শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২২:৪৭

নদী বাঁচাও ১২

নবগঙ্গা এক ধানখেত

শেখ রুহুল আমিন, ঝিনাইদহ

নবগঙ্গা এক ধানখেত

যৌবন হারিয়েছে একসময়ের খরস্রোতা নবগঙ্গা। আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নবগঙ্গার মতোই হারিয়ে যাচ্ছে ঝিনাইদহের ১৫টি নদী। প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় তলদেশ ও দুই পাড় ভরাট হয়ে গভীরতা কমে নদী মরা খালে পরিণত হচ্ছে। ফলে নদীবক্ষে চলছে ধান ও সবজির চাষাবাদ। এদিকে প্রভাবশালীদের হাতে চলছে নদী দখলের মহোৎসব। অনেকেই নদীর ভিতর গড়ে তুলেছেন দোকান, ঘরবাড়ি। এতে এলাকায় সংকট দেখা দিচ্ছে দেশি জাতের মাছের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নবগঙ্গা, কালী, কুমার, ডাকুয়া, চিত্রা, বেগবতী (ব্যাঙ), কপোতাক্ষ, ফটকি, ভৈরবসহ ১৫ নদ-নদী এরই মধ্যে অনেকটা বিলীন হয়ে গেছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নবগঙ্গা, বেগবতী ও ফটকি নদী। এর মধ্যে শহরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত নবগঙ্গা। এ নদীর জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বড় বড় ভবন। নদীর জায়গা দখল করে এইড ফাউন্ডেশন নামে এক এনজিও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে বিলাসবহুল রিসোর্স সেন্টার। শহরের ধোপাঘাটা ব্রিজের কাছে নদীর জায়গা মাটি দিয়ে ভরাট করে পাকা বাড়ি নির্মাণ ও গাছের বাগান করা হয়েছে। একইভাবে শহরের চাকলাপাড়ায় চঞ্চল আহমেদ, বাবু জোয়ার্দ্দারসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নদীর জায়গা দখল করে বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। আর হরিণাকুন্ডু উপজেলার ভাতুড়িয়া গ্রামের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত নবগঙ্গা নদীতে ইরি ধানের আবাদ করা হচ্ছে। হামিরহাটি-যাদবপুর গ্রামের অনেক কৃষক ভুয়া লিজের নামে নদী দখল করে ঘরবাড়ি তৈরি ও চাষ করে নদী হত্যার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। এসব দেখার যেন কেউ নেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতিবিজড়িত ঝিনাইদহ সদর উপজেলার যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বিষয়খালী বাজার। এ বাজার গড়ে উঠেছে বেগবতী নদীর পাশে। ঐতিহাসিকভাবে এ নদীর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কালের বিবর্তনে এখন এ নদী মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীর জায়গা দখল করে মার্কেট ও বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। নদীবক্ষে চলছে ধান চাষ। একইভাবে সদর উপজেলার হাজিডাঙ্গার ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদীতেও ধান চাষ করা হচ্ছে। হাজরা গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত চিত্রা নদীর অর্ধেক জায়গা এলাকার প্রভাবশালীরা ৯৯ বছরের লিজের কথা বলে দখল করে পুকুর করেছেন। সেখানে চাষাবাদও করা হচ্ছে। এ অবস্থা কোটচাঁদপুর উপজেলার সীমানায়ও। কালীগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদীর জায়গা দখল করে দোকান ও বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মহেশপুর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কপোতাক্ষ, ভৈরবা, ইছামতী, কোদলা ও বেতনা। কোদলা নদীর জায়গা দখল করে বড় বড় পুকুর তৈরি করা হয়েছে এবং ধান চাষ করা হচ্ছে। একইভাবে কালীগঞ্জ ও কোটচাঁদপুর উপজেলার ওপর দিয়ে গেছে বুড়া ভৈরব নদ ও  বেগবতী (ব্যাঙ) নদী। এ নদ-নদীর জায়গা দখল করেছেন এলাকার ৫৩ দখলদার। তারা মার্কেট, বাড়িসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। দুই পাড়ের জায়গা দখল করে ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। অনুরূপভাবে শৈলকূপা উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে গড়াই ও কালী নদী এবং কুমার নদ। নদীবক্ষ থেকে মাটি ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের হিড়িক পড়েছে। এ নদীর দুই ধারের জায়গা দখল করে বাড়ি, মার্কেট ও বিভিন্ন স্থানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি নদীর ভিতর থেকে মাটি কেটে ভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে এবং অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু। কুমার নদের শৈলকূপা অংশের জিন্না আলম ডিগ্রি কলেজ এলাকা, বারইপাড়া এলাকা, কবিরপুর, বিজুলিয়া, ফাদিলপুর অংশসহ বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে বড় বড় চর। শুধু কুমার নদ নয়, জেলার সব নদীরই একই অবস্থা। এসব জেগে ওঠা চরে চলছে কলাই, মসুর, পিয়াজসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ। খননের অভাবে জেগে ওঠা চরে চরানো হচ্ছে গবাদিপশু। ঝিনাইদহ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত অধিকাংশ নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে চলছে দখলবাজি। মানুষের চাহিদা অনুযায়ী যে যার মতো নদী ব্যবহার করছেন। ঝিনাইদহে কয়েকটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নদ-নদী দখলমুক্ত করতে ইতিমধ্যে জেলা শহরে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। এ ক্ষেত্রে সরকার বা জেলা প্রশাসনের কোনো তদারকিই নেই বলে এসব সংগঠনের অভিযোগ। এ ব্যাপারে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ বলেন, ‘নদীর জায়গা অনেকেই দখল নিয়েছে বলে আমি শুনেছি। বিষয়টি আমি উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছি। নির্দেশ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’


আপনার মন্তব্য