Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ জুন, ২০১৯ ২৩:৩৬

সম্রাজ্ঞী রেখার সঙ্গে শাহেনশাহ অমিতাভের বিশ্বাসঘাতকতা

পীর হাবিবুর রহমান

সম্রাজ্ঞী রেখার সঙ্গে শাহেনশাহ অমিতাভের বিশ্বাসঘাতকতা
বলিউডে সর্বকালীন এক অনবদ্য ‘ডিভা’ রেখা! তরুণ থেকে বৃদ্ধ রেখার রূপে আজো সবাই মুগ্ধ। যত রহস্য যত বিতর্ক কোনো কিছুরই কমতি নেই। কিন্তু কোনো কিছুকেই পাত্তা দেন না ‘ওমরাওজান’। এখনো তাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় কৌতূহল। আজো কার নামে সিঁথিতে সিঁদুর পরেন রেখা? এখানেই চলে আসে বলিউড শাহেনশাহ অমিতাভের নাম। ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় অমিতাভ আর রেখার প্রণয়গাথা নিয়েই এ আয়োজন।

 

বলিউড সাম্রাজ্যের শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চন সম্রাজ্ঞী যৌন আবেদনময়ী রেখা এবং তার স্ত্রী জয়া ভাদুড়িকে নিয়ে যশ চোপড়া নির্মাণ করেছিলেন সিলসিলা। ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই মুক্তি পাওয়া ছবিটি তাদের তিনজনের ত্রিভুজ প্রেমের জীবন্ত কাহিনি নিয়ে যেন নির্মিত হয়েছিল। তাই বাণিজ্যিকভাবেও ব্যবসাসফল রেকর্ড করেছিল। আরবি শব্দ সিলসিলা মানে শিকল বা শৃঙ্খল। অমিতাভ বচ্চন ’৭৩ সালে জয়া ভাদুড়িকে বিয়ে করেছিলেন। আর তিন বছর পর ‘দো আনজানে’ নায়িকা রেখার সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে অমিতাভ প্রেমে পড়েছিলেন। সেই প্রেমকাহিনি নিয়ে যে ঝড় উঠেছিল, সেই ঝড় তুমুলভাবে আলোড়িত করেছিল সবাইকে। রেখা-অমিতাভ দুজনই ছিলেন তুলা রাশির জাতক-জাতিকা। একজনের জন্ম ১০ অক্টোবর। আরেকজনের ১১ অক্টোবর।

ঋষি কাপুর ও নিতু সিংহের বিয়েতে সিঁথিতে সিঁদুর পরে রেখা অমিতাভের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে ওঠায় জয়ার চোখ থেকে অশ্রু ঝরেছিল। মোকাদ্দারকা সিকান্দারে রেখার সঙ্গে অমিতাভের রোমান্স দৃশ্য দেখে হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন জয়া। গভীর প্রণয়ে থাকাকালে সিলসিলার শুটিংয়ে অমিতাভ ও রেখার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জয়ার দাম্পত্য জীবনে ঝড় তুলেছিল। সেই ঝড় থামাতে গিয়ে অমিতাভের পায়ে এই মর্মে শিকল পরিয়েছিলেন জয়া-  রেখার সঙ্গে আর কোনো দিন কোনো ছবি করা যাবে না। দাম্পত্য জীবন রক্ষা করতে বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত জয়াকে সামলাতে অমিতাভ সেই নিষেধাজ্ঞা কড়ায়-গন্ডায় মেনেছিলেন। ছবি করা দূরে থাক, গভীর প্রণয় থেকে বেরিয়ে রেখার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে করতে বিন্দুমাত্র সম্পর্কও আর রাখেননি। এতে অমিতাভ শাহেনশাহই থাকলেন, আর সমালোচনায় নিজেকে পুড়িয়ে নিঃসঙ্গ রেখা হিংস্র, হিংসুটে ও নিন্দুকদের কাছে হলেন ডাইনি।

রেখা হয়েছেন নিন্দিত, বিতর্কিত ও সমালোচিত। তার প্রতি পুরুষ শাসিত বলিউডও সদয় আচরণ করেনি। মধুবালার ছায়া অনেকে দেখেছিলেন সূচিত্রা সেনে অনেক পড়ে মাধুরীতে। কিন্তু রেখা তার সময় থেকে এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই হিংসার অনলে তাকে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

অন্যদিকে অমিতাভ বচ্চন পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখের জীবনে বাস করে বিগ-বি হয়ে ভারতের চলচ্চিত্রে ৭৬ বছর বয়সেও সিংহাসনে বহাল থাকলেও নিঃসঙ্গ মানসিক একাকিত্বের যন্ত্রণা চেপে, সব বিতর্ক ও নিন্দার বিষের তীরে নত না হয়ে আগুনে শক্তি নিয়েই অহংকারের সঙ্গে ৬৫ বছর বয়সেও চিরযৌবনা যৌন আবেদনময়ী সেই রেখা যুদ্ধ করেই সম্রাজ্ঞীর আসনে এখনো অটল। যার চোখের চাহনিতে এখনো তরুণ থেকে বৃদ্ধরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তেমনি নারীরা অমিতাভের কণ্ঠস্বর, অভিনয় আর দৈহিক সৌন্দর্যে পাগল হয়েছিলেন। দুজনই ছিলেন সবার স্বপ্নের নায়ক-নায়িকা। আর তারা দুজন তখন চলচ্চিত্র পর্দার ভিতরে-বাইরে গভীর প্রণয়ে লিপ্ত প্রেমিক-প্রেমিকা।

সিলসিলা মুক্তির ৩৪ বছর পর ২০১৫ সালে অমিতাভ বচ্চন ব্লগে সিলসিলা ছবির স্মৃতিমধুর ছবি পোস্ট করেন। সিলসিলার সেই তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া ‘ইয়ে কাহান আ গেয়ে হাম’ গানটির একটি অন্তরঙ্গ দৃশ্যে রেখার সঙ্গে দেখা যাচ্ছে অমিতাভকে। ৩৮ বছর পরে এসে সেই ছবির দর্শকদের মনেও যেখানে নাড়া দেয়, সেখানে অমিতাভ-রেখাকে কেনইবা নাড়া দেবে না? অমিতাভ ও রেখার সেই প্রণয় বা রসায়ন কতটা গভীরে ছিল তা এখনো প্রবল রহস্য আর মিথের মতো মনে হলেও পূর্ণ সত্য কেবল জানেন তিনজন-  অমিতাভ, রেখা আর জয়া। অমিতাভ-রেখার রহস্যের মায়া-অঞ্জনমাখা প্রেমের ইতিহাস এ জনমে তারা হয়তো খোলাসা করবেন না। কিন্তু তাদের ভক্ত, দর্শক ও গণমাধ্যম থেকে জানার অন্তহীন তৃষ্ণা মিটে যাবে এমনটি আশাও করা যাবে না। ’৮৪ সালে একটি ম্যাগাজিনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে রেখা বলেছিলেন, ‘আমি তাকে ভালোবাসি, তিনি আমাকে ভালোবাসেন। এটা চিরন্তন সত্য।’ সেই সাক্ষাৎকারে রেখা আরও বলেছিলেন, ‘কেন আমরা সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধা পড়িনি? তিনি তার সম্মান রক্ষায় পরিবার, ছেলেমেয়ের কথা ভেবে দূরে সরে গেছেন।’ আমি মনে করি, ‘তিনি ভালো করেছেন। মানুষ তাকে নিয়ে কী ভাবল, আমার তাতে মাথাব্যথা নেই। আমি তাকে ভালোবাসি কিনা কিংবা তিনি আমাকে ভালোবাসেন কিনা, তা জেনে মানুষ কী করবে? তিনি তো আর দশজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েননি। পুরনো ধ্যান-ধারণার মানুষ হিসেবে তিনি কাউকে আঘাত দিতে চান না। তিনি তার স্ত্রীকে আঘাত দেবেন কেন।’ রেখা বলেছিলেন, ‘আমরা মানুষ, আমাদের সবকিছু নিয়েই চলতে হবে। আমাদের জীবনে দুঃখের চেয়ে সুখের পাল্লাটাও কম নয়। আর কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে চাই না। আমি যতক্ষণ তার সঙ্গে আছি, আমি আর কিছুর পরোয়া করি না।’ অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে রোমান্স একাধিক বিয়ে ও যৌনতা ঘিরে সহস্র গুজবের টানাহেঁচড়া বহুবার মিডিয়ায় বলিউড কিংবদন্তি রেখাকে ঘিরে ঝড় উঠেছে। সাফল্যের মধ্যগগনে থাকা বলিউড সম্রাজ্ঞী ব্যক্তিজীবনে বার বার রক্তাক্ত হয়েছেন। ভারতীয় সাংবাদিক ইয়াসির ওসমান ‘রেখা আনটোল্ড স্টোরি’ আত্মজীবনী বইটি লিখেছেন ২০১৬ সালে। রেখার প্রতিটি পর্যবেক্ষণ, তার সঙ্গে কাজ করা মানুষের আলাপচারিতা, রেখার সব সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে তৈরি করেছেন। রেখার সঙ্গে তার কখনো দেখাও হয়নি এ পর্যন্ত। স্বামী মুকেশ আগারওয়ালের আত্মহত্যার পর অভিযোগের তীর রেখার দিকেই ছুটছে। শো টাইম পত্রিকায় একটি ফিচারের শিরোনাম ছিল ‘দ্য ব্ল্যাক উইডো’। আর সিনে ব্লিজে শিরোনাম ছিল ‘দ্য ম্যাকাবর ট্রুথ বিহাইন্ড মুকেশ সুইসাইড’। ইয়াসির ওসমানের ভাষায় সত্যিকার অর্থেই ঘটনা ছিল মর্মান্তিক। রেখা আসলেই একজন যোদ্ধা এবং সবশেষে তারই জয় হয়েছে। বলিউড তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করলে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজেকে সত্যিকারের তারকা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু বিনোদন জগতের স্ক্যান্ডাল তার পিছু ছাড়েনি।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের বলিউড শাহেনশাহ বা বিগ-বি খ্যাত অমিতাভ বচ্চন, আরেকদিকে বলিউড অভিনেত্রী জয়া বচ্চনের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের টানাপড়েন ও যৌন আবেদনময়ী সুপারহিট নায়িকা রেখার সঙ্গে রোমান্স ও প্রেমের এক শ্বাসরুদ্ধকর দর্শকনন্দিত ছবির নাম সিলসিলা। বলিউডের ইতিহাসে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সিলসিলাই হচ্ছে সবচেয়ে ব্যবসাসফল বাণিজ্যিক ছবি। বাণিজ্যিক ছবিতে সাফল্য কুড়ালেও যুগের পর যুগ দর্শকহৃদয়ে এ ছবির একেকটি সিক্যুয়েন্স বা দৃশ্য-সংলাপ কিংবা গান দর্শক এখনো ভুলতে পারেনি। সিলসিলা সত্যি যেন অমর যুগল অমিতাভ-রেখার অমর প্রেমের জীবন্ত ছবি। যা দর্শকের মন ভরে তৃপ্তি দিলেও জয়াকে পুড়িয়েছে ঈর্ষার অনলে, সতীনের যন্ত্রণায়।

বলিউড সিনেমার প্রতাপশালী অভিনেতা বা নায়ক অমিতাভ বচ্চন ও সুপারহিট নায়িকা রেখার রোমান্স ও প্রেমের কাব্য হয়ে সেলুলয়েডের ফিতায় যেমন এই ছবি বন্দী করেছে, তেমনি এই ছবি রেখা-অমিতাভের প্রণয়ের আগুনকে আলোচনার ঝড়কে আরও তীব্রগতিতে উসকে দিয়েছে বাইরের দুনিয়ায়। দর্শকও সিলসিলায় অমিতাভ-রেখার রসায়ন দেখে বিমোহিত হয়েছিলেন। অমিতাভ-রেখার সব ছবি ছাড়িয়ে এ ছবিটি এখনো জীবিত দর্শকদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে যেমন মিলিয়ন ডলার প্রশ্নগুলো তুলছে, তেমনি বলিউড জগতে অমিতাভ-রেখার প্রেম-প্রণয় নিয়ে দুজন মুখে কুলুপ এঁটে থাকলেও মানুষের মধ্যে যে অপার রহস্যের সৃষ্টি হয়েছিল তিন যুগেও তার সমাধান হয়নি। যা রটে তার কিছু হলেও বটে, এই সূত্রে ফেলে সেই সময় দুজনের সম্পর্ক ঘিরে যে তুফান উঠেছিল এবং পরবর্তীতে মাটি কামড় খেয়ে সংসার টিকিয়ে রাখা জয়া বচ্চনের সাফল্যে অমিতাভ-রেখার সব যোগাযোগ দীর্ঘ ৩৩ বছর কুশল বিনিময় পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বলাই যায়, পর্দার অন্তরালে দুজন দুজনের গভীর প্রণয়ে মজেছিলেন। কুলি ছবির শুটিং দুর্ঘটনা থেকে জয়া অমিতাভের পাশে যেমন কঠিনভাবে জড়িয়েছেন, তেমনি বিগ-বির মা তেজিও অনঢ় ছিলেন, রেখাকে বিয়ে করা যাবে না! তাই অমিতাভ ও রেখা বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। রেখা ও অমিতাভ ২০১৬ সালের মার্চে মুম্বাইয়ে আয়োজিত স্ক্রিন পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে দীর্ঘ ৩৩ বছর পর কুশল বিনিময় করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে রেখা যেমন গিয়েছিলেন, তেমনি জয়াকে নিয়ে অমিতাভও গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে একপর্যায়ে হঠাৎ করে মঞ্চের সামনে রেখার আসনের কাছে মিষ্টি হেসে নমস্কার জানিয়ে রেখার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন অমিতাভ। সৌজন্য বিনিময় ও করমর্দন করাকালে রেখা ও জয়া ক্যামেরাবন্দী হয়েছিলেন। দুজনই দৃষ্টিনন্দন সিল্ক শাড়ি পরেছিলেন। গায়ে শোভা পাচ্ছিল হীরা ও সোনাখচিত ভারী গয়না। সেই ঘটনা চলচ্চিত্রপাড়াই নয়, গণমাধ্যমই নয়, তাদের ভক্তদের মনেও আলোচনার ঢেউ তুলে দেয়। অমিতাভ-জয়ার পুত্রবধূ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনও রেখার হাত থেকে পুরস্কার নিতে গিয়ে মা সম্বোধন করেছেন বলে যেমন খবর আছে, তেমনি রেখাও তাকে ‘বহু’ বলে স্নেহ করার আলোচনা রয়েছে।

১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দো আনজানে’ ছবিতে প্রথমবারের মতো জুটি বেঁধে অভিনয় করেন অমিতাভ বচ্চন ও রেখা। আলোচনা আছে সেই ছবিতে একসঙ্গে কাজ করতে করতে রেখার প্রেমে পড়ে যান বিবাহিত অমিতাভ। আর সেই ঘনিষ্ঠতা ও রোমান্স বাড়তে থাকে। প্রেমের খবর চারদিকে যখন ছড়িয়ে পড়ে তার তিন বছর আগেই আরেক অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়িকে বিয়ে করেছিলেন অমিতাভ। শরীরের মেদ ঝরিয়ে ‘দো আনজানে’ ছবিতে নতুনভাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন রেখা। ছবিটিতে দুজনের রোমান্টিক চরিত্রই জমে ওঠেনি, পর্দার আড়ালেও গভীর প্রণয় ঘটে যায়। পরের বছর মুক্তি পায় দুজনের অভিনীত ‘আলাপ’ ছবিটি। এ ছবিটির শুটিংয়ের ফাঁকে রেখার এক বন্ধুর বাংলোয় ডেট করতেন তারা। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গঙ্গা কি সুগন্ধ’ ছবির শুটিং চলাকালে ছবির দলের একজন রেখার সঙ্গে ঘষাঘষি করার চেষ্টা করলে সেই সময়ের বলিউডের ‘রাগী যুবক’ খ্যাত নায়ক অভিতাভ তার গায়ে হাত তুলেছিলেন। ১৯৮০ সালে তাদের অভিনীত ‘রাম বল রাম’ ছবিটি মুক্তি পেলে তাদের প্রেম-প্রণয় নিয়ে বাইরে নানা রংমাখা কাহিনি রটতে থাকে। এমন খবরও রটেছিল, সে সময় নাকি মাঝে মধ্যেই শুটিং স্পট থেকে উধাও হয়ে যেতেন তারা।

হিন্দি চলচ্চিত্রে অমিতাভ-রেখার আগে-পরে অনেক নায়ক-নায়িকা এসেছেন। কিন্তু তাদের মতো পর্দা কাঁপিয়ে নিজেদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে এতটা কৌতূহল, এতটা আলোচনার ঝড় আর কোনো নায়ক-নায়িকা বইয়ে দিতে পারেননি। সত্তর দশকের শেষে অমিতাভ বচ্চনের দুই সুপারহিট ছবি ‘রাম বল রাম’ এবং ‘গঙ্গা কি সুগন্ধ’ যার নায়িকাও রেখা। ক্যারিয়ারের শীর্ষে তখন অমিতাভ। তার আগের বছর রিলিজ হয়েছে সুপার ডুপার হিট ছবি ‘ডন’। সে সময়ই মুক্তি পায়, রিভেঞ্জ ড্রামা ‘মিস্টার নটবরলাল’।

১৯৮০ সালের ২১ অক্টোবর শ্রীনগরে কালিয়া ছবির শুটিং চলছিল। ডিনারে অমিতাভের সঙ্গে দেখা করেন যশ চোপড়া। পরে শাহরুখ খানকে এক সাক্ষাৎকারে যশ বলেছিলেন, ‘সবাই চলে যাওয়ার পর আমার ঘরে এলো অমিতাভ। জিজ্ঞাসা করল, ‘আর ইউ শিওর উইথ দ্য কাস্টিং অব দ্য ফিল্ম? আর ইউ হ্যাপি?’ জবাবে বললাম, আমি খুশি নই। অমিতাভ জানতে চাইলেন, আপনার কি মনে হয়, আদর্শ কাস্টিং কি হতে পারে? যশ সোজা অমিতাভকে বলে বসলেন, ছবিতে অমিতাভের জীবনে তৃতীয় মহিলার রোলে তিনি রেখাকেই দেখতে চান। স্ত্রীর রোলে জয়া বচ্চন। পাঁচ মিনিট সময় নিয়েই রাজি হয়ে যান অমিতাভ। কিন্তু নিজে জয়াকে প্রস্তাবটি করার সাহস পাননি। জয়াকে প্রস্তাবটি যেন যশ দেন, সেটিই তার মতামত। ২২ অক্টোবর অমিতাভ-যশ মুম্বাইয়ের ফ্লাইট ধরেন। দুজনই জানতেন কাস্টিংয়ের ব্যাপারটা সহজ হবে না। জয়া কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। এমনকি সিনেমার কাহিনি শোনানোর সুযোগও দিচ্ছিলেন না। বহু কষ্টে কাহিনি শোনানোর পর জয়া ভাবলেশহীন হয়ে বসেছিলেন। ক্লাইমেক্সে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত জয়া রোলটা করার জন্য বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাননি। কিন্তু শোনা যায়, সিলসিলার শেষ দৃশ্যটির জন্যই না কি জয়া অভিনয় করতে রাজি হয়ে যান। সিলসিলার সেই শেষ দৃশ্যটি ছিল, যেখানে অমিতাভকে জয়া বলছেন, ‘আমি জানতাম তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে।’

সিলসিলার মধ্য দিয়ে সুপারস্টাররা গগনচুম্বী খ্যাতি পেলেন। পরিচালকের সুনাম বাড়ল। বিনিয়োগকারীর দুহাত ভরে মুনাফা আসল। কিন্তু কিশোরী বয়সে চলচ্চিত্রে নেমে রেখার জীবনের সংগ্রাম, সেই লড়াই আরও বেড়েই গেল। তার ব্যক্তিগত জীবন ও পুরুষ সঙ্গ ঘিরে তার হৃদয়কে সমালোচনা আর নিন্দার তীরে ক্ষত-বিক্ষত করা হলো। বলিউড একাংশ তখন একমত হয়ে গেল, বিবাহিত পুরুষদের সবচেয়ে বড় হুমকির নাম রেখা। ‘ম্যান-ইটার, সেক্সকিটেন’ রেখাকে একের পর এক নামে সম্বোধন করতে থাকল চলচ্চিত্র জগৎ। সাফল্যের মধ্যগগনে থেকেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রক্তাক্ত হতে থাকলেন। তার ম্যান ইটিং নিয়ে যখন জোর গসিপ বলিউডে, সেই সময় হঠাৎ বলিউডের স্বল্পবাক হিসেবে পরিচিত নার্গিস দত্ত মুখ খুলে বসলেন। সমালোচকদের ঝড় বাড়িয়ে দিলেন এই বলে যে, ‘মাঝে মাঝে মনে হয়, রেখা ভীষণ সহজলভ্য। আবার কেউ কেউ তো ওকে ডাইনি বলেও ডাকে।’ ডিম্পল কাপাডিয়া তো রেখাকে সাফ বলে দিলেন, রাজেশ খান্নার পাশে যেন তাকে না দেখেন।

১৯৯০ সালে তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রে তখন তার স্বামী মুকেশ আগারওয়াল আত্মহত্যা করে বসলে তার ম্যান ইটার খেতাব যেন আরও নিশ্চিত করল। সব দোষের দোষী হয়ে উঠলেন রেখা। সুবাস ঘাই থেকে অনুপম খের একবাক্যে বলে বসলেন, রেখার জন্যই ইন্ডাস্ট্রির মুখ পুড়ছে। আর কোনো বলিউড নায়িকাকে কেউ ঘরের বউ করবে না। ফিনিক্স পাখির মতো আগুনে পোড়া ছাই থেকে বার বার উঠে আসা রেখা কেবল শুনলেন। কিন্তু মুখ খুললেন না। বলেননি, মুকেশ ক্রনিক ডিপ্রেশনের রোগী ছিলেন। ব্যবসায় সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে রেখাকে বিয়ে করেছিলেন। যেটি রেখা বিয়ের আগে জানতেনও না। এমনকি এটাও বলেননি যে, মুকেশ চাননি রেখা আর ছবি করুন। তাই বলে রেখা থেমেও যাননি। ডাইনি খেতাব শুনেও নিজেকে গুটিয়ে নেননি। আগুনের মতো শক্তি নিয়ে অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন।

২০১৬ সালে ইয়াসির ওসমান রেখা-দ্য আনটোল্ড স্টোরি বইটি প্রকাশ করলে দীর্ঘ নীরবতার পর রেখাকে নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়। মাত্র ১৫ বছর বয়সের কিশোরী যখন রেখা, তখন ‘আনজানা সফর’ ছবিতে কাস্ট হলেন। মেহবুব স্টুডিওতে শুটিং চলছে। ছবির পরিচালক আর নায়কের যৌথ চক্রান্তে সেই কিশোরী রেখা প্রথম যৌন হেনস্তার কালো রূপটি দেখলেন। চিত্রনাট্য পড়ার সময়ও যার কোনো উল্লেখ ছিল না। অথচ ক্যামেরায় বন্দী করা হলো নায়ক জোর করে পাঁচ মিনিট ধরে তার ঠোঁটে চুমু খেলেন। দীর্ঘক্ষণ পর কাট শব্দ যখন তার কানে পৌঁছল ফ্লোরে তখন হই হই রব। কেউ দিচ্ছেন শিস। শুধু রেখার দুচোখ তখন জলে ভরা। চলচ্চিত্র সমাজ প্রথম তাকে বাস্তবের নগ্ন দরজায় দাঁড় করাল। সেলুলয়েডের ফিতা তাকে রহস্যময়ী মোহিনীর চোখে দেখে। কিন্তু অহংকার যেখানে আগুনের মতো তার শক্তিশালী অস্ত্র, সেখানে তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। এক প্রেমিক নারীর হৃদয় নিয়ে রেখা চেয়েছিলেন বিনোদ মেহেরার সঙ্গে ঘর বাঁধতে। বিয়ের পর বিনোদের মা জুতা নিয়ে তাড়া করেন রেখাকে। বিনোদ সেখানে তার পাশে না দাঁড়িয়ে অসহায়ত্ব দেখালেন। আর রেখা যেন আরও কঠিন আগুনের মধ্যে প্রবেশ করলেন। এমনিতেই মা পুষ্পাবেলী মারা গেলে রেখা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। মা-ই ছিলেন তার আদর্শ, পরম আশ্রয়। রেখার ড্রেস সেন্স, লাল লিপস্টিকের ওপর টান, সাজসজ্জা সবটাই পেয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকে। ছোট থেকেই মাকে দেখতেন, দিনের যে কোনো সময় তিনি ভীষণ পরিপাটি। পরনে পাট ভাঙা শাড়ি, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক।

১৯৮০ সালে নিতু সিংহ আর ঋষি কাপুরের বিয়ে। নিতুর বন্ধু হিসেবে রেখা দাওয়াত পেলেন। নিতু ও শ্রীদেবী রেখার কাছেই সাজসজ্জার তালিম নিতেন। আর কে স্টুডিওতে রেখা সাদা শাড়ি, লাল টিপ আর মাথায় সিঁদুর পরে প্রবেশ করতেই সবাই চমকে উঠলেন। রেখা তখন বিবাহিত নন। সিনে ব্লিজ ম্যাগাজিন সেই সন্ধ্যার সংবাদ শিরোনাম করল, মাথায় সিঁদুর লাগিয়ে কি প্রমাণ করতে চাইলেন রেখা? তিনি বিবাহিত? নবদম্পতিকে হাসিমুখে উষ্ণ শুভেচ্ছা জানিয়ে রেখা চলে যান স্টুডিওর বাগানে। হঠাৎ কি এমন হলো যে, লজ্জা পেলেন রেখা? পার্টিতে উপস্থিত সবাই বললেন, দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে শুধু একজনকেই দেখছিলেন রেখা, যিনি বলিউড শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চন। তার হাতে ছিল ব্যান্ডেজ বাঁধা। পার্টিতে আসার আগে চোট পেয়েছিলেন হাতে। অনেক সাহস সঞ্চয় করে রেখা তার চিকিৎসক বান্ধবী স্নেহলতা পান্ডেকে নিয়ে যখন অমিতাভের দিকে এগিয়ে গেলেন, মুহূর্তে সবার চোখ ধাওয়া করল রেখাকে। কয়েক মিনিট হালকা কথাবার্তা। এ প্রসঙ্গে স্টার ডাস্ট পত্রিকা লিখেছিল, ‘-কিছুক্ষণ নিজেকে সংযত রাখেন জয়া। তবে কিছু সময় পর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। তার দুই গাল বেয়ে ঝরে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। সবার মাঝেই অনেক অনুুচ্চারিত প্রশ্ন উঠেছিল সেদিন। যদিও অনেক পরে রেখা সব বিতর্ক দূরে সরিয়ে বলেছিলেন, শুটিং সেরে সোজা ওই পার্টিতে যাওয়ায় তাড়াহুড়াতে যেমন মেকাপ তুলতে পারেননি, তেমনি সিঁদুরটাও মোছা হয়নি। কিন্তু বিতর্ক তার পিছু ছাড়েনি।

’৮২ সালে ওমরাওজানের জন্য জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে রেখা তার স্বভাবসুলভ অহংকার নিয়ে ঘোষণা করলেন, ‘আমার শহরে সিঁদুর পরা একটা ফ্যাশন’। তবুও সবার প্রশ্ন কি করে এই সুপারস্টারের প্রেম সামলালেন রেখা?

এদিকে রেখার সঙ্গে বলিউড শাহেনশাহর প্রণয়সহ যত বিতর্কই উঠেছে, কখনো বিচলিত হননি অমিতাভ বচ্চন। বরং ২০১৭ সালে তার অফিস ব্লগে অমিতাভ বচ্চন লিখেছেন, ‘সমালোচনা ও যত্ন দুটি জীবনে সমান্তরালভাবে চলা একই পথের পথিক। সমালোচকরাই জীবনের সবচেয়ে বড় শুভাকাক্সক্ষী।’ অমিতাভ বচ্চন চার দশক ধরে বলিউড শাহেনশাহর ওজন ধরে রেখেছেন। তার অভিনয় নিয়ে কাটাছেঁড়া, ফ্লপ-হিট ছবির সংখ্যা প্রেম-প্রণয় নিয়ে অভিযোগ-সম্পত্তি, পরিবার বহু বিষয়ের গসিপে জড়িয়েছে তার নাম। কিন্তু তিনিও বার বার সব সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেছেন। অমিতাভের ক্লিন ইমেজের বাইরে বিতর্কও কম হয়নি। তার বিরুদ্ধে লোভ আর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ। শত্রুঘ্ন সিনহা এবং কাদের খান তাকে মনোযোগ আকর্ষণকারী বলে ব্যঙ্গ করেছেন। বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছিলেন, বিগ-বির বন্ধু তথা রাজনীতিবিদ অমর সিংহও। বলেছিলেন, অমিতাভ বচ্চন লোভী। অভিনেত্রী তথা সাবেক মিস ইন্ডিয়া ওয়ার্ল্ড শাইলী ভগত ২০১১ সালে একবার অমিতাভের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ তোলেন। পরে অবশ্য অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কথা বলে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি রফা করেন।

অমিতাভ রেখার সঙ্গে তার প্রেমের চিরসবুজ বিতর্কের পাশাপাশি জয়ার সঙ্গে এক বাড়িতে থাকছেন না; এমন গসিপও চলেছে সমানে। কিন্তু কখনো বিচলিত হননি অমিতাভ। দক্ষতার সঙ্গে সব সামলে প্রমাণ করেছেন, এই সমালোচনাই তাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করেছে।

রেখার পিঠ পর্যন্ত ঢেউ খেলানো চুল, সমুদ্রের মতো গভীর চোখ, যে চোখে সব কথা বলে দিতে পারেন তিনি। হাতছানি দেওয়া লাল ঠোঁট। কপালে টিপ আর সিঁথিতে টক টক করছে লাল সিঁদুর, পরনে জমকালো কাঞ্জি ভরম! বলিউডে সর্বকালীন এক অনবদ্য ‘ডিভা’ রেখা! তরুণ থেকে বৃদ্ধ রেখার রূপে আজো সবাই মুগ্ধ। যত রহস্য যত বিতর্ক কোনো কিছুরই কমতি নেই। কিন্তু কোনো কিছুকেই পাত্তা দেন না ‘ওমরাওজান’। এখনো তাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় কৌতূহল। আজো কার নামে সিঁথিতে সিঁদুর পরেন রেখা?

’৯০ সালে বিয়ের এক বছর পরই আত্মহত্যা করেছিলেন স্বামী মুকেশ আগারওয়াল। তবু তিনি কার মঙ্গল কামনায় সিঁদুর পরেন? সাংবাদিকরা যতবার এ প্রশ্ন করেছেন, তিনি ততবার উত্তর দিয়েছেন সিঁদুর পরাটা ফ্যাশনেবল তাই পরেছি। কিন্তু সবার মনের সঙ্গে মনের প্রশ্ন, উত্তরটা কি আসলেই এত সহজ! অমিতাভ-রেখা গোপনে বিয়ে করেছিলেন এমন খবরও বাইরে একসময় চাউর হয়েছিল। সিলসিলার পর রেখা- অমিতাভের আর ছবি না করার রহস্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে যে, জয়া বচ্চনের নিষেধাজ্ঞা মানতে গিয়েই গৃহশান্তি বজায়ে অমিতাভ আর রেখার সঙ্গে যেমন অভিনয়ে যাননি তেমনি রেখাও আর অমিতাভের সঙ্গে অভিনয় করতে পা বাড়াননি। রেখা-অমিতাভ ঝড় নিয়ে যখন তুমুল হৈচৈ তার অনেক পরে এক সাক্ষাৎকারে জয়া বলেছিলেন, ‘তার স্বামীর সঙ্গে কোনো দিন কারও অ্যাফেয়ার ছিল না। যার যা ইচ্ছা বলুক। ও তো আমাকে একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর তা সত্ত্বেও আমার অলক্ষ্যে অন্য কারও সঙ্গে কোনো সম্পর্কে জড়ায়, তবে সেটা ওর সমস্যা, আমার নয়। সেটা নিয়ে ওকেই বাঁচতে হবে, ভুগতে হবে তার ফলও।’ এদিকে রেখাকে নিয়ে বচ্চন বাড়িতে অশান্তির কালো মেঘ। রটে যাচ্ছিল অমিতাভ-জয়ার ঘর ভাঙার খবর। তখন বিগ-বিও পরিষ্কার বলে দেন, ‘তাদের ডিভোর্স হচ্ছে না। তিনি ডিভোর্সে বিশ্বাস করেন না এবং জয়াকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা একদম সঠিক ছিল।’ অমিতাভ ওই একবারই এ নিয়ে কথা বলেছিলেন। সেদিন অমিতাভ সাবধানী হলেও রেখা সেই পথে হাঁটেননি। স্টার ডাস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেখা বলেছিলেন, বচ্চন বাড়িতে জয়া তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না জয়ার, যতদিন ও মনে করত নিছক একটি ফ্লিং। কিন্তু যখন দেখল, আমরা মনে মনে অনেকদূর এগিয়েছি, সেটা জয়া মেনে নিতে পারেনি। একদিন আমাকে ডিনারে ডেকেছিল। সারা সন্ধ্যা অনেক কথা হয়েছিল, অমিতাভের নামও উচ্চারিত হলো না। আমি যখন বেরিয়ে আসছিলাম, জয়া বলল, যাই-ই হোক, আমি কিন্তু কখনো অমিতাভকে ছেড়ে যাব না। তাহলে কি অভিতাভ-রেখার তুমুল প্রেম বিয়েতেই গড়াচ্ছিল? যেখানে বলিউড শাহেনশাহ অমিতাভ শেষ পর্যন্ত মা তেজি বচ্চন ও স্ত্রী জয়ার চাপে নত হয়ে বলিউড সম্রাজ্ঞী রেখার সঙ্গে প্রেমে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন? নাকি কাপুরুষের মতো প্রেমিকাকে বিতর্কে ফেলে নিরাপদে সরে দাঁড়িয়েছে? সেই সময়ের সব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে এমনটাই দেখা যায়। 

রেখা-দ্য আনটোল্ড স্টোরি বইটিতে একটি অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে রেখা বলেন, ‘সেখানে তিনি জয়াকে উদ্দেশ করে একটি কবিতা বলেছিলেন। কিন্তু দর্শকরা ভেবেছিলেন, কবিতাটি অমিতাভকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে।’ রেখার দাবি, মোকাদ্দারকা সিকান্দার ছবিতে তার এবং অমিতাভের ঘনিষ্ঠ দৃশ্য দেখে হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন জয়া। ঋষি কাপুর ও নিতু সিংহের বিয়েতে সিঁদুর মাথায় নিয়ে রেখা অমিতাভের সঙ্গে গল্প জুড়লে জয়ার মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সেটি অমিতাভ আমলে না নিলেও মোকাদ্দারকা সিকান্দারের দৃশ্য দেখে জয়ার কান্নার পর বদলে যেতে থাকেন অভিষেকের বাবা অমিতাভ বচ্চন। ধীরে ধীরে রেখা থেকে সরে যেতে থাকেন। আর ঠিক করেন তার সঙ্গে আর জুটি হবেন না পর্দায়। রেখা আরও বলেছেন, ‘সিলসিলার শুটিং চলাকালীন তার ও অমিতাভের সম্পর্কের প্রভাব জয়ার সংসারে পড়েছিল। তাই রেখার সঙ্গে আর ছবিতে অভিনয় করতে দেননি জয়া।’ অমিতাভ-রেখার রসায়ন নিয়ে দশকের পর দশক যত রহস্যই আলোচনায় থাকুক না কেন ২০১৬ সালে সিলসিলার প্রয়াত পরিচালক যশ চোপড়া মেমোরিয়াল পদক নিতে গিয়ে রেখা বলেছেন, ‘যশ চোপড়া তাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।’ তার ছবি দেখে শেখা নয়, ইমোশনটা কি সেটাই তাকে যশ চোপড়া বুঝিয়েছিলেন। তাকে বলেছিলেন, ‘যখন কাউকে ভালোবাসবে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসবে, তাহলে দেখবে বাঁচার জন্য তাকে ছাড়া আর অন্যকিছুর দরকার নেই।’

রেখা একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘অমিতাভ বচ্চনের মতো একজন বড় অভিনেতার সঙ্গে জুুটি বেঁধে দাঁড়ানো সহজ বিষয় ছিল না।’ অমিতাভের সঙ্গে তার যখন দেখা হয় তখন তিনি জয়ার স্বামী। জয়াকে তিনি দিদিভাই বলেই ডাকতেন। কেমন লেগেছিল অমিতাভকেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে রেখা বলেছিলেন, ‘আমি কোনো সাধারণ কাউকে দেখে ইমপ্রেসড হই না। তবে তিনি এমনই ছিলেন যাকে আগে কখনো দেখিনি। তাকে কখনো যন্ত্রণা ব্যক্ত করতে দেখিনি।’ রেখা কি কখনো অমিতাভের প্রেমে পড়েছিলেন? এই মিলিয়ন ডলার প্রশ্নের মুখে প্রতিবারের মতো রেখা এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তিত্বের প্রেমে আপামর জনগণ পড়েছেন, তার প্রেমে না পড়ে থাকা যায় না।’ রেখার পুরো নাম ভানু রেখা গণেশন। তার জন্ম ১৯৫৪ সালের ১০ অক্টোবর। রেখা নামেই তিনি পরিচিত। ১৯৬৬ সালে ‘রাঙ্গুলা রতœম’ নামে একটি তেলেগু ছবির মাধ্যমে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্র জীবন শুরু করেন। নায়িকা হিসেবে আসেন ১৯৭০ সালে ‘শাওন ভাদো’ ছবিতে। যখন তিনি প্লাস্টিক সার্জারি সম্পন্ন করেন, ভারতীয় গণমাধ্যম তাকে যৌন আবেদনের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করে। রেখার বাবা জেমেনি গণেশন তামিল অভিনেতা ও মা তেলেগু অভিনেত্রী পুষ্পাবেলী। ভারতের চেন্নাই (পরে মাদ্রাজ) থেকে তিনি এসেছিলেন। বাড়িতে তিনি তেলেগু ভাষায়ই কথা বলেন। ইংরেজি, হিন্দি এবং উর্দু ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। রেখার পিতা-মাতা বিবাহিত ছিলেন না এবং শৈশবে তার পিতা তাকে স্বীকার করেননি। অনেক পরে পিতার স্বীকৃতি নিয়ে ভানু রেখা গণেশন হন রেখা। শৈশবেই রেখা স্কুল ত্যাগ করেন এবং অভিনেত্রী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। বিনোদ মেহরাকে নিয়ে তার বিয়েও একপর্যায়ে বিতর্কিত হয়। ২০০৪ সালে একটি টিভি সাক্ষাৎকারে রেখা সেই বিয়ের কথা নাকচ করে দিয়ে বিনোদ মেহরাকে একজন শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৯৮২ সালে ওমরাওজান চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি অনেকবার ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারে ভূষিত হন। আজীবন সম্মাননাও লাভ করেছেন। আইফা বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার, স্ক্রিন পুরস্কার, জি-সিনে পুরস্কার, স্টার ডাস্ট পুরস্কার, বলিউড মুভি অ্যায়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেন। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- ঘর, দো আনজানে, আলাপ, ইমান ধরম, খুন পাচি না, গঙ্গা কি সুগন্ধ, মুকাদ্দারকা সিকান্দার, মিস্টার নটবর লাল, সুহাগ, রাম বল রাম, সিলসিলা, ওমরাওজান, কই মিল গ্যায়া। বর্তমানে রেখা মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় তার নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন।

অমিতাভ বচ্চন ১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদের এক নিম্ন পরিবারে। তার বাবা হরিবংশ রায় বচ্চন একজন নামকরা হিন্দি কবি ও কলেজ অধ্যাপক ছিলেন। মা তেজি বচ্চন বর্তমান পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের শিখ পাঞ্জাব পরিবারের সন্তান। বলিউডের শাহেনশাহ ও সহশ্রাব্দের সেরা তারকা হিসেবে পরিচিত বচ্চন পাঁচ দশকের অধিক সময়ের কর্মজীবনে ১৯০টির অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। রেখার সঙ্গে করেছেন ১১টি ছবি। যা প্রায় সবই সুপারহিট। তাকে ভারতীয় তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেতা হিসেবে গণ্য করা হয়। সত্তর ও আশির দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে তার একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য ফরাসি চলচ্চিত্র সমালোচক ও পরিচালক ফ্রঁসোয়া ত্রপো তাকে ‘একক ব্যক্তি চলচ্চিত্র শিল্প’ বলে অভিহিত করেন। তিনি চারটি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৫টি ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। আশির দশকে রাজনীতিতে প্রবেশ করে কংগ্রেস থেকে ’৮৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। এরপর আর রাজনীতি বা নির্বাচনের দিকে যাননি। ’৮৪ সালে ভারত সরকার তাকে চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী, ২০০১ সালে তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ এবং ২০১৫ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণে ভূষিত করে। বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার অনন্য কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ফ্রান্স সরকার ফ্রন্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার লেঁজিও দনরের ভূষিত করেন। তার ও জয়া ভাদুড়ি কন্যা শ্বেতানন্দা এবং ছেলে অভিষেক বচ্চন। অভিনেতা অভিষেকের স্ত্রী ঐশ্বর্য রাই।


আপনার মন্তব্য