হাড় কাঁপানো শীতের পর প্রকৃতিতে এখন হৃদয় জুড়ানো বসন্তের সাজ। দোলনচাঁপা, কনকচাঁপা, নাগেশ্বর, কৃষ্ণচূড়া, বেলি, চামেলি হাজারো ফুলের সুগন্ধে বাতাস মন্ডম করছে। নানান ফলের বোল ছড়িয়ে বসন্ত বলছে, আমি এসেছি! আমি এসেছি! বসন্তের ডাকপিয়ন কোকিলও কুহুকুহু সুরে বসন্তের আগমনের খবর বনে বনে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই যে প্রকৃতিজুড়ে-শীত-গ্রীষ্ম-বসন্তের বর্ণিল রং ছড়ানো দৃশ্য- এসবের কি কোনো উদ্দেশ্য আছে? নাকি এমনি এমনিই শীত আসে, শীত যায়। বর্ষা আসে, বর্ষা যায়। বসন্ত আসে আবার চলে যায়? কেন এমনটি হয়? আসুন কোরআনের কাছে জিজ্ঞাসা করি।
কোরআন বলছে, ‘মহাশূন্যের কোনো কিছুই আল্লাহ অনর্থক কিংবা খেলার ছলে সৃষ্টি করেননি।’ অর্থাৎ এই যে ঋতুবৈচিত্র্য এরও একটা উদ্দেশ্য আছে। সে উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু কথা সূরা আলে ইমরান ও সূরা ফোরকানে বলে দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা। আল্লাহ বলছেন, ‘যারা বিবেকবান তাদের জন্য সৃষ্টিবৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে আল্লাহকে চেনার, আল্লাহকে জানার নিখুঁত নিদর্শন। বিবেকবানরা শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে সৃষ্টিবৈচিত্র্যের ভাবনায় তম্ময় থাকে। একসময় তাদের মনে হয় মহাবিশ্বের একটি ক্ষুদ্র অণুকণাও আল্লাহ খেলার ছলে সৃষ্টি করেননি। তখন তারা পরম কৃতজ্ঞতায় প্রভুর কুদরতি কদমে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।’
কেন প্রকৃতিতে বসন্ত আসে? বসন্তের বর্ণিল সাজে আল্লাহ বান্দাকে কী জানান দিতে চান? এ প্রশ্নের খুব সহজ উত্তর দিয়েছেন ভাবুক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গীতাঞ্জলিতে তিনি লিখেছেন, ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।/তবে অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে/করোনা বিড়ম্বিত তারে।’ কবি শুরুতেই বলছেন, হে মানুষ! তোমার দুয়ারে আজ বসন্ত এসেছে। হাজারো ব্যস্ততায় ভরা জীবন তোমার। দম ফেলারও ফুরসত নেই। এ অজুহাতে বসন্তকে ফিরিয়ে দিও না। ভুলে থেকো না। তারপর কবি আসল কথাটি বলেছেন, ‘আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো/আজি ভুলিয়ে আপনপর ভুলিয়ো,/এই সংগীত মুখরিত গগনে/তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো।’ হে ভাবুক মন! চোখ মেলে চেয়ে দেখ! পৃথিবীর যত ফুল আছে, যত পাখি আছে, সব এত দিন নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। লুকিয়ে রেখেছিল। ভুলায়ে রেখিছিল। যখনই বসন্তের বাতাস গায়ে মাখল সঙ্গে সঙ্গে ফুল-পাখিরা নিজেকে উজাড় করে মেলে ধরল। তো তুমিও হৃদয়ের সব দুয়ার খুলে দাও। সর্বস্ব দিয়ে পৃথিবীর জন্য নিজেকে মেলে ধর। আজ তুমি নিজেকে বিলিয়ে দাও। আজ তুমি আপনপর ভুলে যাও। শত্রু-মিত্র এ শব্দগুলো মন থেকে মুছে ফেল। ওই যে ফুল ফোটে, পাখি গায়, সে কি শুধু বন্ধুর জন্য ফোটে, শুধু শুভার্থীর জন্য গায়? না, সে সবার জন্য। তুমিও সবার জন্য হয়ে ওঠ। তুমিও প্রভুর জন্য ফুটো। প্রভুর জন্য গাও।
জীবনের জটিল হিসাব কষতে কষতে আমাদের হৃদয়দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়। আমরা ভুলে যাই কোরআনের মূল প্রতিপাদ্য- ‘এ দুনিয়ার জীবন মায়ার ছলনা ছাড়া কিছুই নয়’। তখন আমাদের মনে নানান রোগ বাসা বাঁধে। আমরা কৃপণ হই। আমরা হিংসুক হই। আমরা মৃত্যুভয়ে প্রতি মুহূর্তে মরি। আমরা সাহস হারিয়ে লাঞ্ছনার জীবন বয়ে চলি। যখন বসন্ত আসে তখন আমাদের চোখ খুলে যায়। আমরা দেখি, নিজেকে নিঃশেষ করে কীভাবে ফুল ফোটে। কীভাবে বনের কোকিল বেহুদা কুহু সুরে অন্যকে গান শোনায়। হয়তো গাছটিতে এক শটি আম ধরবে। কিন্তু এক লাখ বোল ফোটায় আবার সে বোল ঝরেও পড়ে। তখনই জ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এ পৃথিবীতে কিছুই স্থায়ী নয়। সাময়িক আরাম-আয়েশের জন্য এই যে লোভ, এই যে দুর্নীতি এসব তো আসলে মোহগ্রস্ত পাগলের কান্ড কারখানা। আল্লাহ যার ভিতর হেদায়াতের নুর ঢেলে দেন, সে বসন্তের রঙের মাঝে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী রংকেই উপলব্ধি করে। তখন সে দুনিয়া ছুড়ে ফেলে, দুনিয়ার রংবাহারি পোশাক খুলে ফেলে, আল্লাহর নুরানি রঙের পোশাক গায়ে জড়িয়ে নেয়। যে পোশাক পরার আহ্বান কোরআনে আল্লাহ এভাবে করেছেন, ‘আল্লাহর নুরানি রঙের নুরানি পোশাক! এ পোশাকের চেয়ে শান্তিময় পোশাক আর কী আছে!
লেখক : মুফাস্সিরে কারআন।