Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ১০:১১

রাজধানীতে পুকুরচুরি

জয়শ্রী ভাদুড়ী

রাজধানীতে পুকুরচুরি
রাজধানীতে গত তিন দশকে দেড় হাজারের বেশি পুকুর ও জলাশয় দখলে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তার মধ্যেই সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণে স্বচ্ছ জলের টলটলে পুকুর দেখা যায় নগরীর কোনো কোনো স্থানে। পুরান ঢাকার নবাববাড়ি ও বংশাল পুকুরের সাম্প্রতিক এই মনোরম দৃশ্য - জয়ীতা রায়

দখল-দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকার পুকুর ও জলাধার। ১৯৮৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত গত ৩৩ বছরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ঢাকার এক হাজার ৯০০ সরকারি-বেসরকারি পুকুর ও জলাধার। শুধু পুকুর নয়- খাল, বিল, জলাধার হারিয়ে যাওয়ায় রাজধানীতে প্রকট হচ্ছে জলাবদ্ধতার সমস্যা।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) এক সমীক্ষা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, গত সাড়ে তিন দশকে হারিয়ে গেছে ঢাকার ১০ হাজার হেক্টরের বেশি জলাভূমি, খাল ও নিম্নাঞ্চল। জলাশয় ভরাটের এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ ঢাকায় জলাশয় ও নিম্নভূমির পরিমাণ মোট আয়তনের ১০ শতাংশের নিচে নেমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় জলাভূমির পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৯৫২ হেক্টর এবং নিম্নভূমি ১৩ হাজার ৫২৮ হেক্টর। একই সময়ে খাল ও নদী ছিল দুই হাজার ৯০০ হেক্টর। রাজধানীর বৃষ্টির পানি এসব খাল দিয়েই পড়েছে নদীতে। ২০১৪ সালে ঢাকা ও আশপাশে জলাভূমি কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৩৫ হেক্টর, নিম্নভূমি ছয় হাজার ১৯৮ হেক্টর এবং নদী-খাল এক হাজার দুই হেক্টর। অর্থাৎ ৩৫ বছরে জলাশয় কমেছে ৩৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ সময়ের ব্যবধানে নিম্নভূমি কমেছে ৫৪.১৮ এবং নদী-খাল ৬৫.৪৫ শতাংশ।

মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান মতে, ১৯৮৫ সালের দিকে ঢাকায় মোট পুকুর ছিল দুই হাজার। বেসরকারি হিসাব মতে, এ বছর পর্যন্ত তা এসে ঠেকেছে ১শ’তে। যদিও ঢাকায় পুকুরের প্রকৃত সংখ্যার হিসাব নেই দুই সিটি করপোরেশনের কাছে। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরে বড় বড় ভবন গড়ে উঠছে। কিন্তু এগুলো নির্মাণের পেছনে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা নেই। ফলে পুকুর-খাল-বিল-জলাধার একের পর এক বিলীন হচ্ছে। জলাধার রক্ষায় আইন থাকলেও সেগুলো না মানায় একের পর এক ভরাট হয়ে সেখানে গড়ে উঠছে আবাসন। সরকার জলাধার রক্ষায় ২০০০ সালে আলাদা আইন করলেও এর কোনো সুফল নেই। অথচ এ আইনে কোনো অবস্থায় খাল বিল নদী নালা পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের স্বাভাবিক গতি ও প্রকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না। এমনকি সড়ক-মহাসড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণকালেও প্রাকৃতিক জলাশয়, জলাধার, খাল-নদী ইত্যাদির স্বাভাবিকতা নষ্ট করা যাবে না। আইনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে ও একান্ত প্রয়োজন হলে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু জলাধার আইনের তোয়াক্কা না করে জলাশয়গুলো দ্রুত দখল ও ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। নির্বিচারে জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শুধু জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে না, কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
ফার্মগেট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ফয়েজ উদ্দিন বলেন, আমাদের শৈশবের প্রতিদিনের আনন্দে থাকত সবাই মিলে পুকুরে সাঁতার দেওয়া। অথচ এখন পুকুরের অভাবে শিশুদের সুইমিংপুলে নিয়ে যেতে হয়। পুকুর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে সুউচ্চ দালান-কোঠা। এই অবৈধ দখল বন্ধ করতে না পারলে ঢাকার ঐতিহ্য পুকুর ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে। পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, খিলগাঁওয়ের পুকুর ভরাট করায় সেটি হয়েছে এখন খেলার মাঠ। এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পুকুর, জহুরুল হক হলের পুকুরটি টিকে আছে। এ ছাড়া রমনা পার্কের বিশাল দিঘি পার্কের সৌন্দর্য ধরে রেখেছে আজও। টিকে আছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরটি। কদমতলা-রাজারবাগের গঙ্গাসাগর দিঘিটি এখনো আছে। সবুজবাগের বৌদ্ধবিহারের পুকুরও উন্মুক্ত রয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলী-ইসলামপুরের নবাববাড়ির পুকুর আগের মতোই আছে। পুরান ঢাকার বংশাল পুকুরে রয়েছে সিঁড়িসহ দুটি ঘাট। আছে নওয়াব আবদুল বারীর পুকুর। আহসান মঞ্জিল পরিবারের নওয়াব আবদুল বারীর খননকৃত বিশাল পুকুর। ১৮৩৮ সালে এটি খনন করা হয়। এ ব্যাপারে নগর বিশ্লেষক স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের মতো রাজধানী ঢাকার চারপাশে ছিল নদী দিয়ে ঘেরা। শহরের ভিতরে ছিল অসংখ্য খাল, বিল, পুকুর। নিজ চোখে দেখা সেই ঢাকা শহরের প্রাণ খালগুলো এখন দখল-দূষণে মৃতপ্রায়। এই জলাশয় উদ্ধার করতে না পারলে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব হবে না।


আপনার মন্তব্য