শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ মার্চ, ২০২০ ২৩:২০

আরও একজনের মৃত্যু

কমিউনিটি ট্রান্সমিশন চলছে, দেশে নতুন আক্রান্ত নেই সিলেটে হোম কোয়ারেন্টাইনে মারা গেছেন বৃদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আরও একজনের মৃত্যু

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নতুন একজন রোগী মারা গেছেন। এ নিয়ে কভিড-১৯ ভাইরাসে বাংলাদেশে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে নতুন কেউ আক্রান্ত হননি। এখন পর্যন্ত সাত রোগী সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। তবে সীমিত আকারে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছে আইইডিসিআর। অন্যদিকে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত না হলেও সিলেটে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা একজন বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর জানা গেছে।

গতকাল দুপুরে করোনাভাইরাস-সংক্রান্ত অনলাইন লাইভ ব্রিফিংয়ে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ গতকাল সকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি বিদেশ থেকে আসা আক্রান্ত এক রোগীর পরিবারের সদস্য। ১৮ মার্চ তার শরীরে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছিল। তখন এলাকার একটি হাসপাতালে আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ওই বৃদ্ধ। পরবর্তী সময়ে তার ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতি খারাপ হলে স্থানীয় হাসপাতাল থেকে ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ২১ মার্চ থেকে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন তিনি। অধ্যাপক সেব্রিনা বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে নতুন কেউ আক্রান্ত হননি। ২৪ ঘণ্টায় ৮২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৭৯৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে যাদের পরীক্ষা করা প্রয়োজন, তাদেরই পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, এখন আইসোলেশনে আছেন ৪৭ জন ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে ৪৭ জন। এর আগে মঙ্গলবার দেশে করোনাভাইরাসে ছয়জন আক্রান্ত হন। দেশে এ পর্যন্ত মোট ৩৯ জনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তাদের মধ্যে আরও দুজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। ফলে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল সাতজনে। প্রথমবারের মতো কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের কথা বলল আইইডিসিআর : এত দিন ধরে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের কথা নিয়ে আলোচনা চললেও দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও প্রতিকারের দায়িত্বে থাকা আইইডিসিআর তা স্বীকার করেনি। তবে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সীমিত কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের কথা বলেছেন অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। সাধারণত যখন কোনো সংক্রমণের উৎস চিহ্নিত করা যায়, সেটিকে লোকাল ট্রান্সমিশন বলে। সংক্রমণ পাওয়া গেলেও তার উৎস চিহ্নিত করা না গেলে সেটি হলো কমিউনিটি ট্রান্সমিশন। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী বলেন, ‘দুটি জায়গায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংক্রমণের উৎস এখন পর্যন্ত চিহ্নিত করা যায়নি। আমরা দুটি ক্ষেত্রেই ইনভেস্টিগেশন করেছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটির সোর্স অব ইনফেকশন জানা সম্ভব হয়নি। সেদিক থেকে ‘লিমিটেড স্কেলে’ কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে বলে আমরা বলতে পারি। লিমিটেড স্কেলে যে এলাকার কথা আমরা বলেছি, সেখানে ট্রান্সমিশন হয়ে থাকতে পারে বলেই কিন্তু ওই এলাকাটিকে আমরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ন্ত্রণে রেখে কার্যক্রম নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বাংলাদেশব্যাপী কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আসলে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলার আগে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে হবে।’ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় ৮২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে একজনেরও করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) পাওয়া যায়নি। গতকালও যে নমুনা পরীক্ষা করেছি, তাতে কভিড-১৯ পজেটিভ আসার হার কিন্তু খুব কম। এখন হাসপাতালে আসা নিউমোনিয়ার রোগীর নমুনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ ধরনের পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত দুজনের কভিড-১৯ পজেটিভ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাদের বিদেশ থেকে আসা মানুষের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস পাওয়া গেছে। সেসব বিশ্লেষণ করে এখনো বাংলাদেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে তা বলা যাবে না।’

সিলেটে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা বৃদ্ধের মৃত্যু : সিলেটে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা এক বৃদ্ধ (৬৫) মারা গেছেন। মঙ্গলবার রাত ৯টায় নিজ বাসায় মারা যান তিনি। নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকার বাসিন্দা ওই ব্যক্তি দেশে থাকলেও তার ছেলে সপ্তাহখানেক আগে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে তিন দিন অবস্থান করে আবার চলে যান। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছিলেন। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হতো তাকে। ১৪ মার্চ যুক্তরাজ্য থেকে তার ছেলে দেশে ফেরেন। এর তিন দিন পর ওই ব্যক্তির শ্বাসকষ্ট শুরু হলে বাবাকে নিয়ে সিলেট কিডনি ফাউন্ডেশনে যান প্রবাসী ছেলে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক বিস্তারিত শুনে তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার পরামর্শ দেন। তিনি করোনাভাইরাস আক্রান্ত ছিলেন কি না তা নিশ্চিতের জন্য কোনো পরীক্ষা করানো হয়নি। তবে সিলেট জেলা প্রশাসক বৃদ্ধের মৃত্যুর কারণ করোনাভাইরাস নয় বলে জানিয়েছেন। বিভিন্ন জেলার নমুনা আসছে ঢাকায় : যশোর জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা এক রোগীর নমুনা পাঠানো হয়েছে আইইডিসিআরে। পাবনায় এক রোগীর ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে কি না নিশ্চিত হতে আইইডিসিআরে পরীক্ষার জন্য বলা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত করোনা সন্দেহে শের-ই বাংলা মেডিকেলের করোনা ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন তিনজন রোগী। চট্টগ্রামে দুই বাড়ি, মানিকগঞ্জে গ্রাম লকডাউন : করোনাভাইরাস আক্রান্ত এক নারীর অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার দুটি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতেই এ দুটি বাড়ি লকডাইন করে প্রশাসন। মেহেরপুরে লক ডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। করোনাভাইরাসে এক ব্যক্তির (৪৮) মৃত্যু হয়েছে, এমন সন্দেহে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার একটি গ্রাম লকডাউন (বদ্ধাবস্থা) ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন। তিনি অসুস্থ থাকায় ঢাকায় হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। ঘিওরে তার দাফন সম্পন্ন হয়। দাফনে কয়েকজন স্বজন অংশগ্রহণ করেন।

মৃত ব্যক্তির অসুস্থতার লক্ষণ শোনার পর পুরো গ্রাম লকডাউন ঘোষণা করে উপজেলা প্রশাসন।

জেলায় জেলায় কোয়ারেন্টাইন : স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে বর্তমানে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ৩০ হাজার ৪২৩ জন। এর মধ্যে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৩০ হাজার ২৮৫ জন। আমাদের প্রতিনিধিরা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন  ৮১২ জন, কুমিল্লায় ২৪ ঘণ্টায় ৬৫৬ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এ জেলায় মোট দুই হাজার ২১ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। কিশোরগঞ্জে নতুন ১১১ জনসহ ৪১৩ জন, ময়মনসিংহে ৭০২ জন, পঞ্চগড়ে নতুন ৫০, মোট ৬৫৩ জন, পটুয়াখালীতে ৬২৫, নাটোরে ২২৫ জন, টাঙ্গাইলে ৭৮৬ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৩০৪ জন,  সিলেটে নতুন ২০৭ জন এবং মোট কোয়ারেন্টাইনে আছেন ২ হাজার ৩০ জন। নেত্রকোনায় এ পর্যন্ত বিদেশফেরত ১০২৮ জনের তালিকা পেয়েছে জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে ৫০০ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। বাগেরহাটে ১২২৮ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন এবং তা না মেনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ২৯৭২ জন। গাজীপুরে ৫৭৯ জন প্রবাসী হোম কোয়ারেন্টাইনে এবং ৪৭ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। এ ছাড়া এক আসামিকে কারাগারের ভিতরে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে গ্রেফতার হন তিনি।


আপনার মন্তব্য