শিরোনাম
প্রকাশ : ২১ মে, ২০২১ ১৭:১৪
প্রিন্ট করুন printer

রাবিতে নিয়োগে অনিয়ম, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাড়তি চাপ

রাবি প্রতিনিধি

রাবিতে নিয়োগে অনিয়ম, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাড়তি চাপ
Google News

বড় বড় নিয়োগ দেয়ায় গত ১০ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বার্ষিক ব্যয় বেড়েছে অন্তত ২৭৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগগুলোর বেশিরভাগই যথাযথ নিয়ম না মেনে হয়েছে। ফলে এসব নিয়োগে উপযুক্ত ও দক্ষ কর্মী না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঙ্খিত উপযোগিতা না পাবার পাশাপাশি এসব জাতীয় কোষাগারের ওপর চাপ পড়ছে। 

বিগত এই ১০ বছরে সবচেয়ে বেশি ও অবৈধ নিয়োগ দিয়ে সমালোচিত হয়েছেন দুই মেয়াদে উপাচার্য থাকা এম আব্দুস সোবহান। 

দাফতরিক নথি ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র থেকে জানায়, ২০১১-১২ অর্থবছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেট ১৫৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে চলতি অর্থবছরে হয়েছে ৪৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। চলতি অর্থ বাজেটের মধ্যে ২৮ কোটি টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফি, সান্ধ্যকালীন কোর্স, কৃষি প্রকল্প, সম্পত্তি ভাড়া, পরিবহন ফি এবং চিকিৎসা সেবা থেকে উত্তোলিত হয়েছে। বাকি ৪০৪ কোটি ৯৭ টাকা জাতীয় কোষাগার থেকে সরবরাহকৃত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, ১৯৭৩’র সালের আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টি স্বায়ত্তশাসিত হলেও শিক্ষা এবং প্রশাসনিক ব্যয়ভার বহনের জন্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার অর্থাৎ জনগণের টাকার প্রয়োজন পড়ে। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ যেসব ক্ষেত্রে জনগণের অর্থ জড়িত সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ইউজিসি’র পূর্ব অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি ১৯৭৩’র আইনে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাবি প্রশাসন ২০০১ সাল থেকে শুধুমাত্র নিজেদের ইচ্ছায় নিয়োগ দিয়ে আসছে। 

গত ১০ বছরে কমপক্ষে ৩৬৪ জন শিক্ষক ও ৫৯৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৩ হাজার ৩৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক কর্মীশক্তির বেতন-ভাতার পরিমাণ ২৭৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা যা রাষ্ট্র-সরবরাহকৃত অর্থের ৬৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

এই নিয়োগের বেশির ভাগই দুই মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্বপালনকারী এম আবদুস সোবহানের আমলে হয়েছে। এসব নিয়োগে ইউজিসির কোনো অনুমোদনই নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে। 

গত ৬ মে আব্দুস সোবহান উপাচার্য হিসেবে তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ কর্মদিবসে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে জারিকৃত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অ্যাডহকে নয় জন শিক্ষকসহ অতিরিক্ত মোট ১৩৭ কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে মাত্র ৯ জনের সিভি ছিল। সেদিনই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। দু’দিন পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই নিয়োগে যোগ দেয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করে। রাবির একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দফতরে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। 

এম আব্দুস সোবহান এই নিয়োগের উদ্দেশ্য ছাত্রলীগকে চাকরি দেয়ার কথা বললেও বাস্তবে ৪৩ জনের বেশি ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর নাম খুঁজে পাওয়া না। তবে নিয়োগের সবরকম নিয়মকে উপেক্ষা করে বিদায় বেলায় তিনি তার ব্যক্তিগত মালি, ফার্নিচার নির্মাণ শ্রমিক, মাংস সরবরাহকারী, নাপিতের স্বজনদেরসহ ১৩৭ জনের বিশাল এই নিয়োগ দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগের পেছনে রয়েছে বড় অংকের অর্থের বিনিময়।

অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, বিএনপি-জামায়াত আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই অবৈধ নিয়োগ চলমান, কেউ এটা থামাতে পারেনি। এসব নিয়োগের বেশির ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং এগুলো কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের কাজের মান ও যোগ্যতা নির্ধারিত মানের চেয়ে অনেক কম থাকে। অনেক বিভাগে দেখা যায়, নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক কাজ না করে অলস সময় কাটান বা একটি কোর্স অন্যান্য একাধিক শিক্ষকদের সঙ্গে ভাগ করে পড়ান।

আইন বিভাগের অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ বলেন, অননুমোদিত পদে এসব অ্যাডহক নিয়োগ বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। আর এই চাপ কমাতে কর্তৃপক্ষকে অনেক সময় অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ খরচ করতে হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যহত হয়।

এসব ব্যাপারে কথা বলতে আব্দুস সোবহানের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে এর আগে নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘কোনো নিয়মের লঙ্ঘন করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে আমাকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সে ক্ষমতা ব্যবহার করে যা কিছু করা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে, আমি তাই করেছি।

বিডি-প্রতিদিন/বাজিত হোসেন

এই বিভাগের আরও খবর