শিরোনাম
৭ আগস্ট, ২০২১ ২০:২১

ম্যান্ডেলা কারাবন্দী অবস্থাতেই শুনেছেন বঙ্গবন্ধুর কথা

আ স ম মাসুম, যুক্তরাজ্য

ম্যান্ডেলা কারাবন্দী অবস্থাতেই শুনেছেন বঙ্গবন্ধুর কথা

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার কখনো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে মিলিত হওয়ার বা কথা বলার সুযোগ হয়নি। ম্যান্ডেলা-বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর দুই প্রান্তের দু’জন হলেও দু’জনের বেড়ে উঠা থেকে শুরু করে রাজনীতির উত্থান, আদর্শ, কারা যন্ত্রণাভোগ সবকিছুতেই একটা মিল ছিল।  

বঙ্গবন্ধুর উত্থানের সময় থেকে শুরু করে মৃত্যুর অনেক পর পর্যন্ত মানে ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নেলসন ম্যান্ডেলা কারাবন্দী ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অসামান্য নেতৃত্ব, বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধকরণ, একটি স্বাধীন দেশ অর্জন সব কিছুই আফ্রিকার ভয়ংকর জেলখানার বাসিন্দা নেলসন ম্যান্ডেলা’র কাছে পৌঁছেছে। হয়তো ম্যান্ডেলা জেলজীবনে থেকে বঙ্গবন্ধুর লড়াই আর সংগ্রামের জীবন থেকে কোনো একটা বার্তা পেয়েছিলেন, যার জন্য যার সাথে কোনোদিন দেখা হয়নি, তার কীর্তি আজীবন মনে রেখেছেন! 

এমন তথ্য পাওয়া যায় যুক্তরাজ্য প্রবাসী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ওয়েস্টমিনিস্টার সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলার মরহুম মুশতাক কোরেশীর লেখা ‘আমার প্রবাস জীবন ও রাজনীতি’ শীর্ষক বইতে।

মুশতাক কোরেশী তার বইতে লিখেছেন, ১৯৯৬ সালে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাজ্য সফরে আসেন ম্যান্ডেলা। ৯ জুলাই এই বিশ্ব নেতাকে বাকিংহাম প্যালেসে সংবর্ধনা দেয়া হবে এবং এটি ওয়েস্টমিনিস্টার কাউন্সিলের আওতায়, সেহেতু তাকে এই কাউন্সিলের পক্ষ থেকে সর্বাগ্রে সংবর্ধনা দেয়া হবে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মানপত্র পাঠের দায়িত্ব দেওয়া হয়। লন্ডনে সাউথ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে আমি সপরিবারে অংশ নিয়েছি। একবার অনশন ধর্মঘট করার সময় আমাকে গ্রেফতারও করা হয়। সেই সুবাদে আমাকে মানপত্র পাঠ করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

মুশতাক কোরেশী অনুষ্ঠান সম্পর্কে লিখেছেন, আমার তখন আনন্দ ধরছে না, কারণ আমি নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে শুধু কথা বলা নয়, তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও অংশ নিচ্ছি। আহারের পরে বাড়ি ফেরার পালা। কিন্ত আমাদের চুপি চুপি বলা হলো যে, রাষ্ট্রীয় অতিথি যতক্ষণ পর্যন্ত ভোজনকক্ষ ত্যাগ না করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো অতিথিকেই যেতে দেওয়ার নিয়ম নেই। আমরা আরেকটি কক্ষে গিয়ে বসলাম। সেখানে নানা রকম পানীয়, ধূমপানের ব্যবস্থা ছিল। আমি একটি সিগার ধরিয়ে আয়েশ করে টানছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই একজন ফুটম্যান এসে আমাকে বললেন যে, প্রেসিডেন্ট ওয়ান্টস টু সি ইউ।

আমি প্রায় লাফিয়ে দাঁড়ালাম এবং যন্ত্রের মতো তাকে অনুসরণ করলাম। আমরা ওই রুমে ঢোকার আগে সেখান থেকে আরও অতিথি বেরিয়ে এলেন, বুঝলাম তিনি পালা করে সবার সঙ্গে দেখা করছেন। আমি যাওয়ার পরে আমার সঙ্গে আবার হাত মিলিয়ে বসতে বললেন। লন্ডনে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কথা বলেছি কিন্ত বাকিংহাম প্যালেসে বসে নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে কথা বলার কখনো সুযোগ হবে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি। নেলসন ম্যান্ডলা আমার কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে এটা-সেটা প্রশ্ন করলেন। আমি যথাসাধ্য উত্তর দিলাম। বুঝতে পারলাম যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বেশ ওয়াকিবহাল।

হঠাৎ আমাকে বললেন, তোমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান একজন অত্যন্ত উঁচুস্তরের নেতা ছিলেন। পাকিস্তানি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি অনেক জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে তোমাদের একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। তোমাদের দুর্ভাগ্য যে, তাকে ওরকম নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।

কথাগুলো শুনে আমি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে যাই এবং আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। বুঝতে পারছিলাম যে, আমাকে তিনি অনেকক্ষণ সময় দিয়েছেন। আমার ওঠা উচিত। তিনি আবার আমার সঙ্গে হাত মেলালেন। আমি বেরিয়ে এলাম এবং সম্ভবত আমিই প্রথম বাঙালি যার সৌভাগ্য হয়েছিল নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতের। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে তার বৈদগ্ধ্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল কিন্তু বিস্মিত হইনি, কারণ তার মতো বর্তমান সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কের পক্ষে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানাটাই স্বাভাবিক কিন্তু এতোটা যে জানেন জানতে পারলাম তার সঙ্গে সাক্ষাতের পর। 

এই ঘটনার ঠিক ৯ মাস পর, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফরে যান। ১৯৯৭ সালে ২৬ মার্চের সেই অনুষ্ঠানেও তিনি তার ভাষণে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। বলেছিলেন, আমার গভীর শ্রদ্ধা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি! আমি আজ এই মহান দেশে দাড়িয়ে বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চাই!
    
বিডি-প্রতিদিন/বাজিত হোসেন

এই বিভাগের আরও খবর