মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ টা

পরিচয়হীন লাশের ঠিকানা বাতিঘর

মোশাররফ হোসেন বেলাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

পরিচয়হীন লাশের ঠিকানা বাতিঘর

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার প্রধান সড়ক টিএ রোডের ঘোড়াট্টি ব্রিজের ওপর পড়েছিল মো. সোহেল মিয়া (৩০) নামে এক ভিক্ষুকের লাশ। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার সানু মিয়ার ছেলে সোহেল মিয়ার পরিবারের খোঁজ মিললেও  লাশ দাফনে কেউ এগিয়ে আসছিলেন না। ওই ব্যক্তির শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসে ‘বাতিঘর’।  ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে পরিচয়হীন লাশ এলেই ডাক পড়ে বাতিঘরের। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা বাতিঘর এখন পর্যন্ত ৩০ জনের মতো ‘পরিচয়হীন’ ও ‘স্বজনহীন’ লাশের দাফন সম্পন্ন করেছে। এ ছাড়া করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া একাধিক ব্যক্তির লাশ দাফনেও সহায়তা করেছেন বাতিগরের সদস্যরা। করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃতের লাশ দাফনে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। কোথাও কোথাও স্বজনরা দাফন না করে সটকে পড়েছে। সে সময়টাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এগিয়ে আসে কিছু তরুণ। করোনায় মৃতদের দাফনে সহায়তা করতেন তারা। আলোচনা করে দাঁড় করান সংগঠন, নাম ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর।’ সেই বাতিঘর এখন পরিচয়হীন ও স্বজনহীন লাশের শেষ ঠিকানা। বাতিঘরের সঙ্গে জড়িতরা জানান, গত বছরের মাঝামাঝি করোনায় আক্রান্তদের লাশ দাফনে সহায়তায় কিছু যুবকের এগিয়ে আসা। এ বছরের ১ জানুয়ারি ‘বাতিঘর’ নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজে নামেন তারা। লিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালসের এরিয়া ম্যানেজার মো. আজহার উদ্দিন সংগঠনটির কর্ণধার। সাংবাদিক ও চিকিৎসকরা রয়েছেন সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে। পরিচয়হীন লাশ পাওয়া গেলে এর দাফন সম্পন্ন করাই সংগঠনটির প্রধান উদ্দেশ্য। এ ছাড়া কেউ স্বজনহীন কিংবা অসহায় হলেও দাফন কাজে সহায়তা করেন তারা। পৌর এলাকার মেড্ডায় তিতাস নদীর পাড়ে লাশ দাফন করা হয়। সর্বশেষ গত ১৩ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে উদ্ধার হওয়া দুজনের লাশ দাফন করেন ‘বাতিঘর’-এর সদস্যরা। সংগঠনের সঙ্গে জড়িতরা জানান, মূলত ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাওয়াদের লাশগুলোই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিচয়বিহীন হয়। এ ছাড়া মাঝে মাঝে নবজাতকের লাশও পাওয়া যায়। হাসপাতাল সূত্র, পুলিশ কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে খবর পেয়ে তারা লাশ দাফনের কাজে এগিয়ে আসেন। হাসপাতাল মর্গে থাকা লোকজন এক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে থাকেন। পরিচয়বিহীন লাশ এলেই তারা বাতিঘরকে আহ্বান জানান দাফন কাজ করে দেওয়ার জন্য। ধর্মীয় বিধি মেনে জানাজা পড়িয়ে তাদের লাশ দাফন করা হয় বাতিঘরের মাধ্যমে। বাতিঘরের সক্রিয় সদস্য মো. তানভীর আহমেদ বলেন, আমি কবর খোঁড়ার দায়িত্বে আছি। এমন কাজে থাকতে পেরে আমার মনের মধ্যে যে কি অনুভূতি সেটা বলে বুঝানো যাবে না। সম্ভব না হলে অন্যদের সহযোগিতা নিয়ে কাজটা করিয়ে দেই।’ বাতিঘরের কর্ণধার আজহার উদ্দিন বলেন, মূলত করোনায় মৃতদের দাফনের জন্য বাতিঘরের প্রতিষ্ঠা। ওই সময় করোনায় মৃতদের দাফনে স্বজনদের বেগ পেতে হতো। দাফনের জন্য লোক পাওয়া যেত না।

তখন আমরা এগিয়ে আসি। এখন নিয়মিত বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হচ্ছে। লাশ দাফনে সরকারিভাবেও বরাদ্দ থাকে। কিন্তু আমরা সেদিকে তাকিয়ে থাকি না। নিজেদের টাকায় সব কিনে ফেলি। আমার আয়ের টাকা এখানে ব্যয় করা হয়। কবর খোঁড়ার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে ফেলা হয়েছে। কেউ কবর খুঁড়বে, কেউ কাপড় কিনবে, কেউবা লাশ নেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে, কেউ দাফনে সহায়তা করবে। জানাজা পড়ানোর জন্যও একজনকে রাখা হয়েছে। আগে দিন-রাতের যেকোনো সময় লাশ দাফনের কাজ করা হতো। তবে বিভিন্ন কারণে এখন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ে লাশ দাফন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেলা সদর হাসপাতাল মর্গের ইনচার্জ মো. সুমন ভূঁইয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে পরিচয়হীন লাশের দাফন কাজ করা হতো। কিন্তু একটি সমস্যার কারণে সংগঠনটি এখন আর কাজ করছে না। এ অবস্থায় বাতিঘরের মাধ্যমে লাশ দাফনের কাজ হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের চিকিৎসক মো. ফায়েজুর রহমান বলেন, হাসপাতালে আসা পরিচয়হীন লাশ দাফনে প্রায় সময়ই নানা সমস্যা দেখা দিত। এখন আর সে অবস্থা নেই। পরিচয়হীন লাশের খবর পেলেই ছুটে আসেন বাতিঘরের সদস্যরা। বাতিঘরের উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। আমার পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।

সর্বশেষ খবর