৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ১০:১৫

আনিসুল হকের স্বপ্নের ঢাকা অধরা

গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন পরিচ্ছন্ন নিরাপদ স্মার্ট সিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক

আনিসুল হকের স্বপ্নের ঢাকা অধরা

ফাইল ছবি

‘আমরা এমনভাবে ফুটপাথ তৈরি করেছি যাতে একজন অন্ধ বা প্রতিবন্ধী মানুষ নির্বিঘ্নে চলতে পারেন। সারা বিশ্ব থেকে লোকজন আমাদের রাস্তা-ফুটপাথ দেখতে আসবেন। শহর অনেক নিরাপদ হয়ে যাবে। ঢাকা শহর বদলে যেতে শুরু করেছে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, কে কোন কাজ করছেন তার সব আমি জানি।’ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে ২০১৭ সালের ২২ এপ্রিল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকাকে নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র আনিসুল হক। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই মৃত্যুর হাতে জীবন সপে দিয়েছেন স্বপ্নবাজ মেয়র আনিসুল হক। পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, স্মার্ট ঢাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন ঢাকা উত্তর সিটির প্রথম মেয়র আনিসুল হক। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালুর পরিকল্পনা, কারওয়ান বাজার কাঁচা বাজার সরানো, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অকালে চলে গেলেন তিনি। অধরাই থেকে গেছে স্বপ্নবাজ মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্নের ঢাকা। গত ৩০ নভেম্বর আনিসুল হকের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘আনিসুল হকের অসম্পূর্ণ কাজ আমরা সম্পন্ন করছি। তিনি নিরাপদ, স্মার্ট ঢাকা গড়তে চেয়েছিলেন। আমরা সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি।’ ঢাকাকে স্মার্ট নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেছেন, আনিসুল হক ঢাকাকে বদলে দিতে অসংখ্য প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন, যেগুলোর বেশ কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাকে খুব কাছে থেকে জানার সুযোগ হয়েছিল। মেয়রের কাজের বাইরে গিয়ে তিনি যানজট নিরসনে মহাখালী-গাজীপুর পর্যন্ত ইউটার্নের প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে ৪ হাজার বাস নামানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন। শাহাবুদ্দিন পার্ক, বনানী পার্ক ও মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোড মাঠে পার্কের নকশা আমাকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছিলেন। ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, আনিসুল হক হাতিরঝিলের মতো আরও তিনটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। উত্তরার দিকে জলনিসর্গ নামে প্রকল্প ছিল তাঁর। এ ছাড়া কল্যাণপুরের পেছনে গিয়ে গাবতলীর পাশে এবং রামপুরা কাটাসুর খালকে কেন্দ্র করে প্রকল্পের অনুমোদন প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এতে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি বিনোদন কেন্দ্র পেত নগরীর মানুষ। জলাধার সংরক্ষণে বিশেষ নজর ছিল তাঁর। আনিসুল হক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মোবাইল লাইব্রেরির অনুকরণে মোবাইল স্কুল খোলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর মৃত ছেলে সারাফের নামে তিনি এ প্রকল্পের নামকরণ করেছিলেন। ঢাকার সর্বস্তরের মানুষই ছিল মেয়রের পরিকল্পনার ভিতরে। সবাইকে নিয়ে স্মার্ট ঢাকা গড়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। ঢাকার নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ২৬টি প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন আনিসুল হক। গার্মেন্ট শ্রমিকদের নামমাত্র সুদে ঋণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা হাতে নিয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে তিনি তিনটির অনুমোদন পেয়েছিলেন। এর একটি ছিল তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদী গ্রুপ।

যানজট নিরসনে মহাখালী-গাজীপুর পর্যন্ত ইউটার্নের প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে ৪ হাজার বাস নামানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন। শাহাবুদ্দিন পার্ক, বনানী পার্ক ও মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোড মাঠে পার্কের নকশা করেছিলেন
এ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে স্থায়ী বাসস্থান পেত অবহেলিত মানুষগুলো। স্মার্ট নগরীর পরিকল্পনার বিষয়ে ইকবাল হাবিব বলেন, নাগরিক সুবিধা সহজ করতে স্মার্টকার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন মেয়র আনিসুল হক। ডিজিটাল কার্ডে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করে খুব দ্রুত সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তিনি। একটি নিরাপদ, আধুনিক ও নারীবান্ধব মহানগর গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে ২০১৫ সালের ৬ মে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব নেন আনিসুল হক। সিটি মেয়রের দায়িত্ব নিয়েই রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করেন তিনি। রাজধানীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নগরবাসীর হৃদয়ে ঠাঁই নিয়েছিলেন আনিসুল হক। ওয়ান-ইলেভেনের সময় সেনা সমর্থিত সরকার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তার মোড় থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড, গাবতলীতে ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করতে না পারলেও মেয়র হিসেবে তা উচ্ছেদ করে দেখিয়েছেন তিনি। শুধু উচ্ছেদই নয়, এগুলো সরিয়ে রাস্তা সংস্কার করে দিয়েছেন নগরবাসীর সুবিধার্থে। কূটনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গুলশান-বারিধারার নিরাপত্তা জোরদার, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোর দখলে থাকা ফুটপাথ জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা, গুলশান-বনানী এলাকা থেকে পুরনো বাস সরিয়ে ‘ঢাকা চাকা’ নামের নতুন এসি বাস সার্ভিস চালু, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকায় প্রচুর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, ‘সবুজ ঢাকা’ নামের বিশেষ সবুজায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে নাগরিক মহলে বিশেষ প্রশংসিত হন তিনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে ফিরিয়ে এনেছেন জনগণের সম্পত্তি। নগরীকে নিরাপদ করতে তাঁর উত্তর সিটি এলাকায় প্রায় ৫ হাজার ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগিয়েছেন তিনি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সমস্যায় দিনে-রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নাগরিকবাসীর আস্থাভাজন হয়েছেন মেয়র আনিসুল হক। যে কোনো নতুন ভাবনা মাথায় এলে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে তার উপযোগিতা যাচাই করতেন তিনি। সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ইউটার্ন প্রকল্প নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন আনিসুল হক। প্রকল্প সম্পন্ন হয়ে ইতিমধ্যে চালু হয়ে গেছে। এর সুফল পেতে শুরু করেছে মানুষ। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজধানীতে ছয়টি কোম্পানির আওতায় বাস নামানোর পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তিনি। বাস মালিকদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে প্রায় গুছিয়ে এনেছিলেন সবকিছু। তাঁর মৃত্যুর চার বছর পার হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি কোম্পানিভিত্তিক বাস প্রকল্প। সড়কে ঝরছে প্রাণ, রাস্তায় আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।

কারওয়ান বাজার কাঁচাবাজার সরিয়ে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রকে যানজটমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তিনি। কাঁচাবাজার সরিয়ে গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী নবনির্মিত মার্কেটে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কোটি টাকা ব্যয়ে মার্কেট নির্মাণ হলেও কাঁচাবাজার সরানোর কোনো কার্যক্রম নেই। আনিসুল হকের স্বপ্নের ঢাকা নির্মাণ এখনো প্রায় স্বপ্ন পর্যায়েই আছে।

বিডি প্রতিদিন/হিমেল

সর্বশেষ খবর