শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ জুন, ২০২০ ০০:০৮

তিন জোনে ভাগ হচ্ছে দেশ

আক্রান্ত প্রায় ৫০ হাজার, মৃত্যু হার ঊর্ধ্বমুখী

বিশেষ প্রতিনিধি

বিশ্বব্যাপী মহামারী রূপ নেওয়া করোনাভাইরাসে প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। বাংলাদেশেও প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় রেকর্ড ভাঙছে। পরিসংখ্যানেও দেখা যায় মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বমুখী। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ২ হাজার ৩৮১ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল সংখ্যা ৪৯ হাজার ৫৩৪ জন। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২২ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৬৭২ জনে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা সাধারণ ছুটির পর দ্বিতীয় কর্মদিবসে গতকাল দুপুরে করোনাভাইরাস নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত বুলেটিনে এ তথ্য জানান সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। তিনি জানান, মৃত্যুবরণকারী ২২ জনের মধ্যে পুরুষ ১৯ জন ও নারী তিনজন। বয়স বিশ্লেষণে ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে একজন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে আটজন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে চারজন, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে সাতজন এবং ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে দুজন রয়েছেন। অঞ্চল বিবেচনায় ঢাকা বিভাগে ১১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে আটজন, সিলেট বিভাগে দুজন এবং বরিশাল বিভাগে একজন রয়েছেন। ২২ জনের মধ্যে হাসপাতালে মারা গেছেন ১৫ জন, বাড়িতে ছয়জন এবং মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে একজনকে। নাসিমা সুলতানা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৮১৬ জন সুস্থ হয়েছেন। এ নিয়ে মোট সুস্থ হয়েছেন ১০ হাজার ৫৯৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫২টি ল্যাবে নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১৩ হাজার ১০৪টি, পরীক্ষা করা হয়েছে ১১ হাজার ৪৩৯টি নমুনা। এখন পর্যন্ত মোট নমুনা পরীক্ষা করা হলো তিন লাখ ২০ হাজার ৩৬৯টি। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৮১ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার এক দশমিক ৩৯ শতাংশ। এদিকে সারা দেশের কোথায় কোথায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নতুন রোগী শনাক্ত হলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন তার সর্বশেষ খবর জানিয়েছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা- চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে একদিনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আরও ১১৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯১ জনই মহানগরী এলাকার। রবিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক), চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সাইয়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু) ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ল্যাবে করা নমুনা পরীক্ষায় এ সংক্রমণ ধরা পড়ে। এদিন উল্লিখিত তিনটি ল্যাবে চট্টগ্রামের ৪০৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকার ৯১ জন এবং বাকি ২৭ জন বিভিন্ন উপজেলার। চমেক ল্যাবে রবিবার ২৭২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে করোনাভাইরাস পজিটিভ পাওয়া যায় ৯৫ জনের। এর মধ্যে মহানগরী এলাকার ৮৯ জন এবং উপজেলা পর্যায়ের ছয়জন। সিভাসু ল্যাবে ১৩০ নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ পাওয়া গেছে ২৩ জনের। এর মধ্যে মহানগরী এলাকার দুজন এবং বিভিন্ন উপজেলার ২১ জন। এ নিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত মোট ২ হাজার ৯৮৫ জন শনাক্ত হলেন। কুমিল্লা : চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার মেয়র মিজানুর রহমানসহ সোমবার কুমিল্লায় করোনাভাইরাসে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৪৯ জন। এর মধ্যে কুমিল্লা মহানগরীতেই রয়েছে ১২ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল এক হাজার ২০ জনে। গতকাল কুমিল্লা নগরীতে ১২, নাঙ্গলকোটে পাঁচজন, চৌদ্দগ্রামে ১৩ জন, আদর্শ সদরে পাঁচজন, বুড়িচংয়ে ৯ জন, মুরাদনগরে তিনজন, মেঘনা ও ব্রাহ্মণপাড়ায় একজন করে আক্রান্ত হন। গাজীপুর : জেলায় নতুন করে আরও ৬৯ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২৪৯ জনে দাঁড়াল। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার ৮৩১ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ওই পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী নতুন করে আরও ৬৯ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। নতুন শনাক্তদের মধ্যে গাজীপুর সদর এলাকায় ৩১ জন, কালিয়াকৈর ১৫, কালীগঞ্জ ৭, কাপাসিয়া ৩ জন ও শ্রীপুর উপজেলায় ১৩ জন রয়েছেন। এ পর্যন্ত গাজীপুরে ১০ হাজার ৬৮৭ জনের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে, এতে মোট আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৪৯ জন।

নেত্রকোনা : জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২০ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৪১ জনে দাঁড়াল। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে কেন্দুয়া উপজেলায় অগ্রণী ব্যাংকের ৫ জন, সাহিতপুর শাখা কৃষি ব্যাংকের ২ জন ও সোনালী ব্যাংকের একজনসহ মোট ৮ জন, আটপাড়ায় একজন স্বাস্থ্যকর্মীসহ ৪ জন, পূর্বধলায় ৪ জন, সদর উপজেলায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ১ জনসহ ২ জন এবং খালিয়াজুরী ও বারহাট্টায় একজন করে রয়েছেন। শনাক্তদের মধ্যে একজন স্বাস্থ্যকর্মী ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একজন রয়েছেন। যশোর : যশোরে ভারত-ফেরত দুজনের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। কয়েকদিন আগে তারা বেনাপোল হয়ে দেশে ঢুকে শার্শায় কোয়ারেন্টাইনে আছেন। কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থাতেই তাদের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনোম সেন্টারে পাঠানো হয়। এই জিনোম সেন্টারে গতকাল যে তিনজনের নমুনায় করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ওই দুজন রয়েছেন। দুজনই পুরুষ এবং তাদের বাড়ি যশোর সদর উপজেলায়। এ দুজনসহ যশোরে শনাক্ত হওয়া মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১০৯। দিনাজপুর : গত ২৪ ঘণ্টায় পার্বতীপুরে মোস্তফাপুর ইউপির আমবাড়ী বাজার এলাকায় একজন, বিরলে কামারপাড়ায় একজন এবং চিরিরবন্দরে ইউসুুফপুর ইউপির বিন্নাকুঁড়ি গ্রামে একজন পুরুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের দুজন দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজে হাসপাতালের আইসোলেশনে ভর্তি রয়েছেন। এদের মধ্যে একজনের অবস্থার অবনতি হয়েছে। এনিয়ে দিনাজপুরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২২৭ জন। যার মধ্যে পুরুষ ১৬৮ জন, নারী ৪৯ জন ও শিশু ১০ জন রয়েছে। ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ মেডিকেলের দুই স্বাস্থ্যকর্মীসহ ময়মনসিংহে রবিবার আরও ১৫ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় ৮ জন, ফুলপুর উপজেলায় ৪ জন, নান্দাইল উপজেলায় একজন রয়েছেন। এনিয়ে ময়মনসিংহ জেলায় ৫০১ জন করোনায় আক্রান্ত হলেন। এদিকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৭৮ জন।

মাগুরা : গত ২৪ ঘণ্টায় মাগুরায় পুলিশ সুপার পরিবারের সদস্যসহ ৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে সদরে ২ জন ও মহম্মদপুরে ৩ জন রয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় মোট শনাক্ত হলেন ২৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১৯ জন।

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) : শ্রীমঙ্গলে একদিনে চিকিৎসক, সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, সিনিয়র স্টাফ নার্স, ওয়ার্ড বয়সহ ১৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। রবিবার রাতে ঢাকা ল্যাব থেকে এই ১৮ জনের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে করোনা পজিটিভ আসে। এদের মধ্য মুক্তিযোদ্ধা বিকাশ দত্ত (৬৫) গত ২৭ মে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। এই ১৮ জন নিয়ে শ্রীমঙ্গলে মোট ৩০ জন করোনা আক্রান্ত হলেন।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১৬ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সোমবার সকাল পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা মোট ১৮১ জন। নতুন করে আক্রান্তরা হলেন টাঙ্গাইল সদরে একজন, নাগরপুরে তিনজন, বাসাইলে একজন, কালিহাতীতে দুজন, ঘাটাইলে চারজন, মধুপুরে দুজন এবং ধনবাড়িতে তিনজন। টাঙ্গাইলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট মারা গেছেন চারজন। সুস্থ হয়েছেন ৪৬ জন।

তিন জোনে ভাগ হচ্ছে দেশ

মার্চের শেষ দিক থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে  দেশে সাধারণ ছুটি দিয়েছিল সরকার। এবার সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মধ্যে যাতে ভাইরাস নতুন করে ছড়িয়ে না পড়ে এ জন্য সরকার কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে। 

এই পরিকল্পনার আওতায় সারা দেশকে লাল, সবুজ ও হলুদ  জোনে ভাগ করা হবে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। সাধারণ ছুটির পর সীমিত পরিসরে অফিস খোলার দ্বিতীয় দিন গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনুযায়ী সারা দেশকে রেড, গ্রিন ও ইয়োলো জোনে ভাগ করা হবে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শে এ ব্যবস্থা  নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা একটা প্ল্যান  তৈরি করব। প্ল্যান নীতিগতভাবে এখানে (সভায়) আলোচনা হয়ে  গেছে। আমরা এখন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দিয়ে দেব। তখন মেয়র, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং আমরাও (স্বাস্থ্য) থাকব। সবাই মিলে প্ল্যান বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করব।’

কী পরিকল্পনা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত এটাই। এখন বিশেষজ্ঞরা তারা কীভাবে বাস্তবায়ন করবে বা জোনিং করবে সেটা তারা জানে।’

এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এখনো জোন করা হয়নি। যখন করা হবে তখন জানতে পারবেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত হয়েছে। যদি  কোনো জোন রেড হয়ে থাকে সেগুলোকে রেড করা হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা এখনো অনেকাংশে ভালো আছে। আমরা সেটা ভালো রাখতে চাই। ভালো রাখার জন্য আজকে এই সভা।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর