শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:২৮

১০ জনের মৃত্যুদণ্ড হাই কোর্টে বহাল

শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ জঙ্গির মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছে হাই কোর্ট। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া এক আসামি ও ১৪ বছর কারাদন্ড পাওয়া দুই আসামির সাজাও বহাল রাখা হয়েছে। রায়ে খালাস পেয়েছেন একজন। ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ এবং আসামিদের আপিল ও জেল আপিল খারিজ করে গতকাল বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। ভাষার মাস উপলক্ষে এ রায়টি বাংলায় দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হাই কোর্ট।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. বশির উল্লাহ। এ ছাড়া সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মিজানুর রহমান খান শাহিন, মোহাম্মদ শাহিন আহমেদ, মো. সাফায়েত জামিল, মো. আশিকুজ্জামান বাবু, সাদিয়া সুলতানা রত্নাও রায়ের সময় ভার্চুয়াল আদালতে যুক্ত ছিলেন। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ আহসান, মো. নাসিরউদ্দিন। এ ছাড়া পলাতক আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন অমূল্য কুমার সরকার। মৃত্যুদন্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন ওয়াশিম আখতার ওরফে তারেক হোসেন, মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম, মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুন, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই এবং মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর। এদের মধ্যে মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আবদুল হাই পলাতক। রায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বহাল রয়েছে মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদের। এ ছাড়া আসামি আনিসুল ওরফে আনিস, মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমানকে নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৪ বছর সশ্রম কারাদন্ড বহাল রেখেছে হাই কোর্ট। মহিবুল্লাহর বিষয়ে রায়ে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এ আসামিকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। বিচারিক আদালত তাকে অত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে। সুতরাং জেলকোড অনুযায়ী যদি এ আসামি দন্ড ইতিমধ্যে ভোগ করে থাকেন এবং তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকে তাহলে তাকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হলো। অন্যদিকে বিচারিক আদালতে ১৪ বছর সশ্রম কারাদন্ড পেলেও হাই কোর্টের রায়ে খালাস পেয়েছেন সরোয়ার হোসেন মিয়া। ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি হাই কোর্ট।

তদন্তে আরও মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল : রায়ের পর্যবেক্ষণে হাই কোর্ট বলেছে, ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে কেউ আফগানিস্তান ও কেউ পাকিস্তানে গিয়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের তৎপরতার আড়ালে যাদের বিচরণ ছিল তাদের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে তদন্ত কর্মকর্তাদের তদন্তের আরও গভীরে যাওয়া উচিত ছিল। তদন্তকাজে আরও ‘অধিকতর মনোযোগী’ হওয়া উচিত ছিল। রায়ে বলা হয়, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত এ আসামিরা এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যা বাস্তবায়ন হলে এ দেশে আরেকটি ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হতো। তাই বিচারিক আদালত দোষী সাব্যস্ত করে যে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছে তা যথার্থ এবং আইনসম্মত। লঘুদন্ড দিয়ে জঙ্গিদের উৎসাহিত করার সুযোগ নেই বলেও রায়ে বলেছে হাই কোর্ট।

রায়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা প্রসঙ্গ : পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ আরও যারা ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ভোররাতের বিভীষিকাময় ঘটনার মধ্য দিয়ে শহীদ হওয়ার কারণে এই সার্বভৌম দেশটি যতটুকু পিছিয়ে গিয়েছিল, ঠিক আবারও একটি ঘটনার অবতারণা শুরু হয়েছিল এ ঘটনার মধ্য দিয়ে। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার কথা তুলে ধরে বিচারপতি বলেন, দুনিয়ার কোনো সভ্য দেশে এমনিভাবে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা বিরল। কাজেই এ মামলায় সংঘটিত ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার অবকাশ নেই। তিনি বলেন, এখন প্রশ্ন হচ্ছে এ ধরনের ভয়াবহ অপরাধ আসামিরা করতে চেয়েছিল কেন?

ইসলাম সম্পর্কে অবাস্তব ও ভ্রান্ত ধারণা ছিল আসামিদের : রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আসামিদের একটি অবাস্তব এবং ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে এ ধরনের মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে। আদালত বলে, অবস্থা যাই হোক না কেন আসামিরা ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা নিয়ে তৎকালীন সরকারকে দোষারোপ করেছিল। অথচ ইসলামের মূল্যবোধ, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শিক দিকগুলো এ দেশের মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য এবং আগত জেনারেশনকে উদ্বুব্ধ করার জন্য বিভিন্ন ইসলামী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুধু তাই নয়, অন্য ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপারেও তিনি সজাগ ছিলেন। পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আসামিরা যাদের (সরকার) ইসলামবিদ্বেষী বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল তারাই বরং ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত। অথচ একসময় ইসলামের মূল্যবোধ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা ও কর্মে পুরো দেশ ও সমাজ অশান্তিতে বিরাজমান ছিল। আসামিদের এ ধরনের ধ্যান-ধারণা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। কারণ ইসলাম শান্তির ধর্ম।

ফিরে দেখা : ২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। শেখ লুৎফর রহমান মহাবিদ্যালয়ের উত্তর পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছনে এ বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় কোটালীপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন মামলা দায়ের করেন। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে ২০০৯ সালের ২৯ জুন আরও নয়জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য ঢাকা-২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে পাঠানো হয়। ২০১৭ সালের ২০ আগস্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারক মমতাজ বেগম রায়ে ১০ জঙ্গিকে প্রাণদন্ড দেন। গুলি করে প্রত্যেকের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের আদেশ দেন বিচারক। এ ছাড়া চার আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়। রায়ের চার দিনের মাথায় মৃত্যুদন্ড অনুমোদনের জন্য এ মামলার রায়সহ সব নথি হাই কোর্টে পাঠানো হয়, যা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পরিচিত। এরপর প্রধান বিচারপতির কাছে নথি উপস্থাপন করা হলে তিনি জরুরি ভিত্তিতে পেপারবুক তৈরির নির্দেশ দেন। ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল উচ্চ আদালতে এ মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ডের রায়ের অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। গত ১ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষ হলে হাই কোর্ট রায়ের জন্য গতকালের দিনটি ধার্য করে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর