শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ২২:৫৬

বিচার হয়নি উদীচী হত্যাযজ্ঞের

নিহতদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর

বিচার হয়নি উদীচী হত্যাযজ্ঞের

যশোরে সংঘটিত উদীচী হত্যাযজ্ঞের দুই দশক পূর্ণ হলো ৬ মার্চ। ১৯৯৯ সালের ওই দিন মধ্যরাতে যশোর টাউন হল মাঠে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বোমা হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১০ জন সাংস্কৃতিক কর্মী। আহত হন শতাধিক মানুষ।

এত বড় একটি হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি আজও। দুর্বল তদন্তের কারণে ২০০৬ সালের ৩০ মে এ মামলা থেকে খালাস পেয়ে যান সব আসামি। ২০১০ সালে উদীচী ও ২০১১ সালে সরকারপক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে তা গৃহীত হয় এবং সেই থেকে মামলাটি পরবর্তী আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।

২০০৬ সালে খালাস পাওয়া ২৩ আসামির মধ্যে পাঁচজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন। ১৭ আসামি উচ্চ আদালতের নির্দেশে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে ২০১১ সালের ২৪ জুলাই থেকে জামিনে আছেন। একজন আসামি মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। উদীচী ট্র্যাজেডিতে পা হারানো সাংস্কৃতিক কর্মী সুকান্ত দাস বলেন, ‘অদ্ভুত ব্যাপার! এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, জড়িত একজনকেও বিচারের আওতায় আনা গেল না। এই মামলাটা এখন কোর্টে আছে কি না তাও আমরা জানি না। এটা নিয়ে প্রশাসনের, সরকারের, কারও মাথাব্যথা আছে বলেও আমরা দেখি না। আদৌ উদীচী হত্যাকাণ্ড এখন আমরা সংশয়ে পড়ে গেছি।’ সুকান্ত বলেন, ‘শুরুর দিকে এই ঘটনার বিচার দাবিতে সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে যে একতা ছিল, এখন তাও দেখছি না। সবাই নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। সারা দেশের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জন্য উদীচী হত্যাকান্ডে র বিচার অপরিহার্য ছিল। কিন্তু সেই বিচার আমরা পাইনি। এটা আমাদের যেমন ব্যর্থতা, দেশের সচেতন মানুষের ব্যর্থতা, এ দেশের প্রশাসন, যারা এ দেশের সরকারে ছিলেন তাদের ব্যর্থতা।’ ক্ষোভের সঙ্গে সুকান্ত বলেন, ‘আমরা সব সময় উদীচী ট্র্যাজেডিসহ পরবর্তী সময়ে সংঘঠিত সব হত্যাকান্ডে র বিচার চেয়েছি। ১৯৯৯ সালের অনেক পরে ২০০৪ সালের ২১        আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটলেও এটির বিচার দ্রুত হয়ে গেছে। তাদের নিজেদের ওপর হামলা হয়েছিল বলেই কি এর বিচার দ্রুত হয়ে গেল? আমরা কি দেশের কেউ নই? আমরা হতাশ। এই হতাশা কাটানোর দায়িত্ব সরকারের।’ উদীচী হত্যাকান্ডে  নিহত তপনের বোন নাজমুন সুলতানা বিউটি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। আবারও ক্ষমতায় এসেছেন। আমার মা এখনো বেঁচে আছেন। মৃত্যুর আগে তিনি ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চান।’

সাংস্কৃতিক কর্মী যশোর শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহমুদ হাসান বুলু বলেন, ‘২০ বছরেও এই হত্যাকান্ডে র বিচার হয়নি। যেভাবে এই মামলাটার তদন্ত হয়েছে, যেভাবে মামলাটা উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে মনে হয় বিচারের নামে প্রহসন হয়েছে। এসব ঘটনায় আমরা আহত, মর্মাহত এবং বিক্ষুব্ধ।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাবেক সভাপতি হারুণ-অর-রশিদ বলেন, ‘আমরা যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মীরা ক্ষুব্ধ এবং শঙ্কিত। ২০ বছর আগে সন্ত্রাসবাদীরা উদীচী ট্র্যাজেডি দিয়ে সারা দেশে হত্যাকা  শুরু করে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধ করা তাদের মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল, এটা সবাই জানে। আমরা জানি, পুলিশ যদি ইচ্ছা করে, তাহলে যে কোনো ঘটনার রহস্য উদ্্ঘাটন করতে পারে। কিন্তু এখনো তারা তা করছে না। এর মানে হলো সরকারের সদিচ্ছা নেই। এখন আমরা লক্ষ্য করছি, পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান সরকারের পক্ষ থেকেই সন্ধ্যার মধ্যে সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে। তার মানে সরকারও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধকে সহায়তা করছে। আমরা মনে করি, উদীচী হত্যাকান্ডে র বিচারের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম মুক্তি পাবে, দেশের মানুষ আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে।’

যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) রফিকুল ইসলাম পিটু বলেন, ‘যশোরের মানুষ হিসেবে আমরা চাই উদীচী হত্যাকান্ডে র বিচার হোক। বিষয়টি যেহেতু উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে, আমি ব্যক্তিগতভাবে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করব।’

 


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর