শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৩ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৩ ০০:০০

শোক শ্রদ্ধায় বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ

শোক শ্রদ্ধায় বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ

একাত্তরের গণহত্যার বিচারহীনতা থেকে মুক্তির স্বাদে উজ্জীবিত হয়ে নতুন এক প্রেরণার মধ্যে যথাযোগ্য মর্যাদায় গতকাল ১৪ ডিসেম্বর জাতি পালন করেছে ৪৩তম শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। যথারীতি শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়েছে ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার প্রক্রিয়ায় একাত্তরের কসাই খ্যাত জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ায় এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসটি আলাদা মাত্রা পায়। শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে মিরপুর ও রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ঢল নামে লাখো মানুষের। তাদের কণ্ঠে ছিল দৃপ্ত প্রত্যয় আর '৭১ সালের বাকি নরপিশাচদের বিচার ও রায়ের কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি।

কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাজধানীর ভোরের সূর্য তখনো স্বমহিমায় প্রস্ফুটিত হয়নি। তার আগেই দলে দলে বিভিন্ন ব্যানারে লাখো মানুষ উপস্থিত হন মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। তারা শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় স্মরণ করেন বাঙালির নক্ষত্র সন্তানদের। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে দলে দলে ছুটে যান মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, বিভিন্ন পেশাজীবী, সংস্কৃতি কর্মী, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী আর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের স্বজনরা। সবার মুখে মুখে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে 'সব ঘাতকের ফাঁসির দাবি'। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে ৪২ বছর ধরে জাতির ললাটে লেপ্টে থাকা কলঙ্ক তিলক মোচন করার দাবি যেন অভিন্ন ঝঙ্কার তুলে। স্বজন হত্যার বিচার পাওয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তান-সন্ততি-আত্দীয়দের মনে ছিল স্বস্তি। বাকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারেও তারা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

সকাল ৬টা ৫১ মিনিটে প্রথম স্মৃতিসৌধে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর দুই মিনিট পর আসেন রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সঙ্গে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন বেদিতে। পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ শেষে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও কথা বলেন। সকাল ৬টা ৫৮ মিনিটে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী ফুল দিয়ে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর পর মন্ত্রিসভার সদস্যরা শহীদের শ্রদ্ধা জানান। আরও শ্রদ্ধা জানানো হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। এ সময় দলের কেন্দ্রীয় নেতারা শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন।

'শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস' উপলক্ষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে তিনি দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক প্রমুখ। বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, জনমতকে উপেক্ষা করে বর্তমান সরকার একতরফা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কেবলমাত্র নিজেদের দাম্ভিকতা ধরে রাখতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তাদের বিজয়ী ঘোষণা ইতিহাসের ন্যক্কারজনক ঘটনা।

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ : শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হয় সর্বসাধারণের জন্য। সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আরও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, জাতীয় কৃষক লীগ, জাতীয় পার্টি জেপি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাসদ, দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, রাশেদ খান মেনন এমপির নেতৃত্বে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, আ স ম রবের নেতৃত্বে জেএসডি, কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বে এলডিপি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট, মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), বাংলাদেশ যুবমৈত্রী, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, নজরুল ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিকা, জাতীয়তাবাদী যুবদল, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, জাসদ ছাত্রলীগ, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল_ বাসদ (মাহবুব), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ আইনজীবী সমিতি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), গণফোরাম, বাসদ (খালেকুজ্জামান), একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমর্ূল কমিটি, ইডেন মহিলা কলেজ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), বুয়েট শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে জনতার ঢল : ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল মানুষের ঢল নামে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পুণ্য স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা জনসাধারণের ভিড়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমির চারপাশ লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। ফুলে ফুলে ঢেকে যায় সমগ্র স্মৃতিসৌধ চত্বর।

ভোরে নৌ-পরিবহন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খান মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এর পর আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগসহ দলের সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায়। এর আগে অন্যান্য বছরের মতোই রাত ১২টা ১ মিনিটে মোমবাতি প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সূচনা হয়। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক যুবলীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এই কর্মসূচির সূচনা করেন। সব বয়সের মানুষের হাতে মোমবাতির দ্যুতিতে আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে সমগ্র বধ্যভূমি এলাকা। এ সময় জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, বাঙালি জাতিকে যে শকুনেরা ধ্বংস করে দিতে চায় আজ তারা আবার হামলা শুরু করেছে। এদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সের মানুষের ভিড় ক্রমশই বাড়তে থাকে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকায় সবাই সুশৃঙ্খলভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সকাল সাড়ে ৯টায় বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে সৌধের সামনের রাস্তায় মানববন্ধন করে প্রজন্ম একাত্তর। সৌধের পাশে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সংবাদপত্র, আলোকচিত্র এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহার্য সামগ্রীর এক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। একপাশে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের উদ্যোগে বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ ঠিক কি ঘটেছিল তার প্রতীকী উপস্থাপনার আয়োজন করা হয়।

 

 


আপনার মন্তব্য

Bangladesh Pratidin

Bangladesh Pratidin Works on any devices

সম্পাদক : নঈম নিজাম,

নির্বাহী সম্পাদক : পীর হাবিবুর রহমান । ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট নং-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট নং-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত। ফোন : পিএবিএক্স-০৯৬১২১২০০০০, ৮৪৩২৩৬১-৩, ফ্যাক্স : বার্তা-৮৪৩২৩৬৪, ফ্যাক্স : বিজ্ঞাপন-৮৪৩২৩৬৫। ই-মেইল : [email protected] , [email protected]

Copyright © 2015-2020 bd-pratidin.com