Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:১৬

জ্ঞানার্জনের উত্তম মাধ্যম বই

আফতাব চৌধুরী

জ্ঞানার্জনের উত্তম মাধ্যম বই

একটা সময় ছিল মানুষ জম্মদিনে, বিবাহবার্ষিকীতে, বিবাহে উপহার দিতেন বই। সে সময় বলতে গেলে বই উপহার দিলে প্রাপক খুশি হতেন বেশি। আজকাল বই উপহার দেওয়ার রেওয়াজ বলতে গেলে উঠে গেছে। এমন মানুষও আছেন যাদের বই উপহার দিলে ভ্রু কুঁচকে যায়। মনোভাবটা এমন যেন বাজারে উপহার দেওয়ার মতো এত সব দ্রব্য থাকতে বই উপহার কেন?

আজকাল একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, মানুষ নাকি আগের মতো আর বই পড়তে ভালোবাসে না। কিন্তু এ রকম তো হওয়ার কথা ছিল না। বাংলা ভাষার অমূল্য সাহিত্য ভাণ্ডার যে বিশ্বনন্দিত সে কথা তো সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে থাকেন। কিন্তু কেন যে এমন হলো? এরকম তো হওয়ার কথা নয়। এ কথা ভাবতেই অবাক লাগে যে, মানুষ কেন বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। বাংলা বইয়ের পাঠক ছিলেন, আজও আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। মানুষের মনে বই পড়ার প্রেরণা জাগাতেই প্রতি বছরই শহরে-নগরে-বন্দরে আয়োজন করা হয় বইমেলার। বইমেলায় বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশনা সংস্থা এবং বিক্রেতা কেন্দ্রগুলো নানা ধরনের বইয়ের ডালি নিয়ে হাজির হন। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ এসে হাজির হন বইমেলার প্রাঙ্গণে। অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয়ও ঘটে বইমেলায়। বিভিন্ন রুচির পাঠক-পাঠিকাও আসেন। কার কী ধরনের বই পছন্দ জানিয়ে যান প্রকাশনা সংস্থা ও বইয়ের স্টলের মালিকদের। বইমেলা উপলক্ষে আয়োজন করা হয় কবিতা পাঠের আসর, বক্তৃতানুষ্ঠান লেখক ও পাঠকের সমাবেশ।

লেখক, প্রকাশক ও পাঠক- এ তিনের উপস্থিতিতে বইমেলা হয়ে ওঠে ত্রিবেণী সঙ্গম। বলা যায় বইমেলা একটি জ্ঞানের হাট, ভাবের হাট, যেখানে অসংখ্য মানুষ মহানন্দে কটি দিন কাটিয়ে যেতে পারেন। তাই বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশনা সংস্থাগুলো প্রতি বছরই নতুন নতুন বই প্রকাশ করে থাকে। আগে বাঙালির নববর্ষে বই বের হতো। আর ঈদ উপলক্ষে প্রকাশিত হতো বিশেষ সংখ্যা। এখনো হয়। তবে এখন বই প্রকাশ হয় বইমেলায়। সবারই টার্গেট থাকে বইমেলাকে কেন্দ্র করে। গোটা বছর যত বই বের হয় তার মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই প্রকাশ হয় বইমেলায়। বইমেলায় ঢুকে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে এত বই? এত বই ছাপা হয়? এত বই মানুষে পড়েন? কারা কিনেন? কারা পড়েন? নিশ্চয়ই পড়েন, না পড়লে কি এত বই ছাপা হয়ে বের হতো। তবে যাদের বই কেনার মতো পয়সা আছে তারা তো বই কিনেনই। পড়ুন আর না পড়ুন অন্ততপক্ষে ড্রইং রুমের বুক সেলফের শোভা বাড়াতে বই কেনেন। আর যাদের বইপড়ার ইচ্ছা আছে কিন্তু কেনার সামর্থ্য নেই তারা কী করবেন।  তারা হয়তো বন্ধু বা বান্ধবীর কাছ থেকে ধার নিয়ে পড়বেন। তবে এমন বইপোকা লোকের সংখ্যা প্রচুর আছে আজকের জমানায়ও। বই ধার নিয়ে আসেন কিন্তু ফেরত দেওয়ার কথা মনেও থাকে না। কথায় আছে ‘বই আর বউ কাউকে ধার দিও না ফেরত পাবে না।’ কথাটা ষোলোআনা সত্য। অনেকেই বই ধার নিয়ে লাইব্রেরি সাজিয়ে ফেলেন। তাদের কালেকশনে ইতিহাস, তর্কশাস্ত্র, নাটক, উপন্যাস থেকে শুরু করে সব ধরনের বই থাকে। কিন্তু যারা বইমেলায় যান সময় কাটাতে কিংবা আধুনিক অন্দর সজ্জার রসদ কিনতে বা বইমেলায় ভিড় বাড়াতে। এরা ভিড়ে প্রেম করেন চাট কিংবা ফুচকা খান আসার সময় নেহাতই কিনতে হয়, তাই হাতে করে একখানা পাতলা বই কিনে আনেন। আবার অনেকেই পড়ার বইয়ের বদলে রান্নার বই, সেলাই বোনার বই, গৃহসজ্জার বই, আল্পনা, কনে সাজানো কিংবা ছবি আঁকার বই খুঁজে খুঁজে কিনে আনেন। এসব বই কোনো কোনো বইয়ের দোকানে পাওয়া যায়। ক্রেতা কিংবা পাঠকের পছন্দসই বই মেলে বইমেলাতেই।

তাই স্বভাবতই একটা কথা মনের কোণে বারবারই উঁকি দেয়, বইমেলায় যে এত ভিড়, এত জনসমাগম তা কিসের জন্য? এটা অবশ্যই ঠিক সবাই হয়তো বইকে ভালোবেসে বইমেলায় আসেন না। তারা আসেন বইমেলায় উৎসবের আমেজ উপভোগ করতে। আবার মনে আসে সেসব মানুষ তো বইমেলাকে উপলক্ষ করেই আসেন। তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বই-ই। আজকে যারা বইমেলায় যাচ্ছেন, ঘুরছেন, গান শুনছেন, বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বই ঘাঁটছেন কিন্তু কিনছেন না, আগামী দিনে তারাই বই কিনবেন। অন্য দশজনের বই কেনা, বইপড়া তাদের প্রভাবিত করবেই। মানুষের মধ্যে বই পড়ার নেশা জাগাতে হলে আমাদের আবার পুরনো দিনের রেওয়াজকে ফিরিয়ে আনতে হবে। জম্মদিনে, বিবাহবার্ষিকীতে, বিয়েতে উপহার দিতে হবে বই। আর শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে অভিভাবকদের মাসে দু-একটি ম্যাগাজিন, কমিক্স কিংবা ছেলেমেয়েদের পছন্দসই রংচংয়ে বই কিনে তাদের হাতে ধরিয়ে দিতে হবে। তাহলেই তাদের মধ্যে বইপড়ার নেশা জেগে উঠবে। পাঠকের কথা মাথায় রেখে প্রকাশনা সংস্থাকেও কতকগুলো দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদের একমাত্র ব্রত হবে বাংলা বইয়ের সোনালি যুগকে ফিরিয়ে আনা। এটা কখনো হতে পারে না যে, মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। শুধু প্রয়োজন যুগোপযোগী লেখার। আর সে লেখার জন্য নবীন-প্রবীণ লেখকদের কলম ধরতে হবে। সাধারণ পাঠক যাতে কম দামে বই কিনতে পারেন  সেদিকটার দিকে নজর রাখতে হবে প্রকাশনা সংস্থাগুলোকেও।


আপনার মন্তব্য