শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ২১:৩৪

ভ্রমণ

শীতের ছুটিতে প্রকৃতিকন্যা সিলেটে

শাহজিয়া শাহ্রিন আণিকা

শীতের ছুটিতে প্রকৃতিকন্যা সিলেটে

ধীরে ধীরে নৌকা ঢুকতে লাগল বনের ভিতর। মনে হচ্ছে কোনো শিল্পীর আঁকা ছবির ভিতর প্রবেশ করছি। বর্ষায় গাছের ডালপালা আর পাতাগুলো ছাড়া পুরোটাই থাকে পানির নিচে। কিন্তু গাছের মূলগুলো যে কী রকম সুন্দর তা দেখতে হলে আসতে হবে শীতকালে।

 

হাড়কাঁপানো শীত অনুমান করে সিলেট শহরে নামলাম। প্রথম গন্তব্য সিলেট শহর থেকে ৩৩ কি.মি. দূরের ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর। শহর থেকে সিএনজি নিয়ে ধলাই নদীর ঘাটে পৌঁছলাম। কোথাও সবুজ, কোথাও হালকা নীল, কোথাওবা নীলাভ সবুজ- চোখে ধাঁধা লাগানো রঙের খেলা নদীজুড়ে। দুই-একটা জায়গায় আবার দুটি আলাদা রঙের পানি এক অদৃশ্য বাঁধ নিয়ে আলাদা হয়ে আছে, স্রোত বয়ে যায় কিন্তু এর সীমানা পেরিয়ে এক ফোঁটা রংও এদিক-সেদিক হয় না। বর্ষাকালে পানি অনেক বেশি থাকায় কোনো চর দেখা যায় না, তবে শীতে নদীর বুকে জেগে উঠে সাদা বালুর চর। ওপরে সুনীল আকাশ, নিচে চকচকে কাকচক্ষু পানি, তার মাঝে এই সাদা চরের মিশেলে সে যে কী অপরূপ দৃশ্য তৈরি হয়, তা শুধু শীতকালেই উপভোগ করা যায়। মেঘালয়ের অতিকায় পাথরের ঘিরে থাকা সারি যেন দূরে হাতছানি দিয়ে ডাকে।

 

সারাক্ষণ রঙের লীলা উপভোগ করতে করতে কখন যে সাদা পাথর পৌঁছে গেলাম টেরই পেলাম না। বিশাল অঞ্চলজুড়ে সাদা পাথরের স্তর। তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে অত্যন্ত স্বচ্ছ জলরাশি। এত স্বচ্ছ যে, নিচের পাথরগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। যতই ভিতরের দিকে এগোচ্ছিলাম পানির স্রোত ততই বাড়ছিল। আর তর সইল না, নেমে পড়লাম পানিতে। সঙ্গে সঙ্গে শরীরজুড়ে এক ঠাণ্ডা শিহরণ বয়ে গেল। নামার পরই বুঝতে পারলাম যে, কালো রঙের পাথরগুলো খুব পিচ্ছিল, সাদাগুলোতে মোটামুটি দাঁড়িয়ে থাকা যায়। তীব্র স্রোতের ধাক্কায় বারবারই বেসামাল হয়ে পড়ছিলাম। সাবধান না হলে পড়ে গিয়ে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। কিছুটা সময় জল-পাথরের স্বর্গরাজ্যে মত্ত থেকে পানি থেকে উঠে এলাম। সঙ্গে সঙ্গে অ™ভুত এক প্রশান্তি ভর করল শরীর ও মনে, যার  রেশ রয়ে গেল বহুক্ষণ।

ভোলাগঞ্জ থেকে ফিরে আসার পর দেখতে গেলাম সিলেট থেকে ২০ কি.মি. দূরে অবস্থিত দেশের একমাত্র মিঠাপানির জলাবন রাতারগুল। বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রেখে নৌকা চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। ডিঙ্গি নৌকা দেখেই আনন্দে মন ভরে গেল। ধীরে ধীরে নৌকা নিয়ে ঢুকতে লাগলাম বনের ভিতর। মনে হচ্ছিল কোনো শিল্পীর আঁকা ছবির ভিতর প্রবেশ করছি। নিজেও কিছুক্ষণ বৈঠা বাইতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু শত চেষ্টা করেও ঠিকমতো ধরতেই পারলাম না। বর্ষায় গাছের ডালপালা আর পাতাগুলো ছাড়া পুরোটাই থাকে পানির নিচে। কিন্তু গাছের মূলগুলো যে কী রকম সুন্দর তা দেখতে হলে আসতে হবে শীতকালে। মাঝির বৈঠার আঘাতে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ সেই নিস্তব্ধতায় যোগ করে ভিন্নমাত্রার মূর্ছনা। সৌভাগ্যক্রমে দিনটি ছিল রৌদ্রকরোজ্জ্বল। পাতার ছাদের ফাঁকে ফাঁকে সরু রেখার মতো সোনালি রোদ এসে পানিতে প্রতিফলিত হচ্ছিল। যেতে যেতে অনেকটা মোহগ্রস্তের মতো দেখলাম  নৌকা এসে ভিড়ল ওয়াচ টাওয়ারে। টাওয়ার থেকে সম্পূর্ণ রাতারগুল দেখা যায়। শীতকালে রাতারগুল ভ্রমণের বাড়তি সুবিধা হলো ট্র্যাকিং। জলাভূমির দুই পাশে শুকিয়ে যাওয়া ভূমিতে তৈরি হয় বুনোপথ। যে কোনো অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের কাছে ঘন জঙ্গল হেঁটে দেখার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে দারুণ রোমাঞ্চকর হবে।

 

ষড়ঋতুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রকৃতি একেক সময় একেকভাবে নিজেকে সাজায়। এবারের তীব্র শীতের আবেশে কোন রূপে সেজেছে ধলাই নদী, ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর, শ্রীমঙ্গল এবং রাতারগুল তার সন্ধানে আমাদের এবারের যাত্রা।

 

দ্বিতীয় দিন রওনা হলাম চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গলে। দিগন্তবিস্তৃত চা গাছের সারির পর সারি আমাদের মোহিত করে রাখে। সবুজের মাঝে ফুটে থাকা হলুদ-সাদা চা ফুল যোগ করে অনিন্দ্য স্নিগ্ধতা। কিন্তু শ্রীমঙ্গলে যে চা বাগান ছাড়াও দেখার মতো অনেক কিছু আছে! অসংখ্য পরিযায়ী পাখির মেলা দেখতে চলে  গেলাম হাইল হাওরের বাইক্কা বিলে। গ্রামে ঢুকতেই হাজারো পাখির কিচির মিচির কানে সুধা-বর্ষণ করতে লাগল। ওয়াচ টাওয়ার থেকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রে  দেখতে পেলাম পুরো বিল ছেয়ে আছে পাখিতে। সাপ, পাখি, ডাহুক, জলমোরগ, দলপিপি- কত বিচিত্র নাম তাদের।

বাইক্কা বিল দেখে পৌঁছে গেলাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। বন্যপ্রেমীদের জন্য লাউয়াছড়া এক স্বর্গ। তবে মানুষের সামনে এরা কমই আসে। এখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা প্রত্যক্ষ করার সুযোগও মিলবে। রাস্তায় বেরিয়ে চোখ পড়ল টিলার ওপর আনারসের বাগান। চায়ের  দেশে এসে সাত রঙের চা না খেয়ে চলে যাব তা কি হয়? সাত-আট লেয়ারের চায়ের প্রকৃত উদ্ভাবক কিন্তু এই নীলকণ্ঠের মালিক রমেশ রাম গৌড়। আরও দুই-তিনটি দোকানে এই চা পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত স্বাদ এবং অসাধারণ  ফ্লেভার একমাত্র এই দোকানের চায়েই আছে। সবশেষে মণিপুরী মেলা পরিদর্শন। মণিপুরীদের নিজ হাতে তৈরি কাপড় ও শৌখিন জিনিসপত্র  কেনার জন্য এটি আদর্শ জায়গা।

 

কোথায় থাকবেন : সিলেটে ছোট-বড় অনেক ধরনের হোটেল রিসোর্ট রয়েছে। আপনাকে পছন্দমতো একটি নির্বাচন করতে পারেন। ভাড়া সর্বনিম্ন ১০০০ টাকায়ও হোটেল পাবেন।

 

কীভাবে যাবেন : ট্রেনে/বিমানে/বাসে যেতে পারেন।


আপনার মন্তব্য