শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:১৬

অনুপ্রেরণীয়

প্রতিবন্ধী মাবনের মৃত্তিকা এখন আন্তর্জাতিক মডেল

সাইফউদ্দীন আহমেদ লেনিন, কিশোরগঞ্জ

প্রতিবন্ধী মাবনের মৃত্তিকা এখন আন্তর্জাতিক মডেল

এলাকায় ‘মাবন’ নামে পরিচিত। তিনি একজন প্রতিবন্ধী কিন্তু হার মানেননি জীবনযুদ্ধে। নিজের কর্মক্ষমতা দিয়ে শুধু নিজের এলাকা বা দেশেই নজির স্থাপন করেননি, নজর কেড়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। তার কর্মযজ্ঞের মধ্যদিয়ে গড়ে উঠেছে ‘মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’- যা এখন আন্তর্জাতিক মডেল...

 

পুরো নাম মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া (৪২)। এলাকায় ‘মাবন’ নামে পরিচিত। তিনি একজন প্রতিবন্ধী।  নিজের কর্ম ক্ষমতা দিয়ে শুধু নিজের এলাকা বা দেশেই নজির স্থাপন করেননি, নজর কেড়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। তার কর্মযজ্ঞের মধ্যদিয়ে গড়ে উঠেছে ‘মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’- যা এখন আন্তর্জাতিক মডেল। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার গোথালিয়া গ্রামের এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম মাহবুবুরের। মা গত হয়েছেন প্রায় ৫ বছর হলো। বাবা মুছা ভূঁইয়া (৯৬) এখনো বেঁচে আছেন। পরিবারের তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। যে ছেলের পড়াশোনা করার কথা ছিল না, সে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশেষ শিক্ষায় স্নাতকোত্তর করেছেন। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট থেকে জার্নালিজমে ডিগ্রিও অর্জন করেন। বর্তমানে চাকরি করছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পল্লী-কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনে (পিকেএসএফ)। অথচ শৈশবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল প্রতিবন্ধিতা। বই-খাতা নয়, হাঁটার জন্য শৈশবে প্রথম হাতে নেন লাঠি। অজপাড়া গায়ের কবিরাজ, বৈদ্যের ঝাড়-ফুঁক আর ডাক্তারের শত চেষ্টাতেও ওকে প্রতিবন্ধিতা হতে ফেরানো যায়নি। বাড়ির পাশের স্কুলে যেত, কিন্তু অন্য শিশুরা তাকে খেলায় নিত না। বাবা উপায়ন্তর না দেখে ৫ মাইল দূরের এক হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তিও করিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানকার মৌলভি সাহেবও একদিন বাবাকে বলেন, ‘ওতো একা দাঁড়াতে পারে না। ও ইমামতি করবে কীভাবে? ওকে দিয়ে কিছু হবে না।’ কিন্তু ৪২ বছর আগের এসব স্মৃতি মুছে দিয়েছেন মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া ওরফে মাবন। অতীতের দুঃসহ ওই স্মৃতি মুছতে তিনি শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নীত হওয়ার পর ভেবেছেন অন্য সবার জীবন থেকে ওই রকম দুঃসহ যাতনা মুছে দিতে হবে। তাই তিনি গড়ে তোলেন ‘মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন’- যার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালে। অবশেষে সেই মৃত্তিকা এখন কিশোরগঞ্জ জেলার প্রতিবন্ধী মানুষের ভরসার স্থান। ১০ বছর ধরে নিজ চাকরির পাশাপাশি মাহবুব সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাক্সক্ষী-সমব্যথী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের সহযোগিতায় এলাকার ৩ হাজারের অধিক হতদরিদ্র প্রতিবন্ধী পরিবারসহ দুস্থ কৃষক ও বয়স্ক মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ ওষুধ, প্রায় ২০০ প্রতিবন্ধী ও অপ্রতিবন্ধী পরিবারের নারীদের সেলাই ও বিউটি পারলার প্রশিক্ষণ এবং দুস্থ প্রতিবন্ধী নারীদের বিনামূল্যে সেলাই মেশিন প্রদান করেছেন। ২০০-এর অধিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর শিক্ষা-উপকরণ ক্রয়ে এককালীন নগদ অর্থ ও শিক্ষা বৃত্তি প্রদান, প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষায় আগ্রহ সৃষ্টিতে প্রতিবছর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীসহ উপজেলায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা প্রদান করেছেন। প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে শিক্ষকদের সম্মাননা ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সাংবাদিকতা পুরস্কার প্রদান, শতাধিক শারীরিক ব্যক্তিকে হুইল চেয়ার প্রদান করেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন ও অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক ভূঁইয়ার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ২০১৫ সালে এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১২৭ জন প্রতিবন্ধী শিশু ও পুনর্বাসন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ জন স্নায়বিক বিকাশজনিত প্রতিবন্ধী (এনডিডি) শিশু রয়েছে। স্কুলে ১৮ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ভ্যানচালক রয়েছেন- তারাও মাহবুবের দীক্ষায় পুরোপুরি স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে যাচ্ছেন। তার ব্যতিক্রমধর্মী কাজের খবর প্রকাশিত হওয়ায় ২০১৭ সালে নিজ উদ্যোগে অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল মাহবুবের কার্যক্রম সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে তার কর্মকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে।


আপনার মন্তব্য