সংসদীয় আসনের খসড়া সীমানা নিয়ে নির্বাচন কমিশনে আপত্তি আবেদনের শুনানিতে বাগেরহাটে চারটি আসনই বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সংসদীয় আসন নিয়ে শুনানিতে তারা এ দাবি রেখেছেন। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি থেকে আটটি আসন করার দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ। এ ছাড়া শুনানিতে অংশ নিয়ে পিরোজপুর, সাতক্ষীরা ও বরগুনায় একটি করে আসন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারীরা। গতকাল দ্বিতীয় দিনে ২০টি আসনের শুনানিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনসহ চার নির্বাচন কমিশনার এবং ইসি সচিব উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচন ভবনের অডিটরিয়ামে শুনানির সময়ে দাবি-আপত্তিকারী বা আবেদনকারীর কৌঁসুলি নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে নিজেদের যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন। এবার নির্বাচন কমিশন সীমানা নির্ধারণে ভোটার সংখ্যার সমতা আনতে গিয়ে গাজীপুর জেলায় একটি আসন বাড়িয়ে ছয়টি এবং বাগেরহাটের আসন চারটি থেকে কমিয়ে তিনটির প্রস্তাব করেছে।
বাগেরহাটে আগে চারটি আসন ছিল- বাগেরহাট-১ (মোল্লারহাট-ফকিরহাট-চিতলমারী), বাগেরহাট-২ (সদর ও কচুয়া), বাগেরহাট-৩ (রামপাল ও মোংলা) এবং বাগেরহাট-৪ (মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা)। এবার বাগেরহাট-১ আগের মতো বহাল রাখা হয়েছে। বাগেরহাট সদর, কচুয়া, রামপাল নিয়ে বাগেরহাট-২ আসন এবং মোংলা, মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলা নিয়ে বাগেরহাট-৩ প্রস্তাব করা হয়েছে।
আসন সংখ্যা একটি কমিয়ে দেওয়া নিয়ে ইসির এ সিদ্ধান্ত ‘জনস্বার্থের পরিপন্থি’ বলে অভিযোগ করেছেন বাগেরহাট-৩ আসনের প্রতিনিধি আইনজীবী ওয়াহিদুজ্জামান দিপু। শুনানি শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বাগেরহাটে চারটি আসন। হঠাৎ করে ইসি আমাদের বলেছেন চারটি আসন থাকবে না। একটি আসন বাদ দেওয়া বাগেরহাটবাসী মানে না। এটা অযৌক্তিক, আইন পরিপন্থি এবং বাস্তবসম্মত নয়। বাগেরহাট জেলায় চারটি আসন আগের মতো বহাল রাখার দাবি জানিয়ে আইনজীবী দিপু আশা করছেন, এ বিষয়ে ইসি ‘যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবে’। একই আসনের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার মো. জাকির হোসেন বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন সেই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। তারা সেটা না দিয়ে বাগেরহাটের জনগণের যে চারটি আসন ছিল, সেখান থেকে একটি আসন কমিয়েছে। আসন কমিয়ে বাগেরহাটবাসীর যে অধিকার সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটবিরোধী কাজ করছে ইসি। আমাদের আন্দোলন-সংগ্রামের দিকে ঠেলে দেবেন না বা আমাদের আদালতের দিকে ঠেলে দেবেন না। যাতে ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কোনোভাবে বিঘ্নিত না হয়। বিএনপির জেলা নেতা কাজী মনিরুজ্জামান মনির বলেন, বাগেরহাটে চারটি নয়, দরকার পাঁচটি আসন।
ঝালকাঠীর দুটি আসনের সীমানায় পরিবর্তন চেয়েছেন ইকবাল হোসেন ফোরকান। তার পক্ষে ইসিতে শুনানি করেন তার কৌঁসুলি ড. মো, শাহজাহান। তিনি বলেন, ঝালকাঠী-১ ও ২ আসনের ভোটার সংখ্যায় বিরাট বৈষম্য রয়েছে। বর্তমানে জেলার ৬২ শতাংশ ভোটার ঝালকাঠী-২ আসনে এবং ৩৮ শতাংশ ভোটার ঝালকাঠী-১ আসনে। নলছিটি থানার চারটি ইউনিয়ন- রানাপাশা, সুবিদপুর, কুশঙ্গল ও মোল্লারহাট ঝালকাঠী-২ আসন থেকে কেটে ঝালকাঠী-১ আসনে যুক্ত করার আবেদন জানান। এতে ভোটার সংখ্যার ভারসাম্য আসবে বলে জানান তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে আসন আটটি করার দাবি : পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি থেকে আটটি আসন করার দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ। গতকাল নির্বাচন কমিশনের (ইসি) শুনানি শেষে তারা সাংবাদিকদের এ দাবির কথা জানান। লিখিত বক্তব্যে তারা জানান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবান পার্বত্য তিন জেলার আয়তন ১৩ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৮১৫। ৩ পার্বত্য জেলায় মাত্র তিনটি সংসদীয় আসন। সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নন কর্মকাণ্ড এবং এখানকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান পরিবর্তন থেমে আছে প্রয়োজন অনুযায়ী সংসদীয় আসনের উন্নিত না করায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনজন সংসদ সদস্যের পক্ষে ২৬টি উপজেলার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা কষ্টসাধ্য। লিখিত দাবিতে স্বাক্ষর করেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি প্রকৌশলী শাহাদাৎ ফরাজী সাকিব, প্রকৌশলী নাজমুল হক। তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি পাইশিখই মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠাকালীন সিনিয়র সহসভাপতি ইব্রাহীম খলিল চৌধুরী। তারা রামগড়, মানিকছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি ও গুইমারা নিয়ে খাগড়াছড়ি-১; মাটিরাঙ্গা, মহালছড়ি ও পানছড়ি নিয়ে খাগড়াছড়ি-২ এবং খাগড়াছড়ি সদর ও দীঘিনালা নিয়ে খাগড়াছড়ি-৩ আসন গঠনের প্রস্তাব করেছেন। এদিকে বাঘাইছড়ি, লংগদু ও বরকল নিয়ে রাঙামাটি-১; রাঙামাটি সদর, নানিয়ারচর ও কাউখালী নিয়ে রাঙামাটি-২ এবং জুড়াছড়ি, বিলাইছড়ি, রাজস্থলী ও কাপ্তাই নিয়ে রাঙামাটি-৩ আসন চেয়েছেন তারা। এ ছাড়া তারা বান্দরবান সদর, রুমা, থানচি ও বোয়াংছড়ি নিয়ে বান্দরবান-১ এবং লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি নিয়ে বান্দরবান-২ আসন প্রস্তাব করেছেন।
নির্বাচনের জন্য ৩০০টি আসনের মধ্যে ৩৯টির সীমানায় পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করেছে ইসি। কিন্তু নানা দাবি-আপত্তি ওঠে ৮৩টি আসনের বিষয়ে। এর মধ্যে সীমানায় পরিবর্তন আনা এবং বর্তমান সীমানা বহাল রাখার আবেদনও আছে। ১ হাজার ৭৬০টি আবেদনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৮৩টি এসেছে কুমিল্লা অঞ্চল থেকে। সবচেয়ে কম আবেদন পড়েছে সিলেট অঞ্চলে। আর তিনটি আবেদন পড়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলে। গত ২৪ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এ শুনানি চলবে চলতি মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত। এ চার দিনে দাবি-আবেদন নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত সীমানা প্রকাশ করবে ইসি।
ঢাকার ১৩টিসহ ২৮ আসনের শুনানি আজ : শুনানির তৃতীয় দিন আজ মঙ্গলবার মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা জেলার ২৮টি আসনে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আসনগুলো হচ্ছে, ঢাকা-১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ১০, ১৪, ১৫, ১৬, ১৮ ও ১৯। এ ছাড়া মানিকগঞ্জ-১, ২ ও ৩; মুন্সীগঞ্জ-১, ২ ও ৩; গাজীপুর-১, ২ ও ৬; নরসিংদী-৩, ৪ ও ৫ এবং নারায়ণগঞ্জ-৩, ৪ ও ৫ আসনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।