বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

ঝুঁকিতে ঐতিহ্যবাহী পরীর পাহাড়

বড় প্রাণহানির শঙ্কা, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টও, বেলেমাটির পাহাড়ে ৩ শতাধিক স্থাপনা, ১৩৫টিই অবৈধ, নতুন ভবন স্থাপন নিয়ে আইনজীবী সমিতি-প্রশাসন মুখোমুখি

আরাফাত মুন্না, চট্টগ্রাম থেকে

ঝুঁকিতে ঐতিহ্যবাহী পরীর পাহাড়

দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম মহানগরের প্রাণকেন্দ্র পরীর পাহাড়। ব্রিটিশ আমল থেকেই জেলার সব প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় এখান থেকেই। প্রশাসনিকভাবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ এ পাহাড়, এর ইতিহাস-ঐতিহ্যও অনেক। তবে কালে কালে সংকুচিত হয়ে পড়েছে পরীর পাহাড়। প্রায় ১২ একরের বেলেমাটির এ পাহাড়ে প্রতিনিয়তই গড়ে উঠছে সুউচ্চ ভবন। রয়েছে ছোট বড় ৩ শতাধিক স্থাপনা। এসবের মধ্যে ১৩৫টিই অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একের পর এক গড়ে ওঠা অবৈধ এসব স্থাপনার ভারে যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে প্রত্নতাত্তি¡ক নিদর্শনবাহী এ পাহাড়টি। স্থানীয়দের দাবি, এ পাহাড়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানি সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরের এ বিখ্যাত পাহাড়ের চূড়ায় একসময় ছিল চাকমা রাজার ভবন। সেখানে বসত গানের আসর। তা নিয়ে নানা উপকথাও তৈরি হয় লোকমুখে। স্থানীয় লোকজন বলতেন, সে পাহাড়চূড়ায় পরীরা গান গায়, নেচে বেড়ায়। এমন কাহিনির সূত্র ধরে পাহাড়টির নাম হয়েছিল পরীর পাহাড়। ইংরেজ সাহেবদের কাছে ফেয়ারি হিল নামে পরিচিত এ পাহাড় ইংরেজ আমলেই চট্টগ্রাম বিভাগ ও জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এ পরীর পাহাড়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, নতুন আদালত ভবন, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন এবং আইনজীবী সমিতির পাঁচটি ভবনসহ বেশ কিছু সরকারি কার্যালয় রয়েছে। চারপাশে অপরিকল্পিত ও অনুমোদনহীন শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া রাস্তার দুই পাশে গাড়ি পার্কিং, বিভিন্ন দোকানপাট, খাবার হোটেল, কম্পিউটার দোকান, এমনকি কাঁচাবাজারও রয়েছে। কর্মদিবসে জনসমাগমে মনে হয় বড় কোনো ব্যস্ত বাজার। এমন কোলাহল আর অনিয়মে গড়ে ওঠা নানা স্থাপনার ভিতর পাহাড়ের সৌন্দর্য কিংবা আদালত ভবনের প্রাচীন স্থাপত্য চিহ্নের মর্যাদা রক্ষা করা কঠিন। সম্প্রতি আইনজীবী সমিতির দুটি ভবন নির্মাণের টেন্ডার বিজ্ঞপ্তির পর পরীর পাহাড় আবারও আলোচনায় এসেছে। গতকাল সরেজমিনে পরীর পাহাড়ে গিয়ে জেলা আইনজীবী সমিতিরই দুটি ১২ তলা ভবনে বেশ কয়েক জায়গায় ফাটল দেখা গেছে। এ ছাড়া আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনের অতি সরু সড়ক দখলে রেখেছেন হকাররা। কার্যদিবসে ২৫-৩০ হাজার মানুষের সমাগম হওয়া এ পাহাড়ে ছোট দুর্ঘটনা সামলাতেও ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে বড় বেগ পেতে হতে পারে। এসব কারণে আইনজীবী সমিতি ভবনগুলোর ঠিক পেছনে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম কার্যালয় এবং ভল্টও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সমিতির ভবনে ফাটল থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ভবনের লিংক রোড দিয়েও হাঁটতে ভয় পান কর্মকর্তারা। তারা বলেন, যেভাবে ফেটে আছে স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পেই এসব ভবন ধসে পড়তে পারে। এদিকে পরীর পাহাড়কে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করতে সম্ভাব্যতা যাচাই করবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে তিনজন কর্মকর্তা নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর এ কমিটি পরীর পাহাড় পরিদর্শন করবে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সাবেক সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আইনজীবী সমিতির ভবনগুলো মিলিয়ে পরীর পাহাড় পুরোটা দখল হয়ে গেছে। পাহাড় রক্ষার কোনো আইনই এখানে মানা হয়নি। এজন্য ১৯৯৮ সাল থেকে এ পাহাড় রক্ষায় আমরা আন্দোলন করে আসছি।’ আইনজীবী সমিতির নতুন ভবন ইস্যু : জানা গেছে, ১৯৭৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতির নির্দেশে আইনজীবী সমিতিকে ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ জায়গা দলিলমূলে বরাদ্দ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এরপর এ জমির কোনো খতিয়ান বা হোল্ডিংও করেনি। এমনকি কোনো খাজনাও পরিশোধ করেনি আইনজীবী সমিতি। দলিলমূলে বরাদ্দ জমির বাইরেও অবৈধভাবে আরও ১ একর ৩৭ শতাংশ সরকারি খাসজমি দখল করে নিয়েছে সমিতি। সেখানে তাদের পাঁচটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যার একটিরও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেই। যদিও আইনজীবী সমিতির দাবি, তারা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনুমোদন নিয়ে ভবনগুলো নির্মাণ করেছে। তবে ২০১৭ সালে সেই সিডিএই জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে অননুমোদিতভাবে দুটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যা অপসারণ করতেও সুপারিশ করা হয়। এরই মধ্যে ২৫ আগস্ট ফের অনুমোদন না নিয়েই আইনজীবী সমিতি আরও দুটি ভবন নির্মাণের দরপত্র আহ্‌বান করেছে। এতে আপত্তি জানায় জেলা প্রশাসন। এ নিয়ে আইনজীবী সমিতি ও জেলা প্রশাসনের দ্ব›েদ্বর মধ্যে পরীর পাহাড়ে নতুন করে স্থাপনা নির্মাণ না করা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি তাতে সায় দেন। এ পাহাড়ে আর কোনো স্থাপনা হবে না বলে জানিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়, পাহাড় শ্রেণির জমিতে ইতিমধ্যে স্থাপিত সম্পূর্ণ অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল স্থাপনাসমূহ অপসারণ করা এবং চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি যেন আবারও অবৈধভাবে খাসজমি দখল করে কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনের একমাত্র ফাঁকা জায়গাটিতে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা গ্রহণপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন ও বিচার বিভাগকে সদয় নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে। এদিকে সমিতি ভবন নির্মাণ ইস্যুতে পরিবেশ অধিদফতর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর চটগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এ পাহাড় পরিদর্শন করে পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল। অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে ছয়টি মতামত দিয়েছে পরিদর্শক দল। এতে বলা হয়- টিলা শ্রেণির ভূমিতে নির্মাণকাজ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুসারে ছাড়পত্র গ্রহণ অপরিহার্য হলেও তা এ ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়নি। জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি দেখার জন্য বলেছেন। আগামী রবিবার চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দকে মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে বলে তিনি আশা করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোমিনুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পরীর পাহাড় প্রশাসনিক ও বিচারিক কার্যক্রমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। অবৈধ দখল, অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কারণে পাহাড়টি চরম ঝুঁকিপুর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনেও তা উঠে এসেছে। তা ছাড়া পাহাড়ের পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সেজন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ঐতিহ্যবাহী পরীর পাহাড়কে সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নতুন নির্মাণাধীন ভবন দুটির জন্য সিডিএসহ সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, আমাদের সীমানার মধ্যেই আমরা এটি নির্মাণ করছি। আমরা এ নির্মাণ থেকে পিছপা হব না।’

ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনে ধসের ঝুঁকি : ১৯ সেপ্টেম্বর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পরীর পাহাড় এলাকাকে ভূমিধসের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে ভূমিধস ও ভবনধসের ঝুঁকির বিষয়ে সাতটি সুপারিশ উঠে আসে। প্রতিবেদন বলা হয়- আইনজীবী সমিতির শাপলা ভবনের পেছন দিকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত পাশাপাশি দুটি ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, যা ভূমিকম্প ও ভূমিধসের সময় ভবনধস বা হেলে পড়তে পারে।

ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট কার্যালয় : এ পাহাড়ে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট, যা কেপিআইভুক্ত রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা অনুসারে কেপিআইসমূহের সীমানাপ্রাচীর থেকে ২০ মিটারের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণে অনুমোদন আবশ্যক। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট ভবনের ১০ মিটারের মধ্যেই আইনজীবী সমিতির একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। সরেজমিন পরিদর্শনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এখানে ভল্টের নিরাপত্তাসহ নানা বিষয় রয়েছে। কিন্তু আইনজীবী সমিতির ভবনগুলো ব্যাংকের দেয়াল ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। যার দূরত্ব অনেক জায়গায় ১০ মিটারেরও কম। এখন আরও দুটি ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষসহ জেলা প্রশাসনকে আমরা বিষয়টি জানিয়েছি। চার সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।’ এ কমিটির প্রতিবেদনে মোটা দাগে ছয়টি ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর মধ্যে আইনজীবী সমিতি শাপলা ভবনের লোডিংয়ের প্রভাবে ব্যাংকের রিটেইনিং ওয়ালের কলামে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অতি ভারী বৃষ্টিপাতে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। শাপলা ভবনের পেছন দিক থেকে দুটি ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে, যা ভূমিকম্প বা ভূমিধসের সময় ভবনটি ধসে বা হেলে পড়তে পারে। তাই কেপিআই নীতিমালা অনুসরণ করে ভল্টের নিরাপত্তাসহ সৃষ্ট ঝুঁকি নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অনুরোধ করা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর