাড় পাওয়া যাবে কি না!’ চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার আরও বলেন, ‘জাহাজ থেকে পণ্য নামার ৩০ দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য ছাড় নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে পণ্য নামার ২১ দিনের মধ্যে ছাড়ের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। তা কার্যকর না হলে আমরা নিয়মিতই পণ্য নিলামে তুলব। এর কোনো ব্যতয় ঘটবে না।’ ফখরুল আলম বলেন, ‘অনেক দিন ধরে অনেক উদ্যোগ, চেষ্টার পরও মেয়াদোত্তীর্ণ এবং বিপজ্জনক পণ্য ধ্বংস করা যায়নি। বিভিন্নমুখী জটিলতায় উদ্যোগ সফল হয়নি। এবারই প্রথম আমরা কভিড মহামারীর লকডাউনের মধ্যেই পণ্য ধ্বংস কার্যক্রম শুরু করি। মাঝখানে চট্টগ্রামে কভিডের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় বন্ধ রেখেছিলাম। এখন আবার শুরু করেছি। আশা করছি ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ থাকবে।’

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘অনিয়ম অনেক কমে এসেছে। আমরা এখন ইজি অব ডুইং বিজনেস লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছি, যাতে দ্রুত, বিনা হয়রানিতে পণ্য ছাড় করা যায়।’ এ কাজে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ফখরুল আলম অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই কাস্টমসের সব কর্মী তাঁর মতো সমান আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করুক। তা হলেই পূর্ণ সফলতা পাব।’ বর্তমান কাস্টমস কমিশনারসহ অন্য কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। বিপজ্জনক ও মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক পদার্থ ধ্বংসের উদ্যোগকেও স্বাগত জানান তারা। সাইফ মেরিটাইম লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার আবদুল্লাহ জহীর বলেন, ‘পণ্যভর্তি কনটেইনার ইয়ার্ডে ফেলে রাখলে শিপিং লাইনের আর্থিক ক্ষতি, বন্দরের পরিচালনব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি, কাস্টমসও বঞ্চিত হয় নির্ধারিত রাজস্ব থেকে। এর পরও অনিয়ম বন্ধ করা যায়নি। আশা করছি এবার তারা চাপে পড়বে।’ তিনি মনে করেন, এর ধারাবাহিকতা রক্ষা জরুরি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও নিয়মিত নিলাম আয়োজন হওয়ায় খুশি। চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘আমাদের কাছে ইয়ার্ডের এক ইঞ্চি স্থানও খুব গুরুত্বপূর্ণ; কারণ পণ্য রাখার ইচ্ছামতো স্থান আমাদের নেই। একটি পণ্যভর্তি কনটেইনার ইয়ার্ডে পড়ে থাকা মানে আরেকটি কনটেইনার সেখানে থাকার সুযোগবঞ্চিত হওয়া। অনেক বছর পর কাজটি ধারাবাহিকভাবে সফলতার সঙ্গে করা হচ্ছে। এটি অক্ষুণœ থাকা চাই। বিপজ্জনক পণ্য ধ্বংস করাও একটি বড় অর্জন।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইয়ার্ড থেকে দ্রুত পণ্য ডেলিভারি নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংক ‘ইজি অব ডুইং বিজনেস’ কার্যক্রম পরীক্ষামূলক চালু করেছে। এর বড় অংশীদার চট্টগ্রাম কাস্টমস। এ কাজে দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের সার্টিফিকেট অব অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ইলেকট্রনিক অকশন পদ্ধতি চালু করেছেন; যদিও কিছু জটিলতার কারণে এখনো পুরোপুরি সফলতা পায়নি তা। সেই সঙ্গে পণ্যের এক্সামিন রিপোর্টও অনলাইনে দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছে। বন্দরের আনস্টাফিং শাখার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা হয়েছে; যাতে ব্যবসায়ীরা হয়রানিমুক্ত থাকেন।