শিরোনাম
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০১:২৬
আপডেট : ২২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০১:৩৩
প্রিন্ট করুন printer

‘শোক নয়, প্রতিশোধ নিবো আজ; ঘুমাও শান্তিতে শাজাহান সিরাজ’

এ বি এম জাকিরুল হক টিটন

‘শোক নয়, প্রতিশোধ নিবো আজ; ঘুমাও শান্তিতে শাজাহান সিরাজ’

আজ ২২শে ডিসেম্বর। মতিহারের মহাপ্রাণ শহীদ শাহজাহান সিরাজের ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৪ সাসের ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ দেশব্যাপী ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘটের ডাক দেয়। সেই ধর্মঘট আন্দোলনের বেগে হরতালে রুপ নেয়। সেই ধর্মঘট সফল করতে সেই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারা একাধিক ভাগে ভাগ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন, কাগলা গেট এলাকায় অবস্থান নেয়। তবে ক্যাম্পাসের সকল সংগঠনের মূল নেতারা ভোরের আলো ফোটার আগেই অবস্থান নেয় রাবি স্টেশনে। তারপর শুরু হয় কুয়াশা ভেজা মিছিল। তার কিছুক্ষণ পর রাজশাহী শহরের দিক থেকে বিডিআর ভর্তি ট্রেন আসে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে। বিডিআর’রা এসেই আমাদের আগের রাতের দেওয়া ব্যারিকেডগুলো লাইন থেকে সরিয়ে নিতে বলে। তখন মিছিলের সামনে থেকে ওদের সাথে কথা বলার জন্য এগিয়ে যায় তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সম্মেলন প্রস্ততি কমিটির আহ্বায়ক শাহজাহান সিরাজ। বিডিআর’রা উনার সাথে কথা বলার উদ্যোগ না নিয়ে বলতে থাকে লাল শার্ট’ওলাকে ‘ফায়ার’ ‘ফায়ার’। সঙ্গে সঙ্গে বিডিআর শাহজাহান ভাই এর লাল শার্টকে টার্গেট করে গুলি ছোঁড়ে। শাহজাহান ভাই বুকে বুলেট বিদ্ধ হয়ে স্টেশনে লুটিয়ে পড়েন। পরের গুলি সোহরাওয়ার্দী হলের তিন তালার বারান্দায় বিদ্ধ হয় পত্রিকার হকার আব্দুল আজিজের মাথায়। হকার আজিজ ওখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ছাত্রদের রক্তের সাথে শ্রমিকদের রক্ত একই ধারায় প্রবাহিত হয়। আর তাই ২২ ডিসেম্বরকে ঘোষণা করা হয় "ছাত্র-শ্রমিক সংহতি দিবস " হিসাবে। সেইদিন একই সময়ে স্টেশন ও হলের মাঝামাঝি স্থানে কোমরে পিছে গুলি বিদ্ধ হয়ে আহত হয় ছাত্রনেতা রহুল কবির রিজভী। আমরা হারাই আমাদের প্রাণের নেতা শহীদ শাহজাহান সিরাজকে। 

আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির দিন থেকে শাহজাহান ভাই এর সাথে প্রায় সব সময় থাকতাম। সে আমাকে বলতো ‘এই ভাঙ্গা ছাত্রলীগকে চাঙ্গা করতে হবে’। তুমি বগুড়ার সবাইকে দলে আনবা। বিশেষ করে ওনার মৃত্যুর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্মেলনকে সামনে রেখে সারাক্ষণ উনার সাথে থাকতাম। উনি ছিলেন সম্মেলন প্রস্ততি পরিষদের আহ্বায়ক আর আমি উনার সেই কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা উপ-পরিষদের আহ্বায়ক। শাহজাহান ভাই চাইতেন সম্মেলনটা যেন বিশাল উৎসবে পরিণত হয়। উনি শহীদ হওয়ার পর আমরা তার সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে পেরেছিলাম। 

শাহজাহান ভাই শহীদ হওয়ার পরে ক্যাম্পাস খোলার পর থেকে এই মহান শহীদকে নিয়ে আমরা আবেগে ভাসতে থাকি। তখন মূলত ক্যাম্পাসে আমি স্লোগান মাস্টার হিসাবে পরিচিত ছিলাম। শাজাহান ভাই এর কথা মনে হলেই উনাকে নিয়ে রচনা করতাম অসংখ্য স্লোগান। যেমন : 
"মতিহারের মহাপ্রাণ,
শাজাহান-শাজাহান।"
"আন্দোলনের মহাপ্রাণ,
শাজাহান-শাজাহান।"
"রজব আলীর জানের জান,
শাজাহান-শাজাহান। "
"তোমার আমার প্রাণের প্রাণ,
শাজাহান-শাজাহান। "
"দ্বীপশিখা অনির্বাণ,
"শাজাহান-শাজাহান।"
"গোশায় পুরের মহাপ্রাণ,
শাজাহান-শাজাহান। "
"মরেও তুমি অমর আজ,
বিপ্লবী শাজাহান সিরাজ।" 

আরেও কত কি। কত লিখি। অনেক কিছু ৩৫ বছরে ভুলেও গিয়েছি। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত শাজাহান ভাইকে ভুলতে পারিনি। প্রতি বছর ২২শে ডিসেম্বর সারা দিন মন খারাপ করে ভাবি, যে কারণে শহীদ শাজাহান সিরাজসহ শত শহীদ বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই গণতন্ত্র কি এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পেয়েছে?

পরিশেষে কবি মোহন রায়হানের ছন্দে বলতে হয়, "শোক নয়, প্রতিশোধ নিবো আজ; ঘুমাও শান্তিতে শাজাহান সিরাজ।"

লেখক : সাবেক পত্রিকা সম্পাদক, রাকসু।

বিডি-প্রতিদিন/শফিক


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর