Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ মে, ২০১৯ ২৩:১৭

জাদুর শহরে ‘অচেনা’ ক্রিকেট

মেজবাহ্-উল-হক, কার্ডিফ থেকে

জাদুর শহরে ‘অচেনা’ ক্রিকেট
কার্ডিফের সোফিয়ান গার্ডেন। আজ এই মাঠে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচে পাকিস্তানের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ

কার্ডিফের বুক চিড়ে বয়ে গেছে টাফ নদী। স্রোত নেই, কিন্তু পানি স্বচ্ছ। আকারেও বড় নয়। লেকের মতো দেখতে মনে হলেও ওয়েলসের প্রধান নদী এই টাফ। পাথর দিয়ে বাঁধানো দুই পাড়। নিয়মিত লঞ্চও চলে। ছোট্ট এই নদীকে ঘিরেই ইউরোপের ক্ষুদে দেশ ওয়েলসের আধুনিকতার বিকাশ! কার্ডিফ হচ্ছে যুক্তরাজ্যের শান্ত শহরের মধ্যে একটি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। চারদিকে সবুজে সমারোহ। শহরের প্রাণকেন্দ্রেও সারি সারি গাছ। স্বভাবে-আচরণে চমৎকার কার্ডিফের মানুষগুলোও। দারুণ সহযোগিতা পরায়ণ। এ কারণেই পর্যটকদের দারুণ পছন্দ এই শহরটি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে ইউরোপে ষষ্ঠ পর্যটন শহরের খেতাব পেয়েছে এই কার্ডিফ। শহরের খাবার দোকানগুলো প্রায় ২৪ ঘণ্টাই থাকে খোলা। নিরাপত্তার অভাবে ভুগতে হয়না কোনো পর্যটককে। কার্ডিফে শুক্র ও শনিবারের রাত যেন মোহনীয় রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। সপ্তাহের বাকি পাঁচ দিন কঠোর পরিশ্রম করার পর এই দুই রাত প্রাণ ভরে আনন্দ করে কার্ডিফবাসী। ইউরোপের অন্যান্য শহরের চেয়ে কার্ডিফবাসীর উইকেন্ড সেলিব্রেশনের ধরন খানিকটা ভিন্ন।

শহরের বিখ্যাত নাইট ক্লাবগুলো খুলেই দেওয়া হয় রাত ১০টার পর। প্রতিটি ক্লাবেই থাকে লম্বা লাইন। তা ছাড়া শহরের আনাচে-কানাচেও চলে পার্টি। ছোট ছোট রাস্তাও লোকে লোকারন্য হয়ে যায়। রাস্তার কয়েকশ’ গজ পর পর লাউড স্পিকারে লাইফ কনসার্ট চলে। উইকেন্ডে পুরো কার্ডিফ হয়ে যায় এক উন্মত্ত নগরী। স্থানীয়দের সঙ্গে এই আনন্দ উৎসবে সমান তালে যোগ দেন পর্যটকরাও। এ জন্যই বুঝি পর্যটকদের কাছে কার্ডিফ এক জাদুর শহর।

ক্রীড়া ক্ষেত্রে ওয়েলসের ইতিহাস বর্ণাঢ্য। ক্রিকেটে তারা ইংল্যান্ডের সঙ্গে এক দল হয়ে খেলে। কিন্তু ফুটবলে ওয়েলস জাতীয় দল আলাদা। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়েও রয়েছে তাদের দাপট। এখন ওয়েলসের অবস্থান ১৯তম। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, এখানকার এক নম্বর ক্রীড়া কিন্তু ফুটবল নয়, রাগবি। টাফ নদীর পাড়ে অবস্থিত অপূর্ব সুন্দর মিলেনিয়াম স্টেডিয়ামকে ঘিরেই কার্ডিফের রাগবি চলে। এই স্টেডিয়াম হচ্ছে ওয়েলস জাতীয় রাগবি ইউনিয়ন দলের হোম ভেন্যু। তবে এই মিলেনিয়াম স্টেডিয়ামে ফুটবল ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়। ইউরোপের অন্যান্য শহরের মতো এখানেও ফুটবলের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের সেরা তারকা গ্যারেথ বেলের শহর কিন্তু এই কার্ডিফ। ২০১৭ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই মিলেনিয়াম স্টেডিয়ামে। যে ম্যাচে বেলের রিয়াল মাদ্রিদ জুভেন্টাসকে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা  জেতে। আর সারা বিশ্ব দেখেছে কার্ডিফের ফুটবল উন্মাদনা।

ওয়েলসের ফুটবল ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯২৭ সালে আর্সেনালকে হারিয়ে প্রথম নন-ইংলিশ দল হিসেবে এফএ কাপের শিরোপা জিতেছিল কার্ডিফ সিটি ফুটবল ক্লাব। ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকের সময়ও কার্ডিফে ফুটবলের ১২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ক্রিকেট সোফিয়া গার্ডেন কেন্দ্রিক। ২০০৯ সালে অ্যাসেজ সিরিজের একটি ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়ে এই স্টেডিয়ামে। সোফিয়া গার্ডেন তো বাংলাদেশের এক লাকি ভেন্যু। এই কার্ডিফে ২০০৫ সালে মোহাম্মদ আশরাফুলের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ানডে জয়ের স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে খাদের কিনারে গিয়েও দুর্দান্তভাবে কামব্যাক করে জিতে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছিল টাইগাররা। মাশরাফিদের কাছেও কার্ডিফ এক জাদুর শহর।

কিন্তু এই জাদুর শহরে রাগবি ও ফুটবল যতটা জনপ্রিয় ক্রিকেট তার ধারে কাছেও নেই। ক্রিকেট নিয়ে এখানকার মানুষের মনে কোনো অনুভূতিও নেই যেন। বিশ্বকাপ হচ্ছে, শহরের অনেকে জানেই না। কিংবা অভিমান করে ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। দুই যুগ আগেও ক্রিকেট বেশ জনপ্রিয় ছিল এই ওয়েলসে। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ম্যাচ দেখতে টিকিটের জন্য রেকর্ডসংখ্যক মানুষ আবেদন করেছিল। কিন্তু ২০০৫ সালে বদলে যায় চিত্র। ইসিবি (ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড) মিডিয়া রাইটস বিক্রি করে দেয় বিস্কাইবি-র কাছে। স্থানীয় টিভিগুলো ক্রিকেট সম্প্রচার করার অধিকার হারিয়ে ফেলে। তারপর থেকে স্থানীয়দের মধ্যে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। এখন এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে তরুণ প্রজন্ম ক্রিকেটের নামই যেন ভুলতে বসেছে। গতকাল কথা হয় কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মার্ক ওয়েলের সঙ্গে। জানতে চাইলাম, ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা কেমন? প্রথমে নামটাই বুঝতে পারল না মার্ক, ‘কি বললেন, কি? ও আচ্ছা, ক্রিকেট! এখানে বিশ্বকাপ হচ্ছে, হবে হয়তো!’ মার্কের মতো অনেকেই খোঁজ রাখেন না ক্রিকেটের। কিন্তু ফুটবল ও রাগবির নাড়িনক্ষত্র সব জানা। ওয়েলসের তরুণরা স্বপ্ন দেখেন গ্যারেথ বেলের মতো ফুটবলার হওয়ার। ইয়ন মরগান, বেন স্টোকস, জো রুটকে চেনেও না। অন্য দলের খোঁজ খবর রাখা তো দূরের কথা, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিতবে না হারবে তা নিয়েও যেন কোনো মাথা ব্যথা নেই। এই জাদুর শহরে ক্রিকেট যেন এক ‘অচেনা’ খেলা!

 


আপনার মন্তব্য