Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১৬ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ জুলাই, ২০১৬ ২১:৪২
সংগীতপ্রেমী
রবীন্দ্রসংগীতে মার্কিন বন্ধু
জয়শ্রী ভাদুড়ী
রবীন্দ্রসংগীতে মার্কিন বন্ধু
মার্কিন নাগরিক জন থর্প

সংগীতের প্রতি টান নেই, এমন ব্যক্তি পৃথিবীতে কমই আছেন। হোক নিজ দেশের কিংবা ভিন্ন দেশের সংগীত। মনের ভিতরে সংগীতের সুর বহমান স্রোতে বয়ে যায়। এ এক অমোঘ আকর্ষণ। তাকে এড়ানো যায় না। মার্কিন নাগরিক জন থর্প হচ্ছেন এমনি এক সংগীতপিপাসু ব্যক্তি, যার হৃদয়ে বাংলা সংগীতের সুর ঢেউ খেলে যায়। যিনি মনের টানে পিয়ানোতে সুর তোলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল-পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান’ গানটি। সেই সুর লহরীতে হাবুডুবু খাচ্ছেন বাংলার এই মার্কিন বন্ধু।

 

ছয় বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে পিয়ানো শেখা। আমেরিকান পরিবারটিতে অল্প বয়স থেকেই ছেলেমেয়েরা পিয়ানোসহ নানান বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শিখত। এখন তার বয়স ৬২ কিন্তু প্রতিদিনই বাজিয়ে চলেছেন পিয়ানো। তবে তাতে সুর পায় রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দেরই সাগর হতে এসেছে আজ বান। দাঁড় ধরে আজ বোস রে সবাই, টান রে সবাই টান’। বলছিলাম মার্কিন নাগরিক জন থর্পের কথা।

 

রাজশাহী নগরীর ভদ্রার পদ্মা আবাসিক এলাকায় তার বসবাস। আর সেখানে সংগীত চর্চার জন্য গড়ে তুলেছেন বরেন্দ্র মিউজিক্যাল আর্ট সেন্টার। নিজের দেশ ছেড়ে গানের টানে স্ত্রী জেন থর্পকে নিয়ে বাসা বেঁধেছেন এ দেশে। যেন বাংলার মাটির সঙ্গে মিশে থাকা সংগীতের ঘ্রাণের খোঁজে এ দেশে পড়ে রয়েছেন। বাংলার সুর, বিভিন্ন স্বাদের সুর সংগীতে সমৃদ্ধ হলেও জন থর্পের আকর্ষণ রবীন্দ্রসংগীতের ওপর। তার প্রথম শেখা বাংলা গানের কথা বলতেই মাথা দুলিয়ে গেয়ে ওঠেন ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে। ’

 

রবীন্দ্রসংগীত তার আরাধ্য বিষয় হলেও আগ্রহের কমতি নেই নজরুল, লালন গীতিতেও। শুধু তাই নয়, ভিন্ন ভাষার হওয়ায় রবীন্দ্রসংগীত বুঝতে মূলভাব, ছন্দ, তাল, লয় ও অন্তমিল জুড়ে করেছেন ইংরেজি অনুবাদ। বের করেছেন বই, যেখানে বাংলার পাশাপাশি রয়েছে ইংরেজি অনুবাদ। স্বরলিপিসহ স্থান পেয়েছে ১০২টি রবীন্দ্রসংগীত। বইয়ের নাম আনন্দেরই সাগর থেকে... বা ফ্রম আ জুবিলান্ট সি...। বইয়ের নামকরণের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে জন জানান, এটা তার প্রথম ইংরেজিতে অনুবাদ করা রবীন্দ্রসংগীত। লক্ষ্য বিশ্বের কাছে রবীন্দ্রসংগীতকে ছড়িয়ে দেওয়া। জনের ভাষ্য হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতের ইংরেজি স্বরলিপি না থাকায় সবাই চর্চা করতে পারছে না। তাই বিশ্বকবিকে বিশ্বের কবি করে তুলতে তার এই প্রচেষ্টা।

 

আর এর পাশাপাশি নিজের দেশের গভীরে লুকিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে বাংলার মাটিতে পরিচিত ঘটানো। কারণ ওয়েস্টার্ন কালচারের প্রসঙ্গ আসলে ভেসে আসে রক ঘরানার গানের উন্মাদনা। কিন্তু তার বক্তব্য হচ্ছে, ওয়েস্টার্ন কালচারের মধ্যেও ক্লাসিক্যাল সংগীত রয়েছে। কিন্তু বাইরের দেশে তা তেমন পরিচিতি পায়নি। যেটা রক শিল্পীরা পেয়েছেন।  

 

দুই দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮০ সালের শেষ দিকে এ দেশে এসেছিলেন জন থর্প। কিন্তু এখানে এসে বাংলার প্রেমে পড়ে যান। বাংলাদেশের সঙ্গে পরিচিতির বিষয়ে জানতে চাইলে জন বলেন, ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছিল সেই দুঃসময়ে পরিচয় ঘটে বাংলাদেশের সঙ্গে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্যে আমাদের বসবাস। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা ভরে, টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠত হৃদয়বিদারক দৃশ্য। তখন থেকেই অন্য রকম একটা আকর্ষণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল এ দেশের জন্য, এখানকার মানুষের জন্য।

 

আর ১৯৮০ সালের দিকে এ দেশে চলে আসা অনেকটাই ছিল দৈবাত। বাংলাদেশে এসে তাদের প্রথম আবাস গড়ে ওঠে লালনের আখড়া-খ্যাত কুষ্টিয়ায়। মূলত বিশুদ্ধ বাংলাভাষা শেখার টানেই কুষ্টিয়ায় যাওয়া। এরপর সেখানে বাংলা শিক্ষা কোর্সে ভর্তি হয়ে স্বামী-স্ত্রীতে চলতে থাকে বাংলা শেখার কসরত। আর ওই কোর্স করার সময়ই পরিচয় হয় রবীন্দ্রনাথের অবিনশ্বর সৃষ্টি গান, গল্প আর কবিতার সঙ্গে। কুষ্টিয়ায় থাকার সুবাদে তিনি বেড়িয়ে এসেছেন শিলাইদহ কুঠিবাড়ীতে। তবে মনের সুপ্ত বাসনা রবীন্দ্রনাথের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান শান্তি নিকেতন, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এবং শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ী দেখা। এরপর ১৯৯৫ সালের দিকে জীবনের প্রয়োজনে নিজ দেশে পাড়ি জমান এই দম্পতি। কিন্তু আবার তারা ২০১১ সালে এ দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন সংস্কৃতি আর সংগীতের টানে। ছেলেমেয়ে আত্মীয় পরিজন ফেলে রাজশাহীতে গড়ে তোলেন তাদের আবাস।

 

মেঘমুক্ত নীল আকাশ। নীলের বাটি যেন উপুড় হয়ে পড়ে আছে হেমন্তের আকাশে। বাতাসের হিমেল আমেজে একদিন বিকেল বেলায় রাজশাহীর ভদ্রায় জন থর্পের খোঁজে বের হলাম। তবে তার সন্ধান পেতে খুব বেগ পেতে হলো না। অনেক উঁচু উঁচু আবাসিক ভবনের মাঝে একটি ভবনের গায়ে টাঙানো রয়েছে বরেন্দ্র মিউজিক্যাল আর্ট সেন্টার। ভবনের প্রধান ফটক পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই কানে ভেসে এলো ভাওলিনের মনকাড়া সুর। সেই সুর টেনে নিয়ে গেল ৬২ বছরের সফেদ শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডলের সাদামাঠা এক বিদেশির কাছে। তার কাছে যাওয়ার পর মনে হলো তিনি বিদেশি নাকি বাঙালি?

পরিচয় জানার আগেই স্পষ্ট এবং সাবলীল বাংলায় জন থর্পের কণ্ঠ থেকে বের হয়ে এলো ‘কেমন আছেন?’ তার সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পর যখন তাকে জানালাম, আপনি অসাধারণ মনকাড়া সুরে ভাওলিন বাজান, তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন, ‘আমি ভালো পারি না। কারণ আমি এখনো ছাত্র। কেবল শিখছি। আমি গিটার ও পিয়ানো বাজাই। কথা শেষ না হতেই তিনি গেয়ে ওঠেন, ‘কান্নাহাসির-দোল-দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা, তারি মধ্যে চিরজীবন বইব গানের ডালা’।

 

তিন কক্ষের বাসার চারদিকে ছড়ানো সংগীতের বিভিন্ন যন্ত্র ও উপকরণ। তার মধ্যে রয়েছে গিটার, কিবোর্ড, তবলা, হারমোনিয়াম এবং এক পাশে জনের প্রিয় পিয়ানো। যন্ত্র এবং কণ্ঠ সংগীতের ওপর ক্লাস নেন তিনি। দুই ব্যাচে বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীরা শিখছেন গিটার। জন একজন সংগীতজ্ঞ মানুষ। সংগীতের ওপর ডিগ্রি নিয়েছেন আমেরিকার মেইন ইউনিভার্সিটি থেকে। সংগীতের প্রেমে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে ভদ্রা এলাকায় গড়ে তুলেছেন বরেন্দ্র মিউজিক্যাল আর্ট সেন্টার। এই সেন্টারে তিনি নিজে শেখেন ও অন্যদের শেখান।

 

জন থর্পের স্ত্রী জেন থর্পও পড়ে গেছেন এ দেশের মানুষের ভালোবাসার টানে। প্রতিদিন সকালে হাঁটতে গিয়ে রাস্তার পাশে চোখে পড়ত বস্তির ছেলেমেয়েদের শিক্ষাহীন জীবন। তাই তাদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে খুলেছেন স্কুল। প্রথমে খোলা মাঠে পাটি পেতে বসে চলত পাঠদান। সম্প্রতি একটা ঘরের ব্যবস্থা হয়েছে। তাদের ইচ্ছা নিজেদের সামর্থ্য এবং আগ্রহী ব্যক্তিদের সহায়তায় একটা তহবিল গঠন করা যাতে করে স্থায়ী হয় এই প্রতিষ্ঠান দুটো। জেন থর্প গান না জানলেও জানেন ভালো ছবি আঁকতে।

 

রবীন্দ্রসংগীতের ভাবার্থ বুঝতে অনেক সময় অসুবিধা হয় জনের। উদাহরণ টানতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায় রে’ এই ‘ভুলায় রে’ শব্দটাকে আমি প্রথমে শুনে ভেবেছিলাম কোনো কিছু ভুলে যাওয়ার কথা বলছে। কিন্তু পরে আমার বন্ধু শহীদুর রহমান বুঝিয়ে বললেন যে এই ভুলানো মানে মন হরণ করে নেওয়া, ভুলে যাওয়া নয়। আর অনুবাদ করতে গিয়েও একই সমস্যা হয়। তাই বারবার অভিধান খুঁজে একটি শব্দের বেশ কিছু প্রতিশব্দ খুঁজে মূলভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করি। আর বিপত্তি বাধে সুর দিতে গিয়ে। তাই সব মিলিয়ে একটি রবীন্দ্রসংগীত অনুবাদ করতে প্রায় পাঁচ-ছয় মাস লেগে যায়।

 

সবশেষে তাকে বর্তমানের সংগীতের অবস্থা সম্পর্কে জন আক্ষেপ করে বলে ওঠেন, ‘এখন মানুষের মাঝে ভীষণ প্রতিযোগিতা আর অহংকার বোধ। খুঁজে বেড়ায় কার চেয়ে কে ভালো। কিন্তু অহংকার নিয়ে সংগীত চর্চা করা যায় না, তারা সংগীতকে বুকে ধারণ করে না বা করতে পারে না। তাই গৌরব আর অহংকার মন থেকে সরিয়ে সংগীতকে জায়গা করে দিতে হবে। এ জন্যই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে। সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে। ’

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow