Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ জুন, ২০১৯ ২৩:১১

৪৮ বছর পাকিস্তানি ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে বিআরটিসি

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

৪৮ বছর পাকিস্তানি ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে বিআরটিসি

১৯৭১ সালের প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ২০০ ট্রাক আমদানির উদ্যোগ নেয় তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন বা ইপিআরটিসি। এ জন্য ঢাকার স্থানীয় কয়েকটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তখনকার ইউনাইটেড ব্যাংকে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলা হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে ট্রাকগুলো চট্টগ্রামের পরিবর্তে  খালাস হয় করাচি বন্দরে। স্বাধীনতালাভের পর পূর্ব পাকিস্তান হয় বাংলাদেশ। আর ইউনাইটেড ব্যাংক রূপান্তরিত হয় জনতা ব্যাংকে আর ইপিআরটিসি নাম ধারণ করে হয় বিআরটিসি। তবে দেশ, সংস্থা ও ব্যাংকের নাম বদলালেও ৪৮ বছর আগের সেই ঋণের দায় থেকে মুক্তি মেলেনি বিআরটিসির। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কেড়ে নেওয়া ট্রাকের মূল্য পরিশোধের দায় বয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বিআরটিসির চেয়ারম্যান ফরিদ আহমদ ভূঁইয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘২০০ ট্রাক আমদানির এলসি খুললেও তার সুবিধাভোগী আমরা নই। কিন্তু প্রায় ৪৮ বছর ধরে এর দায় আমাদের ওপর চেপে আছে। বিআরটিসি একটি রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান হলেও সরকার জনস্বার্থে বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানটিকে ভর্তুকি দেয়। এখন এ দায় সরকার নিজে পরিশোধ করতে পারে, নয় তো ব্যাংকগুলোর ঋণ অবলোপন বা মওকুফের সুযোগ করে দিতে পারে। আমাদের এই টাকা পরিশোধের সক্ষমতা নেই।’

ট্রাক আমদানি নিয়ে যা ঘটেছিল ’৭১ সালে : বিআরটিসি সূত্রগুলো জানান, ১৯৭০ সালে জাপান থেকে ২০০ ট্রাক আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও পূবালী ব্যাংকের (কনসোর্টিয়াম ব্যাংক) আর্থিক সহায়তায় তখনকার ইউনাইটেড ব্যাংকে (বর্তমানে জনতা ব্যাংক) একটি এলসি খোলে তখনকার ইপিআরটিসি। এলসি খোলার পর আমদানি মূল্য পরিশোধ করে সেই ট্রাক জাপান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এ সময় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পরাজয় নিশ্চিত জেনে ইউনাইটেড ব্যাংকের লন্ডন শাখায় এলসি ডকুমেন্ট নেগোসিয়েট করে চট্টগ্রামের পরিবর্তে করাচি বন্দরে ট্রাকের চালান খালাসের নির্দেশ দেয়। পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের ট্রাক নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তান। এদিকে ট্রাক না পেয়ে ব্যাংকগুলোর দায় পরিশোধে অনীহা জানায় পূর্ব পাকিস্তান সড়ক পরিবহন করপোরেশন থেকে নাম বদলে যাওয়া সংস্থা বিআরটিসি। বিআরটিসির হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রমজান হোসেন জানান, ‘১৯৭১ সালে কনসোর্টিয়াম ঋণের ৬০ দশমিক ৫৬ লাখ টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলো এ দায় পরিশোধ করে। বিআরটিসি আমদানি সুবিধা ভোগ করেনি। এ কারণে ব্যাংকগুলোর দায় অপরিশোধিত রয়েছে। স্থানীয় যে ব্যাংকগুলোর কনসোর্টিয়াম করে এলসি মূল্য পরিশোধ করেছিল, তাদের মধ্যে লিড ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংক ২০০৭ সালে ঋণ মওকুফ করে দিলেও পূবালী ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে। এখন সেই মামলার পরবর্তী শুনানি ১৮ জুন। বিষয়টি আমরা সড়ক পরিবহন বিভাগকে জানিয়েছি, যাতে এটি নিষ্পত্তি করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময়ের এই ঋণের দায় থেকে অব্যাহতি চায় বিআরটিসি।’ এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্মসচিব (বিআরটিসি) ড. মো. কামরুল আহসান বলেন, ‘আলোচ্য ২০০ ট্রাক আমদানির সুবিধা বিআরটিসি ভোগ করেনি। কিন্তু দায় পরিশোধের চাপ রয়েছে। টাকাগুলো যেহেতু ব্যাংকের পাওনা, সে কারণে আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছি যাতে বিষয়টি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৬ এপ্রিল সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এ বিষয়ে একটি সভা করে। তবে সেই সভার সিদ্ধান্ত আমার জানা নেই।’ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। সোনালী ব্যাংক জানিয়েছে তারা পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তমতে বিআরটিসির স্বাধীনতা-পূর্বকালীন ঋণ হিসেবে ব্যাংকের পাওনা মওকুফ করে দিয়েছে। তবে জনতা, অগ্রণী ও পূবালী ব্যাংকের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন তারা বিভিন্ন সময় আলোচ্য ঋণ অবলোপন করেছেন এবং ঋণ আদায়ে বিআরটিসির বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন।

যেহেতু পাওনা অর্থ নিয়ে মামলা চলছে সে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ‘অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর আওতায় আদালতে মামলা চলার পরও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। তবে বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সুদ পরিশোধের সুযোগ থাকলেও মূল ঋণ মাফ করা যায় না। এ অবস্থায় বিআরটিসি যদি বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা মূল ঋণ পরিশোধ করে দেয় এবং অর্থায়নকারী সব ব্যাংক সুদ মওকুফে সম্মত হয়, তাহলে এ ঋণ সমন্বয় করা সম্ভব।’


আপনার মন্তব্য