১৪ নভেম্বর, ২০২১ ১০:৫৯

মাদকসহ সব অপরাধ ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা চাই

খায়রুল কবীর খোকন

মাদকসহ সব অপরাধ ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা চাই

খায়রুল কবীর খোকন

জনগণের যথার্থ ভোটে নির্বাচিত না হয়ে থাকলেও কোনো কোনো ‘জনপ্রতিনিধি’ (!) দু-চারটি ভালো কথা কখনো কখনো বলে ফেলেন। জনগণের প্রতি তাদের ভালোবাসা কতটা তা বোঝা মুশকিল, তবে কথা তো তাদের কিছু বলতেই হয়, না হলে কীসের রাজনীতিবিদ!

এই যেমন পাবনার সংসদ সদস্য শামসুল হক টুকু। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি (এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও বটে), তিনি মাদক চোরাকারবার নির্মূলে সব বড় পেশাজীবীর সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রী-এমপিদেরও ‘ডোপ-টেস্টের’ সুপারিশ করেছেন। চমৎকার প্রস্তাব। নিঃসন্দেহে একটি ভালো পরামর্শ।

(একটা ব্যাখ্যা দরকার- ‘মাদক ব্যবসায় বা ব্যবসায়ী’ বলে অনেকে বিভ্রান্তিকর কথা বলেন; মাদক আনা-নেওয়া, হস্তান্তর সব সময়ই ‘চোরাকারবার’, এটা কখনই কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, এটাকে ব্যবসা বলা হলে বৈধ জিনিসপত্রের ব্যবসায়ীদের অপমান করা হয়)।

শামসুল হক টুকু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির ৭ নভেম্বরের বৈঠকে মাদক নির্মূলে এমপি-মন্ত্রীসহ সব শ্রেণির মানুষকে ডোপ টেস্টের আওতায় নিয়ে আসার প্রস্তাব দেন। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ কমিটির অন্যসব সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন মারাত্মক তথ্য দেন- কক্সবাজারের বিভিন্ন মাদরাসা, স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা মাদক চোরাকারবারে জড়িত। সেখানকার স্থানীয় লোকজন একে ‘পার্টটাইম ব্যবসা’ মনে করে।

কী ভয়াবহ পরিস্থিতি মাদক চোরাকারবারে তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। সাধারণ মানুষের মধ্যে যারা নিরক্ষর বা অল্পশিক্ষিত তাদের কথা পরে হবে। আগে ধরি আমরা স্কুল, মাদরাসা ও কলেজ শিক্ষকদের- তারা এমন লেখাপড়া শিখে, এমনকি উচ্চশিক্ষিত হয়ে শিক্ষকতার মতো পবিত্র পেশায় যোগদান করে এ রকম ইবলিশ হলেন কী করে! আর এ ঘটনা কি কেবল কক্সবাজারে? সারা দেশেই এমন মাদক চোরাকারবারি শিক্ষক বা উচ্চশিক্ষিত পেশাদার ব্যক্তি পাওয়া যাবে নিশ্চিতভাবে। বেশ কয়েক বছর আগে ঢাকা মহানগরীর সোবহানবাগের একটি শিক্ষার্থী হোস্টেল থেকে উঁচু ক্লাসের কয়েকজন ডেন্টাল শিক্ষার্থী গ্রেফতার হয়েছিলেন বিপুল পরিমাণ হেরোইনসহ। এ রকম উচ্চশিক্ষিত বা হতে-যাওয়া উচ্চশিক্ষিত লোকজন, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা শিক্ষক কত আছেন আমাদের দেশে যারা অর্থলোভে উন্মাদ হয়ে নিজেদের নীতি-নৈতিকতা জলাঞ্জলি দিয়েছেন, বড় বড় পন্ডিত, শিক্ষাবিদ না হয়ে বড় বড় ইবলিশ হয়েছেন!

খোদ কক্সবাজার তো ইয়াবা, হেরোইনসহ নানা ধরনের মাদক চোরাকারবারের মস্তবড় গুদাম আর ট্রাফিকিং রুটে পরিণত সুদীর্ঘকাল ধরে। ওপারকার মিয়ানমার হচ্ছে এক মগ-দস্যু রাষ্ট্র, তার সেনাবাহিনীর জেনারেলরা ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক উৎপাদন ও এর চোরাকারবারে যুক্ত, সেটা তো হাজারবার নয়, লাখোবার দুনিয়াব্যাপী পত্রপত্রিকায় ও অন্যসব মিডিয়ায় রিপোর্ট হয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফে ‘বিখ্যাত এক রাজনীতিবিদ’(!) আছেন তিনি এমপিও হয়েছিলেন, তার পরিবার-পরিজন সবাই মিলে তো মাদকের চমৎকার হাট বানিয়েছেন পুরো কক্সবাজার জেলাটিকে। তারাই মূলত মাদক চোরাকারবার পরিচালনা করেন সারা দেশে। তার পরিবারের লোক এখনো সরকারি দলের মনোনীত জনপ্রতিনিধি। সংসদ সদস্য হওয়ার মতো যোগ্য লোকের সেখানে এমনই অভাব! আর লোক পাওয়া যায় না সেখানে? আর আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলের আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতা কোথায় উবে গেল! মাদক চোরাকারবারির প্রচন্ড বদনামের কারণে মনোনয়ন দিতে সমস্যা হওয়ায় তারই পরিবারের সদস্যকে মনোনয়ন দিতে হলো! কার্যত সেই মাদকসম্রাটকেই টিকিয়ে রাখা হলো।

ইতিমধ্যে গত তিন-চার বছরে সারা দেশে কয়েক শ (প্রায় ৫০০ বা তারও বেশি) মাদক চোরাকারবারিকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হয়েছে। গ্রেফতারও করা হয়েছে হাজার হাজার মাদক চোরাকারবারিকে। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন করা যায়নি। কারণ মাদকের সরবরাহের উৎপাদনস্থল থেকে ঢোকানোর রাস্তার প্রথম এন্ট্রি পয়েন্টে তা আটকানো যাচ্ছে না। আর বড় বড় গডফাদারকে আটকানো যাচ্ছে না, চুনোপুঁটিদের ধরে কেবল আওয়াজ দেওয়া হচ্ছে- ‘মাদকবিরোধী অভিযান চলছে জোরসে’।

সংসদীয় কমিটির ওই সভাতেই পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ মাদক চোরাকারবারিদের সামাল দিতে ব্যর্থতার কারণ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মাদক চোরাকারবারিদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হচ্ছে; কিন্তু প্রলম্বিত বিচার কার্যক্রম, বিচারকস্বল্পতা এবং সহজে জামিনে বের হয়ে যাওয়া যেন চিরাচরিত নিয়ম। জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার সেই মাদক চোরাকারবারে ফিরে আসে তারা। একটি মাদক মামলার বিচার সম্পন্ন করে রায় হতে প্রায় ১২ বছর লেগে যায়। মাদকদ্রব্য সবই আসে দেশের বাইরে থেকে।’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন জানালেন আরও ভয়াবহ তথ্য- ‘মাদক মামলায় কেউ সাক্ষ্য দিতে আসে না, তাই আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। জামিনে মুক্ত হয়ে মাদক অপরাধীরা আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তা ছাড়া দীর্ঘদিন মামলা চলার পর একসময় দেখা যায় মামলার নথিপত্র আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!’

শতভাগ সত্য উচ্চারণ করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু, সিনিয়র সচিব, আইজিপি, র‌্যাব মহাপরিচালক। কিন্তু তারা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের সময়কার ব্যর্থতারই প্রমাণ রাখলেন। কেন তারা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারলেন না বা পারছেন না? সেই প্রশ্নের জবাব তো তাদেরই দিতে হবে। কীভাবে দিনদুপুরে স্কুল কম্পাউন্ডে ঢুকে (চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরে/৭ নভেম্বর) রামদা ইত্যাদি দিয়ে কুপিয়ে পরীক্ষার্থীকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা হাঁটতে হাঁটতে বীর দর্পে চলে যায়? কেউ তাদের ধাওয়া করার সাহসও পায় না। জেলা শহরের টহল পুলিশ কোথায় ছিল? কোথায় ছিলেন স্কুলের শিক্ষক, কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মীরা?

নির্বাচনী সহিংসতায় কীভাবে একের পর এক প্রাণহানি ঘটছে, অসংখ্য মানুষ আহত ও পঙ্গু হচ্ছে ভোট কেন্দ্রে ও আশপাশে? দুর্বৃত্তদের হামলায় সারা দেশে কত মানুষ চুরি, ডাকাতি, দস্যুতার শিকার হচ্ছে রোজ? সড়ক দুর্ঘটনায় (গাড়িচালক ও অন্য নাগরিকদের অবহেলার কারণে) প্রাণহানি ও পঙ্গুত্ববরণের ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে অবিরাম এবং প্রতিদিনই এর হার বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন, কার দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতায়? পুুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনী ও অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা অবিরাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের লজিস্টিক সাপোর্টও বাড়ছে, কিন্তু জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিস্থিতির এতটুকু উন্নতি হচ্ছে না- এত ব্যর্থতা কার কার ভুলে, কার কার দায়িত্ব পালনে অক্ষমতায়?

নারী ও শিশু নির্যাতন, নারী পাচারসহ নানা ধরনের নতুন নতুন অপরাধ নৈরাজ্য বেড়ে চলেছে অবিরাম, সেসবের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না কেন? আজকে অকাতরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যে বিষয়গুলো বললেন সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মাদক অপরাধের ব্যাপারে, সেসব তো তাদের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ, তাতে সত্য উচ্চারণ আছে, তা খুবই ভালো খবর; কিন্তু তারা যে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন সময়মতো করেননি তার কী হবে? তার জবাবদিহি কে করবে?

আজ দেশে অপুষ্টিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬০ ভাগের অধিক, নিয়মিত দুই বেলা পেট পুরে খেতে না পারা মানুষের সংখ্যা ৩৫ শতাংশের বেশি, তারা শিক্ষাবঞ্চিত, অন্যসব মৌলিক-চাহিদা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। দেশের মানুষের পুষ্টিকর খাবারের জোগানের ব্যবস্থা নিতে হবে। কাঁটাতারের বেড়া দিতে হবে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে, বিজিবিকে অবৈধ চলাচলকারী দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাদকের সঙ্গে সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র চোরাচালান এবং অন্যসব অপকর্মের হোতা অপরাধীদের আনাগোনাও চলে একই সঙ্গে। সবকিছু একসঙ্গে বন্ধ করতে হবে কঠোর হাতে।

লেখক : বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসু সাধারণ সম্পাদক।

 

বিডি প্রতিদিন/ ওয়াসিফ

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর