শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৩৯

চেনা যাচ্ছে না এবারের ভাইরাস

দ্বিতীয়বার করোনা আক্রান্ত বাড়ছে, ঝুঁকিতে স্বাস্থ্যকর্মীরা

জয়শ্রী ভাদুড়ী

Google News

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ডা. রাজীব শাহরিয়ার গত বছরের এপ্রিলে প্রথম করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ বছরের ২২ মার্চ তিনি পুনরায় করোনা আক্রান্ত হন। ডা. রাজিব শাহরিয়ার বলেন, গত বছর আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে পুনরায় আইসিইউ ডিউটি থেকে শুরু করে সার্বিক কাজ করছিলাম। আমি বাসা থেকে এন৯৫ মাস্ক পরে হাসপাতালে যেতাম আর বাসায় এসে খুলতাম। এর মধ্যে পিপাসা লাগলে পানিও খেতাম না। কিন্তু এক দিন মাস্ক খুলে হালকা নাস্তা করি। এরপরই করোনা টেস্টে পুনরায় পজিটিভ আসে। তবে টিকা নেওয়ায় জটিলতা কমেছে উল্লেখ করে এ চিকিৎসক বলেন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও স্থুলতা- এ তিন স্বাস্থ্যগত জটিলতা থাকা সত্ত্বেও আমাকে  আইসিইউতে যেতে হয়নি। গত ৭ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসকদের মধ্যে প্রথমে টিকা নিয়েছিলাম। এর এক মাস ১৫ দিন পরেই করোনা আক্রান্ত হই। এক ডোজ টিকাতেই আমার অ্যান্টিবডি পিকে ছিল। এ জন্য করোনা আমাকে কাবু করতে পারেনি। স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আক্রান্ত বাড়ছে। আমার আরও তিন চিকিৎসক সহকর্মী দ্বিতীয়বার করোনা আক্রান্ত হয়েছেন।

দেশে করোনায় দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার এটি প্রথম বা একমাত্র ঘটনা নয়। গত বছর এ ধরনের ঘটনা আরও শোনা গিয়েছিল। অতি সম্প্রতি সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করোনায় দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। তৃতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। তবে কতজন দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হয়েছেন, তার হিসাব কোনো দফতরে নেই। চেনা যাচ্ছে না এবারের ভাইরাস। আক্রান্ত হচ্ছেন তরুণ এবং শিশুরা। দ্বিতীয়বার স্বাস্থ্যকর্মীরা বেশি করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের প্রধান এবং আরও কয়েকজন চিকিৎসক দ্বিতীয়বার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মুগদা জেনারেল হাসপাতালেও একাধিক চিকিৎসক দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হয়েছেন। ঢাকার বাইরেও মিলেছে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত রোগী।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন শাহজাহান কবির (৫৩)। সরকারি এ কর্মকর্তা গত বছরের মে মাসে প্রথম করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, গত বছর আমরা দুজনই করোনা আক্রান্ত হয়েছিলাম। তখন খুব একটা সমস্যা হয়নি। বাড়িতে থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম আমরা। গত ১৪ মার্চ অফিস থেকে ফেরার পরই তার হালকা জ্বর আসে। রাতের দিকে কাশি শুরু হয়। গরম পানি, চা কিংবা ওষুধে কাজ না হওয়ায় সন্দেহবশত করোনা টেস্ট করানো হয়। রিপোর্ট পজিটিভ আসে। শুনেছিলাম ভাইরাসের স্টেইন একবার সংক্রমিত করলে আর হবে না। এ জন্য স্বাস্থ্যবিধিতেও অবহেলা চলে এসেছিল। গত বছর জটিলতা না থাকলেও এবার প্রচন্ড শ্বাসকষ্টের সঙ্গে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। অক্সিজেন স্যাচুরেশন নেমে যাওয়ায় আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও করোনা গবেষক ডা. তুষার মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ৫০ বছরের নিচে আক্রান্ত বেড়েছে। তরুণদের আক্রান্ত হার অনেক বেশি। অনেকে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হচ্ছেন। ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে দ্বিতীয়বার করোনা আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রথমবারের তুলনায় এবার জটিল রোগী বেশি আসছে। আগে আমরা জনসাধারণকে বলতাম আতঙ্ক হবেন না, সচেতন হোন। কিন্তু এবার বলতে বাধ্য হচ্ছি আতঙ্কিত হয়ে সচেতন হোন। টিকা নিন। কারণ এবার করোনা সত্যিই জটিল আকার ধারণ করেছে।’

সংক্রমণ শুরুর পর থেকে নোবেল করোনাভাইরাস বহুবার রূপান্তরিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধরন বা ভেরিয়েন্টের বিস্তার আছে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে ইউকে ভেরিয়েন্ট ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভেরিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে এবং তাদের বিস্তারও হচ্ছে। গত বছর মার্চে বাংলাদেশে মূলত ইতালি থেকে আসা ভেরিয়েন্টের বিস্তার ঘটেছিল। এ ব্যাপারে সহকারী পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে অনেকেই দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হচ্ছেন। করোনা স্টেইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। দ্বিতীয়বার আক্রান্তরা বেশি জটিলতায় ভুগছেন। এজন্য টিকা নিতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। করোনা নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটিকে সংযুক্ত করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য সূত্রে জানা যায়, গতকাল ২৪ হাজার ৫৪৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৫ হাজার ৬৮৩ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ পাওয়া গেছে। করোনা সংক্রমণে মারা গেছেন ৫৮ জন। এর মধ্যে ৩১-৪০ বছর বয়েসী চারজন, ৪১-৫০ বছর বয়সী চারজন, ৫১-৬০ বছর বয়সী ১৬ জন এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৩৪ জন মারা গেছেন। মৃত্যুঝুঁকি কমাতে টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।