Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২২ মে, ২০১৯ ০৮:৩৩

ইতালির খুব কাছে গিয়েই ইঞ্জিন বন্ধ

নৌকা ভেসে ফের মাঝ সাগরে গিয়ে যায় ডুবে, ফিরলেন বেঁচে যাওয়া ১৫ বাংলাদেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইতালির খুব কাছে গিয়েই ইঞ্জিন বন্ধ
প্রতীকী ছবি

ভূমধ্যসাগরে তিউনিসিয়া উপকূলে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবির ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ১৫ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। গতকাল ভোর সাড়ে ৬টার দিকে তাদের বহনকারী টার্কিশ এয়ারলাইনসের বিমানটি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইএমও) তত্ত্বাবধানে এবং রেড ক্রিসেন্টের সহযোগিতায় তারা দেশে ফেরেন। তবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। নৌকায় থাকা বাংলাদেশিরা জানান, তারা ইতালির উপকূলে চলে গিয়েছিলেন। উপকূলের কাছাকাছি যাওয়ার পর তাদের নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তারা স্রোতে ভাসতে ভাসতে ফের মাঝসমুদ্রে চলে আসেন। নৌকাটি একপর্যায়ে ডুবে যায়। তখন তিউনিসিয়ার নেভি ও জেলেরা এই ১৫ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেন। রেড ক্রিসেন্ট তাদের চিকিৎসা দেয়। আইএমও তাদের দেশে ফেরাতে কাজ শুরু করে। বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশিদের একজন নিজে বাঁচলেও চোখের সামনেই অনেক সহযাত্রীকে ডুবে মরতে দেখেছেন। তিনি নিজেও ঠান্ডাপানিতে ডুবে মরার উপক্রম হয়েছিলেন। তারপর একদল জেলে এসে            তাকে উদ্ধার করেন। তিনি বলেন, ‘বেঁচে থাকার সব আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপর আল্লাহ যেন আমাদের বাঁচাতে জেলেনৌকা পাঠালেন। তিউনিশিয়ার জেলেরা যদি আমাদের দেখতে না পেতেন, তাহলে আমরা জীবিত থাকতে পারতাম না। কখনোই এই নৌকাডুবির ঘটনা জানতে পারতাম না।’ তার বর্ণনানুযায়ী, ‘ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। মুহূর্তেই মানুষগুলো বাঁচার জন্য ছটফট করতে করতে করতে ঠান্ডাপানিতে ডুবে মারা গেল। নষ্ট নৌকাটি ভাসতে ভাসতে যখন সাগরের মাঝখানে চলে আসে, তখন তা একপর্যায়ে কাত হয়ে উল্টে যায়। ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে আমরা সবাই হুড়োহুড়ি করে নৌকাটি ধরে রাখার চেষ্টা করি। একজন আরেকজনের ওপর উঠে নৌকাটি ধরে রাখার চেষ্টা করি। কেউ কেউ একজন আরেকজনের ঘাড়ে ভর করে বাঁচার জন্য মাথা পানির ওপর ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। প্রথমে একজন আরেকজনকে বাঁচাতে জড়াজড়ি করেও ধরে রাখে। বেশি পানিতে সাঁতার কেটে ভেসে থাকার লড়াইটা যখন আর চালানো যাচ্ছিল না, যখন মনে হচ্ছিল দম ফুরিয়ে আসছে, ঠিক তখন আরেকজনকে কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে একাই বাঁচার চেষ্টা করি। কিছু সময় পর দেখি আমার চেয়ে কম ওজনের যে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, সে পানির মধ্যে একাই ছটফট করতে করতে একসময় নিস্তেজ হয়ে পানিতে তলিয়ে যায়।’ তাদের উদ্ধারের পর তিউনিশিয়ার উপকূলীয় শহর জারজিসে রেড ক্রিসেন্টের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়।

এর আগে তারা লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলের জুয়ারা শহর থেকে রওনা হন। উন্নত জীবনের আশায় তিনিসহ সবাই ইউরোপের পথে পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন দালালদের মাধ্যমে। পরিবরের জমিজিরাত বিক্রি করে তিনি দালালের হাতে এ জন্য তুলে দিয়েছিলেন সাত হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ।

ফিরে আসা এই ব্যক্তিদের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এরপর তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা জানায় পুলিশ। ১১ মে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবির ঘটনায় ৩৯ বাংলাদেশি নিখোঁজ থাকার কথা জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি ১৫ জনকে জীবিত উদ্ধার হওয়ার কথাও জানানো হয়। তিউনিশিয়ার রাজধানী তিউনিশের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নৌকাডুবির ঘটনার পর স্থানীয় জেলেরা উদ্ধার তৎপরতা চালান। এর আগে ৯ মে মধ্যরাতে লিবিয়া থেকে যাত্রা করা দুটি নৌকার একটিতে ১৫০ জন যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ১৩০ জন বাংলাদেশি। নৌকা দুটির একটি নিরাপদে ইতালিতে পৌঁছালেও ৭০-৮০ জন যাত্রী থাকা অন্যটি ভূমধ্যসাগরে ডুবে যায়। নৌকায় থাকা এসব বাংলাদেশি প্রায় চার মাস আগে লিবিয়ায় যান। তারা বাংলাদেশ থেকে প্রথমে বাসে করে কলকাতায় যান। সেখান থেকে বিমানে দিল্লি এবং দিল্লি থেকে শ্রীলঙ্কায়। কয়েক দিন শ্রীলঙ্কায় থাকার পর তুরস্কের ইস্তাম্বুল হয়ে লিবিয়ার ত্রিপোলি যান।


আপনার মন্তব্য