শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:০৯

আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার

ব্যবসায়ীকে ওই নেতার হাতে তুলে দেয় পুলিশ অভিযোগ স্ত্রীর

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

Google News

গাইবান্ধা আওয়ামী লীগের নেতা মাসুদ রানার বাড়ি থেকে জুতা ব্যবসায়ী হাসান আলীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গতকাল বিকালে থানায় হত্যা মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। ওই মামলায় গ্রেফতার আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গাইবান্ধা সদর থানার ওসি মাহফুজার রহমান মামলা রের্কড ও রিমান্ড মঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে হাসান আলীর (৪৫) স্ত্রীর অভিযোগ- গাইবান্ধা থানায় এক শালিস বৈঠক থেকে পুলিশ ব্যবসায়ী হাসান আলীকে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার জিম্মায় হস্তান্তর করেছিল। সেখান থেকে মাসুদ রানার বাসায় নিয়ে গিয়ে এক মাস ধরে নির্যাতন করে হাসান আলীকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখে। গাইবান্ধা সদর থানার ওসি মাহফুজার রহমান মামলা রের্কড ও রিমান্ড মঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে হাসান আলীর (৪৫) স্ত্রীর অভিযোগ- গাইবান্ধা থানায় এক শালিস বৈঠক থেকে পুলিশ ব্যবসায়ী হাসান আলীকে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার জিম্মায় হস্তান্তর করেছিল। সেখান থেকে মাসুদ রানার বাসায় নিয়ে গিয়ে এক মাস ধরে নির্যাতন করে হাসান আলীকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখে। গাইবান্ধা সদর থানার ওসি মাহফুজার রহমান জানান, গ্রেফতার আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে গাইবান্ধার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. নজরুল ইসলাম চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তিনি বলেন, ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে এই মামলা রুজু করা হয়। মামলার বাদী নিহতের স্ত্রী বিথী বেগম এই মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানাসহ তিনজনকে আসামি করেছেন।  এদিকে হত্যার বিচারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে গাইবান্ধাবাসী। গতকাল রবিবার দুপুরে হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দাদন ব্যবসায়ী জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক মাসুদ রানার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সদর থানার ওসির অপসারণসহ জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবিতে জেলা শহরের ডিবি রোডে ‘গাইবান্ধাবাসী’র ব্যানারে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। বিকালে গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কার্যালয়ে প্রতিবাদ সভা হয়েছে। 

 

অপর দিকে নিহত ব্যবসায়ীকে দাদন ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) রাহাত গাওহারীকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে পুলিশ। দুপুরে নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এ কথা জানান। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন, গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) আবু খায়ের ও পুলিশ পরিদর্শক আবদুল লতিফ মিয়া।

এ ছাড়া অভিযুক্ত মাসুদ রানাকে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে দল থেকে অব্যাহতি প্রদান করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। গতকাল দুপুরে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে তাকে পদ থেকে অব্যাহতি প্রদানের বিষয়টি জানান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক।

এদিকে মানববন্ধন চলাকালে বক্তব্য দেন নিহত হাসান আলীর স্ত্রী বিথী বেগম, ছোট ছেলে হেদায়েতুল ইসলাম, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য আমিনুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সদস্য মিহির ঘোষ, জেলা দোকান মালিক সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মকছুদার রহমান, জেলা জাসদ সভাপতি গোলাম মারুফ, জেলা বারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম বাবু প্রমুখ।

মানববন্ধনে বক্তারা হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দাদন ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার শাস্তি এবং সদর থানার ওসি মাহফুজুর রহমান, সদর থানার ওসি (তদন্ত) মজিবর রহমান, এসআই মোশারফ হোসেনসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান।

নিহতের স্ত্রী বিথী বেগম বলেন, আমার স্বামী মাসুদ রানার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা দাদন নিয়েছিলেন। সেই টাকা সুদাসলে বর্তমানে ১৯ লাখ ছাড়িয়েছে বলে দাবি করেন মাসুদ রানা। ওই টাকার জন্য মাসুদ রানা গত ৫ মার্চ লালমনিরহাট থেকে আমার স্বামীকে গাইবান্ধায় আনে। পরে তিনি তাকে নিজ বাসায় গাইবান্ধার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামে আটকে রাখেন। এরপর টাকার জন্য তিনি আমার স্বামীকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং নানা ধরনের হুমকি দেন। এসব নির্যাতনের কথা মোবাইল ফোনে জানতে পেরে স্বামীকে উদ্ধারের জন্য গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করি। পরে সদর থানার ওসি (তদন্ত) মজিবর রহমান ও উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোশারফ হোসেন এবং একজন অজ্ঞাত পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ রানার বাড়ি থেকে আমার স্বামীকে সদর থানায় নিয়ে আসেন। পরে আমাদের উপস্থিতিতে ওসি (তদন্ত) মজিবর রহমান আমার স্বামীকে আমার জিম্মায় না দিয়ে মাসুদ রানার পক্ষ গ্রহণ করেন। তিনি মাসুদ রানার টাকা ফেরত দিতে বলেন এবং আমাকে ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে বলেন। আমি তাতে সম্মত না হলে পরিদর্শক মজিবর আমার স্বামীকে মাসুদ রানার জিম্মায় দেন। এরপর দলীয় ক্ষমতার দাপটে মাসুদ রানা আমার স্বামীকে এক মাস আটকিয়ে রেখে চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকে। আমি অনেকভাবে চেষ্টা করেও আমার স্বামীকে উদ্ধারে ব্যর্থ হই। অতঃপর ৯ এপ্রিল রাতে আমার স্বামীকে নির্যাতন করে হত্যা করে বাসায় ঝুলিয়ে রাখে। মাসুদ রানা ও তার সহযোগীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করেছে।   

মাসুদ রানার হাতে নিহত ব্যবসায়ী হাসানকে তুলে দেওয়া প্রসঙ্গে গাইবান্ধা সদর থানার ওসি (তদন্ত) মজিবর রহমান বলেন, ওসি সাহেবের নির্দেশে উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোশারফ হোসেন মাসুদ রানার বাড়ি থেকে মাসুদ রানা ও হাসান আলীকে থানায় নিয়ে আসি। তারা সালিশ দরবার করে। কিন্তু হাসানকে মাসুদ রানার হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার ওসি মাহফুজার রহমান বলেন, পুলিশ মাসুদ রানার হাতে হাসান আলীকে তুলে দেয়নি। থানা চত্বরে সালিশ বৈঠকের পর হাসান আলী, তার স্ত্রী বিথী বেগম ও মাসুদ রানাসহ উভয়পক্ষের লোকজন একসঙ্গে পায়ে হেঁটে থানা থেকে বেরিয়ে যান। এরপর তারা কী করেছে, পুলিশ তা জানে না। 

গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, নিহত হাসান আলীকে দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানার হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় সদর থানার কোনো কর্মকর্তা জড়িত কিংবা তাদের গাফিলতি আছে কি না তা তদন্তে গত শনিবার ঘটনার দিনই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।