শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:৩০

তৃণমূলে স্বাস্থ্যসেবা

ডাক্তার সংকট দালাল চোরের দাপট

শেরপুর হাসপাতাল

মাসুদ হাসান বাদল, শেরপুর

ডাক্তার সংকট দালাল চোরের দাপট

ডাক্তারের তীব্র সংকট আর দালালের দাপটে চলছে শেরপুর জেলার চিকিৎসা ব্যবস্থা। শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালসহ পাঁচটি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রতিটিতেই বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগে চলছে চিকিৎসক সংকট। সরকারি হিসাব মতে, জেলায় যেখানে চিকিৎসক থাকার কথা ১৩৩ জন সেখানে রয়েছেন মাত্র ৫৭ জন। এর মধ্যে আবার কেউ কেউ বদলির তদবিরে আছেন। কেউ কেউ আবার বিনা নোটিসে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিতে হয় টিকিট। টিকিট যুদ্ধ শেষ করে চিকিৎসক পর্যন্ত পৌঁছতে প্রতি রোগীর সময় লাগে ২-৩ ঘণ্টা। প্রতিজন ডাক্তারকে গড়ে দুই থেকে আড়াইশ রোগী দেখতে হয়। এ অবস্থায় প্রতিজন রোগীকে এক-দেড় মিনিট দেখেই ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়। একে তো ডাক্তার সংকট, তার ওপর আবার দালাল আর চোরের উপদ্রপে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের হয়েছে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। সর্বত্র দালালের দৌরাত্ম্য চলছে। জরুরি বিভাগটি দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। দালাল আর কতিপয় কর্মচারী মিলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এখানে সেবা দেওয়া হচ্ছে। টাকা ছাড়া জরুরি বিভাগে কোনো কাজ হয় না। দালালদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের পরিচয় বহন করে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি সরেজমিন ১৫ মিনিটের মধ্যে অন্তত ১২ জন দালাল মিলেছে, যারা রোগী নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা গেছে, সকাল থেকে সারা রাত শিফটিং করে চলে দালালি পেশা। ডাক্তারের কাছে রোগী পৌঁছার আগেই দালালদের নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রেডি রিপোর্টসহ দালালরা রোগীদের ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। হাসপাতালের ভর্তি রোগীদেরও দালালরা ভাগিয়ে নিয়ে কমিশনের চুক্তিতে নির্ধারিত কিছু সেবা কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছে। দিনে যেমন তেমন রাতে সরকারি দায়িত্বশীল (একমাত্র জরুরি বিভাগে কর্মরত ডাক্তার ছাড়া) তেমন কেউ না থাকায় রাতে হাসপাতাল চলে যায় দালাল আর চোরের নিয়ন্ত্রণে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ২৪ ঘণ্টা প্রসব সংক্রান্ত সিজার করার ঘোষণা দিলেও বিকালের পর এই সেবাটি হাসপাতালে কেউ পাচ্ছে না। ফলে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত সিজার করার প্রয়োজন সংক্রান্ত রোগীদের পটিয়ে নেওয়া হয় প্রাইভেট ক্লিনিকে। এই পটিয়ে নেওয়ার কাজটি হাসপাতালের কতিপয় নার্স ও দালাল মিলেমিশে করে। আবার কোনো কোনো নার্স রোগীকে নিজ বাসায় নিয়ে চিকিৎসা দিয়ে রোগী জিম্মি করে বড় অংকের অর্থ আদায় করেন। বাসায় রোগীর অবস্থা খারাপ হলে সুকৌশলে পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে হাসপাতালে অন্তত ৯০ জন দালাল রয়েছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে কিছু দিন আগে হাসপাতালের আশেপাশের ব্যবসায়ীরা হাসপাতালকে দালালমুক্ত করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। আর চোরের অত্যাচারে হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা থাকে আতঙ্কে। চোখ ফিরালে বিছানা থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে রোগীর জিনিসপত্র। এমন কোনো দিন নেই রোগীদের মোবাইল, টাকা বা মূল্যবান কোনো কিছু চুরি না হচ্ছে। আর দালালরা প্রতিদিন নানা ডাক্তারের কাছে গিয়ে ওষুধের স্লিপ নিয়ে তুলে নিচ্ছে দামিদামি সরকারি ওষুধ। জেলার এই প্রধান সেবা কেন্দ্রটি আড়াইশ শয্যার ঘোষণা করা হলেও ১০০ শয্যার সুবিধা নেই। সরকারি হিসাবে এ হাসপাতালে ৩৬ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ২০ জন। তিনটি পদ থাকলেও একজনও নেই ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার। নেই অর্থোপেডিক, কার্ডিয়াক, সিনিয়র শিশু বিশেষজ্ঞ, ইএনটিসহ, সিনিয়র গাইনি বিশেষজ্ঞ। নষ্ট হওয়ার কারণে আলট্রাসাউন্ড মেশিন, ফিল্ম না থাকার কারণে ডিজিটাল এক্সরে মেশিন বন্ধ হয়ে আছে বেশ কিছু দিন। ইসিজি মেশিন চালানোর লোক নেই। ডাক্তারের জন্য হাসপাতাল প্রশাসন, ড্যাব, স্বাচিব সবাই চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। ফলে হাড় সংক্রান্ত সামান্য জটিলতায়ই যেতে হয় ময়মনসিংহে। এর চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা জেলার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন নিজেই রোগী। ওটা আছে তো ওটা নেই। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার ন্যূনতম সুবিধা না থাকায় জেলা হাসপাতালে প্রতিদিন ওইসব এলাকার মানুষের ঢল নামে। উপজেলা হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ১০ জন, ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭ জন থাকার কথা থাকলেও আছেন ১০ জন, নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৮ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ৭ জন, নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও দায়িত্ব পালন করছেন ১০ জন । এ ছাড়াও প্রতিটি হাসপাতালেই দায়িত্বরত অন্যান্য পদেও রয়েছে জনবলের তীব্র সংকট। জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. নাহিদ কামাল জানিয়েছেন, ডাক্তার সংকটের কারণে চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। দালাল আর চোরদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। জেলার সিভিল সার্জন ডা. রেজাউল ইসলাম জানিয়েছেন, ডাক্তার আনতে চেষ্টা চলছে। চোর ও দালাল নির্মূলে অতিসত্তর প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাওয়া হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর