শিরোনাম
প্রকাশ : ৪ মার্চ, ২০২১ ১৮:৩১
প্রিন্ট করুন printer

গালোয়ান সংঘর্ষে মাত্র ৪ পিএলএ'র মৃত্যু, হাস্যকর দাবি চীনের

অনলাইন ডেস্ক

গালোয়ান সংঘর্ষে মাত্র ৪ পিএলএ'র মৃত্যু, হাস্যকর দাবি চীনের
ফাইল ছবি

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বিপর্যয়মূলক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফলস্বরূপ চীনে বিরাট দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে তার গবেষণায় দুটি বিষয়ের উল্লেখ করেন। একটি হলো গণতন্ত্রের অভাব। এবং গণমাধ্যমের মত প্রকাশে স্বাধীনতার অভাব হলো অপরটি। এই দুইয়ের অভাবেই কমিউনিস্ট দেশটিতে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারান বলে তিনি মনে করেন।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাং-ডায়ে হিউন তার গ্র্যান্ড ভ্যালি জার্নাল অব হিস্ট্রি-র খণ্ড ৭, সংখ্যা ১ এ প্রকাশ করেন, 'দ্য গ্রেট লিপ ফ্যামিন অ্যান্ড অমর্ত্য সেন'। এই নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, 'অমর্ত সেনের মতে, যদি কোনও দেশ স্বায়ত্তশাসিত (স্বতন্ত্র), সুষ্ঠু ও জবাবদিহি (গণতান্ত্রিক) হয় এবং মুক্ত ধারণার (মুক্ত গণমাধ্যম) বিনিময়কে উৎসাহ দেয় তবে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ দেখা দিলেও স্বায়ত্তশাসিত সরকার গার্হস্থ্য উদ্বেগ অনুসারে সম্পদ বরাদ্দ করার ক্ষমতা রাখে এবং আইনের শাসনের দ্বারা পরিচালিত সামাজিক উদ্বেগকে সামঞ্জস্য করার গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তব্য রয়েছে।

তুলনামূলকভাবে মুক্ত গণমাধ্যম নাগরিকদের নির্বিঘ্নে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে এবং সমাজে চ্যালেঞ্জ নিয়ে সরকারকে অবহিত করে'।

চীনে গণতন্ত্র বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। তাই প্রকৃত সত্য প্রকাশ্যে আসে না। সরকারের বক্তব্যও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ সেখানে গণমাধ্যমের কোনও স্বাধনীতা নেই। মুক্তি গণমাধ্যম ছাড়া প্রকৃত সত্য জানাও সম্ভব নয়। তাই গালোয়ান সংঘর্ষে পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ চার চীনা সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও সেটি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

গত জুনের সংঘর্ষ নিয়ে ভারতীয় সেনাকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অনেক আগেই প্রকৃত সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু ঘটনার ৮ মাস পর মাত্র চার সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করে চীনা ফের দুনিয়াকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

ভারতীয় সেনার নর্দান কমান্ডের সেনাধ্যক্ষ আগেই জানিয়েছিলেন, গালোয়ান সংঘাতে চীনের এক ব্যাটেলিয়ন কমান্ডারসহ অন্তত ৬০ জন প্রাণ হারিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, গালোয়ানে প্রাণ হারিয়েছে ৩৪ জন চীনা সেনা। অথচ, ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত সংঘাতে চীনা সেনা মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে নিয়ে কোনও আপত্তি করেননি।

রুশ সংবাদ সংস্থা তাস চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, '২০২০-র মে ও জুন মাসে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের সংঘর্ষে ভারতের ২০ এবং চীনের ৪৫ জন সেনা নিহত হয়।' সংঘাতে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে। তবে চীন যে নিজের দেশে নিহত সৈনিকদের তথ্য গোপন করতে চাইছে, সেটা এতোদিনে সকলেই বুঝে গিয়েছেন।

ঘটনার পরই ভারত কিন্তু স্বীকার করে নেয়, তাদের ২০ জন সেনা শহিদ হয়েছে। নিহত সেনাদের শহিদের মর্যাদা দিয়ে তাদের পরিবারের উপস্থিতিতেই ফৌজি রীতি মেনে শেষ কৃত্য করা হয়।  গালোয়ানে নিহত কর্নেল সন্তোষ বাবুকে দেওয়া হয় মরনোত্তর মহাবীর চক্র সম্মান। ৫ ভারতীয় সেনা পান মরনোত্তর বীর চক্র। কর্তব্যরত অবস্থায় সেনাদের আত্মত্যাগকে শহিদের সম্মান জানিয়েছে ভারত। তাছাড়া ভারতের স্বাধীন গণমাধ্যমও তুলে ধরেছে প্রকৃত সত্যকে। সত্য গোপনের কোনও চেষ্টা ভারত করেনি। ভারতের সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাই প্রকৃত সত্যকে সামনে নিয়ে আসে।

ভারতের সঙ্গে চীনের আসলে কোনও তূলনাই চলেনা। প্রথমে তো তারা স্বীকারই করতে চায়নি পিএলএ-র কারও মৃত্যুর কথা। আট মাস পরে স্বীকার করলেও তাদের কথা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। ভারতীয় সেনার হাতে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা গোপন করছে চীন। সেদেশের মানুষ অবশ্য সরকারি বক্তব্যকে বিশ্বাস করেনা। সামাজিক গণমাধ্যমে তারা নিজেদের অবিশ্বাসের কথা প্রকাশও করছেন। নিহত চীনা সেনাদের প্রতি কমিউনিস্ট সরকারের মনোভাব চীনের সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। সামাজিক গণমাধ্যমে তাঁরা সেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। দাবি উঠছে, সরকার প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করুক। ভারত শহিদ সেনাদের সম্মান জানালেও চীন তাঁদের দেশের সেনাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিটুকুও দিচ্ছে না।

ঘটনার ৮ মাস পর এখন পিএলএ-র মাত্র ৪ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করছে চীন। সরকারি ভাবে চীনের এই স্বীকারোক্তি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। চীনের মানুষ তাই বিশ্বাস করেননি। অনেকেই সামাজিক গণমাধ্যমে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। প্রশ্নকর্তাদের ওপর শুরু হয়েছে দমন-পীড়ন। ব্লগাররা প্রশ্ন তোলায় তাঁদের ধরে ধরে জেলে ভরা হচ্ছে।  

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসছে ব্লগারদের ওপর চীনে রাষ্ট্রীয়  অত্যাচারের ঘটনা। গালোয়ান সংঘর্ষে ভারতীয় সেনার হাতে চীনের হতাহত নিয়ে মন্তব্য করায় পূর্ব চীনের নানজিং শহরে এক ব্লগারকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃত কিউজিমিং-এর বিরুদ্ধে  'ঝগরা বাধানো ও অশান্তিতে মদত' দেওয়ার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ব্লগারদের আসলে কোনো স্বাধীনতাই নেই চীনে। এর আগে কোভিড-১৯ সম্পর্কে চীনের তথ্য গোপন করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেও জেলে যেতে হয়েছে বহু ব্লগারকে।

ভারতীয় জওয়ানদের হাতে মাত্র চার চীনা সৈনিকের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে এখন আবার অন্য সাফাই গাইছে চীন। তাদের সরকারি গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, 'বর্তমান নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠভাবে সফল করতেই চীন আন্তরিকভাবে উদারতার পরিচয় দিয়েছে।' কিন্তু এটা সত্যের অপলাপ মাত্র। কারণ গালোয়ানে ভারতীয় সেনার হাতে অনেক বেশি পিএলএ সদস্য প্রাণ হারায়। এখন ভারতের সঙ্গে সমঝোতা করার আছিলায় দেশের মানুষের কাছে সত্যকে লুকোতে চাইছে চীন।

ভারতের ২০ জন সেনার আত্মত্যাগ করলেও চীনের মাত্র ৪ জন আত্মত্যাগ করেছে, এই তথ্য তুলে পিএলএ-র বীরত্ব জাহির করতে চাইছে তারা। কারণ বাস্তব পরিস্থিতি মোটেই চীনা ফৌজের ইমেজ-বর্ধক নয়। আসলে চীনের গণ মুক্তি ফৌজ বা পিএলএ মোটেই যুদ্ধবাজ হিসাবে পরিচিত নয়। ১৯৬২-র যুদ্ধ জয়কেই তারা এখনও ফুলিয়ে-ফাপিয়ে প্রচার করে চলেছে। কারণ আর কোনও যুদ্ধে জিততে পারেনি পিএলএ। বরং খুব খারাপ ভাবে হারার অভিজ্ঞতা রয়েছে সাবেক সোভিয়েত রাশিয়া ও ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে।

গালোয়ান সংঘাতের সময়কার গ্লোবাল টাইমস-এর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে চীন প্রথম থেকেই দেশবাসীকে অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করেছে। গত বছর ২৪ জুন সংখ্যায় তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, 'চীনা সামরিক বাহিনী নিহতদের সংখ্যা নিয়ে কিছুই জানায়নি। বোঝাই যায় এই সমীচীন পদক্ষেপ দুদেশের জনগণকে, বিশেষ করে ভারতীয়দের উত্তেজিত না করার জন্যই নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানানো হবে। দেশবাসী বীর যোদ্ধাদের সম্মান জানানোর সুযোগ পাবেন।'

এর থেকেই তো বোঝা যায় গালোয়ানে মৃতের সংখ্যা গোপন করার চেষ্টা করেছিল চীন। জনরোষের চীনা ভয়ের কারণটাও সকলেরই জানা। তারা কোনও মহত উদ্দেশে ভারতীয় জনগণকে ভয় পাচ্ছে, এমনটা নয়। তাছাড়া  নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়া তো এখনও শেষ হয়নি। প্যাংগং তসো ছাড়া বাকি সব সেক্টরেই ঝামেলা রয়েছে। এই অবস্থায় জনরোষকে ভয় পাচ্ছে চীন! আসলে চীনা ফৌজের দক্ষতা ও বীরত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে খোদ কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেই। তাই লালফৌজের পরাজয় হোপন রেখে জনরোষকে প্রতিহত করার চেষ্টায় মত্ত কমিউনিস্ট সরকার।

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর