শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩২

ডাকসু নিয়ে খোলামেলা আলোচনা

অক্টোবরে ভোটার খসড়া তালিকা, মার্চে ভোট, ভিসির সঙ্গে ছাত্রসংগঠনের বৈঠক

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

ডাকসু নিয়ে খোলামেলা আলোচনা
ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসানকে জড়িয়ে ধরলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী

আরেক ধাপ এগোল ডাকসু নির্বাচনের পথ। দীর্ঘ ২৭ বছর পর নির্বাচন নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রশাসন। ঢাবি উপাচার্যের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় একদিকে ছিল ছাত্রলীগ, অন্যদিকে ছাত্রদল। বাদ পড়েনি বাম ছাত্র সংগঠনগুলোও। সবারই উদ্দেশ্য ছিল ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন’ না হওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তা থেকে বের হয়ে আসতে করণীয় নির্ধারণ।

সভা থেকে দ্রুত ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানায় সব ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এ ছাড়া সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সহাবস্থান ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও জানায় তারা। অন্যদিকে আগামী বছরের মার্চ মাসে নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই লক্ষ্যে অক্টোবরের মধ্যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করা হবে বলেও জানানো হয়। গতকাল ঢাবি উপাচার্য-সংলগ্ন পুরাতন সিনেট ভবনে বেলা পৌনে ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) পরিবেশ পরিষদের এ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে ক্রিয়াশীল ১৩টি ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এতে ঢাবি প্রশাসন ও শিক্ষক নেতাদের মধ্যে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক কামাল উদ্দীন, ঢাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল ও প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, ঢাবি শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান ও ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার, ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি জি এম জিলানী শুভ, সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দীসহ সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী এবং বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতারা এতে উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রতিটি ক্রিয়াশীল সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতিতে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব সংগঠনের নেতারাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ মেনে আলোচনায় অংশ নিয়েছে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি, সংসদীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণ করে শিক্ষার্থীরা আলোচনা করেছে। তাদের আলোচিত বিষয়গুলো আমাদের প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল বডি লিখে রেখেছেন। এটা নিয়ে পর্যালোচনা করে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’

কবে নাগাদ ডাকসু নির্বাচন দেওয়া হবে এমন প্রশ্নে উপাচার্য বলেন, ‘প্রভোস্ট কমিটি, শৃঙ্খলা পরিষদ ও সিন্ডিকেট থেকে একটি নির্দেশনা তো আগেই দেওয়া আছে। ডাকসু নির্বাচনের জন্য কাজের যে লোড, যে কর্মপরিধি, তা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের এই কমিটিগুলো একটা নির্দেশনা ইতিমধ্যে দিয়েছে, সেটা হলো মার্চ ২০১৯। এই নিরিখে এখন পর্যন্ত আমাদের ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে। আশা করি অক্টোবরের মধ্যে খসড়া যে ভোটার তালিকা সেটি প্রণয়ন করব। এই ভোটার তালিকা প্রণয়ন একটি জটিল কাজ। সেটি করতে পারলে অনেক এগিয়ে যাব।’ ডাকসু নির্বাচন দেওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সব দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করা নিয়ে ছাত্রদের দাবি-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, হলগুলোতে অবস্থানের জন্য প্রভোস্টরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। মধুর ক্যান্টিনকেন্দ্রিক যে রাজনৈতিক চর্চা সেটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সেখানে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের যে কার্যক্রম চালাবে তাতে কারও জন্য প্রশাসন থেকে কোনো বাধা নেই।

অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ১৯৯১ সালে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও নির্বাচন হয়নি। সে রকম পরিবেশ পরিস্থিতি যাতে না হয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমরা আলোচনা করেছি।’ কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসান বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। ডাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে আমাদের দাবির মধ্যে ছিল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক সহাবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও মধুর ক্যান্টিনে রাজনীতি করার যে স্বাভাবিক পরিবেশ তা নিশ্চিত করতে হবে। হলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের থাকার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। হলগুলোর ভীতিহীন পরিবেশ দূর করতে হবে। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের সিট বণ্টন করতে হবে। নির্বাচন করবে ছাত্র সংগঠনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোতে যখন সহাবস্থান নিশ্চিত থাকবে, তখনই ডাকসু নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ হবে বলে আমরা মনে করি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে। তবে প্রশাসনের কাছে আমরা একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি।’ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, ‘নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ও তফসিল ঘোষণার কথা বলেছি। এর আগে সব রাজনৈতিক দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা বলেছি ডাকসু নির্বাচন নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কেননা এটি স্বতন্ত্র। তাই জাতীয় নির্বাচনের দিকে না তাকিয়ে শুধু ডাকসু নির্বাচনের দিকে নজর দেওয়া উচিত। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় ডাকসু নির্বাচন হতে পারলে এখন কেন তা সম্ভব নয়! এর আগেও ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন হয়নি। প্রশাসনের কাছে দাবি রেখেছি, যাতে এবারও এ রকম কিছু না হয়। আমরা ডিসেম্বরের মধ্যে সুস্পষ্ট তারিখ চেয়েছি।’ সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একাংশের সভাপতি ইমরান হাবীব রুমন বলেন, ‘আমরা সুস্পষ্টভাবে বলেছি, আগামী অক্টোবরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বরের মধ্যেই ডাকসু নির্বাচন দেওয়া উচিত। জাতীয় নির্বাচনের মারপ্যাঁচে আগের মতো এবারও উদ্যোগটা যেন ঝিমিয়ে না পড়ে। আমরা মনে করি এই সময়ের মধ্যে নির্বাচনটা হোক।’

ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমরা দ্রুত ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি। নির্বাচনের ব্যাপারে ছাত্রলীগ সব ধরনের সহযোগিতা করবে। নির্বাচনের মাধ্যমেই ছাত্র সংগঠনগুলোর জনপ্রিয়তা প্রমাণ করার সুযোগ আসবে।’ ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের ব্যাপারে ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, ‘প্রতিটি হলে ছাত্রলীগ কর্মীদের সংখ্যা গড়ে ৩০ শতাংশ। এর বাইরে যারা আছেন তারা অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। আমাদের নেতা-কর্মীদের বলেছি, এখানে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন বলতে কিছু নেই। আমরা সবাই ভ্রাতৃসম ছাত্র সংগঠন। সহাবস্থানের জন্য যে ‘‘ক্রাইটেরিয়া’’ রয়েছে সেটি পূরণ করতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায়, তখন প্রথম ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের কারণে এক দিনও ক্যাম্পাস বন্ধ হয়নি। যারা নিয়মিত ছাত্র আছেন তারা আসুন, প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলুন। আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।’

ছাত্রদল সভাপতিকে জড়িয়ে ধরলেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক : ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করতে ছাত্র সংগঠনগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আমন্ত্রণ জানানোর পর থেকেই ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের আগমন নিয়ে এক ধরনের সংশয় ছিল সবার মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের অবস্থান নেই। তাই গতকালের আলোচনা সভায় ছাত্রদলের অংশগ্রহণের বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সবার। এক ধরনের চাপা আতঙ্কও বিরাজ করছিল ক্যাম্পাসে। তবে সব সংশয় কাটিয়ে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আলোচনা সভায় অংশ নিতে ক্যাম্পাসে আসেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান ও ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার। তাদের সভাস্থলে নিয়ে যান বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম, যুগ্ম-আহ্বায়ক অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খানসহ প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা। বেলা পৌনে ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে আলোচনা। আলোচনা শেষে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল নেতারা একসঙ্গে বের হয়ে আসেন। পরে গাড়িতে ওঠার আগে ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসানকে জড়িয়ে ধরেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন ছাত্রদল নেতারা। এদিকে সব ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের উপস্থিতিতে সুষ্ঠুভাবে সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্বস্তি বিরাজ করছে সর্বমহলে।


আপনার মন্তব্য